লিখেছেনঃ সাদমান

যুবরাজ সিং এর কথা মনে পড়লে ,মাথায় প্রথমে আসে ২০০৭ সালের টুয়েন্টি টুয়েন্টি বিশ্বকাপের কথা , ওই বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে এক ম্যাচে স্টুয়ার্ট ব্রার্ডকে এক ওভারে ছয়টা ছয় মারেন, মানে ৬ বলে ৬ ছয়। তবে যুবরাজ হটাৎ এই রকম আগ্রাসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার পিছনে আন্ড্রু ফিলিনটফ এর আংশিক ভূমিকা আছে, এই ওভারের আগের ওভারে তিনি যুবরাজকে স্লেজ করেছিল, “ I Will Cut Your Throat” এইটা ছিলো ফিলিনটফ এর বক্তব্য যুবরাজকে উদ্দেশ্য করে। যুবরাজ পরে ইয়ার্কির ছলে স্বীকার করেন যে , এই বক্তব্য তাকে এক ওভারে ছয়টা ছয় মারতে উৎজীবিত করে। তিনি ১২ বলে তার অর্ধশতক সম্পূর্ণ করেন এই ম্যাচ যা এখন পর্যন্ত রেকর্ড। এই টুর্নামেন্টে তার আরেকটি উল্লেখ্যযোগ্য ইংনিস হচ্ছে ৩০ বলে ৭০ রান অস্ট্রালিয়ার বিরুদ্ধে এবং ১১৯ মিটার যা কিনা আসরের সবচেয়ে বড় ছয় এই রেকর্ড টাও তার দখলে।
ব্রড এবং যুবরাজ
টি- টুয়েনটি বিশকাপ ২০০৭, ইংল্যান্ড বনাম ভারত
২০১১ বিশ্বকাপ তো যুবরাজ সিং এর কাছে স্বপ্নের মতো, ভারতকে ২৮ বছর পর বিশ্বকাপ জিতানোতে তার ভূমিকা ছিল অপরিসীম, মূল কথা তিনিই ছিলেন এই বিশ্বকাপের মূল কান্ডারি। তিনি এই বিশ্বকাপে ৯ ম্যাচে চারটি অর্ধশত আর একটি শতক করেছিলেন, মোট রান ৩৬২,গড় ছিল ৯০।
বল হাতেও ছিলেন দূর্দান্ত ফাইনালে শ্রীলঙ্কার বিরদ্ধে দুই উইকেটসহ এই আসরে তার মোট উইকেট ছিলো ১৫, যা ভারতের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী জাহির খানের ২২ উইকেটের পরেই ছিল। এই আসরের সর্বশেষ্ঠ খেলোয়াড় এর তাকামাও পান তিনি। এই টুর্নামেন্টের একটি উইন্ডিজ এর বিরুদ্ধে ম্যাচে তিনি বার বার বমি করছিলেন আর মূর্ছা যাচ্ছিলেন , আম্পায়াররা বার বার তাকে প্যাভিলিয়নে যেতে বললে তিনি প্রত্যুত্তর দেন যে- আমি মাঠ থেকে হাসপাতালে যেতে পারি কিন্তু প্যাভিলিয়নে যাবো না, আর অজ্ঞান হওয়ার আগে আমার টিমকে জিতিয়ে অজ্ঞান হবো। এই উক্তির মাধম্যে তার প্যাশন আর কনফিডেন্স সম্পর্কে ধারনা পাওয়া যায়।
Yuvi2011
বিশ্বকাপ ২০১১, ভারত বনাম ওয়েস্ট- ইন্ডিজ
২০১১ বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর পরই এমন এক ঘটনা ঘটে যার জন্য যুবরাজ মোটেই প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি এক অজানা ব্যাধিতে আক্রন্ত হন, ব্যাধিটির নাম হচ্ছে মেডিনিস্টিনাল সেমিনোমা যা এক প্রকারের ক্যান্সার। এই ঘটনার পরে যুবরাজ আমেরিকাই গিয়ে চিকিৎসা নিয়া শুরু করে,মাস এর পর মাস একাকী সময় পার করেন আর লড়ে যান এই রোগের সাথে,এই সময়কালে তিনি অনেক ভেঙে পড়েন কিন্তু কোন সময় ক্যানসার তাকে পরাজিত করতে পারেন নি কারণ যুবরাজ তো হারার মানুষ না , তিনি তো ফাইটার অবশেষে ক্যান্সার হারিয়ে তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরেন, এই সময়কালে তিনি একটি বই লিখেন “Deal With The God” ।
সব চেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য তিনি দেন সুস্থ হওয়ার পর , তিনি ২০১১ বিশ্বকাপ চলাকালেই বুঝতে পেরেছিলেন তার কিছু একটা হয়েছে কিন্তু কাউকে কিছু বলেন নি কারণ বললেই তো করতে হবে বিভিন্ন টেস্ট, টেস্ট কিছু ধরা পড়লেই তার খেলা বন্ধ হয়ে যেত, ছুঁয়েতে মারতেন যেই কাপ, হয়তোবা ভারত ও ২৮ বছর পর বিশ্বকাপ পেতেও না। নিজের কথা চিন্তা না করে দেশের জন্য সর্বস্ব উজাড় করে দেয়ার জন্য আমি তাকে মৃত্যুঞ্জয়ী মহারথী খেতাব দিয়ে সম্মধন করেছি। ক্যানসারকে জয় করেছিলেন, ফিরেছিলেন স্বাভাবিক জীবনে , ফিরেছিলেন মাঠেও কিন্তু নিজের স্বরূপে ফিরতে পারেন নি কখনো। আমারা আগের যুবরাজকে পায় নি। অনকে পরিশ্রম করেছিলেন কিন্তু ফুল ফিটনেসে আসতে পারেননি। তারপরও খেলেছিলেন কিছু উল্লেযোগ্য ইনিংস কিন্তু আমরা ওই চ্যাম্পিয়ন খেলোয়াড়কে আর দেখতে পায় নি, যা পেয়েছি আগের যুবরাজের ছায়া।
যুবরাজ সিং ছিলেন ছোট থেকেই চ্যাম্পিয়ন , ছোট থেকেই তার অতটিটুডে ছিল সুপারস্টারদের ছোয়া । ভারতকে ২০০০ সালে প্রথম অনুর্ধ ১৯ বিশ্বকাপ জিতনোতে তার ভূমিকা ছিলো অপরিসীম। ৮ ম্যাচে করেছিলেন ২০৮ রান আর বল হাতে নিয়েছিলেন ১২ উইকেট । দুইটি গুরুত্ব অর্ধশত রান করেছিলেন অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের সাথে। এই আসরেও তিনি সর্বশেষ্ঠ খেলোয়াড় এর খেতাব পান। এবং এই টুর্নামেন্ট এর পর পর তিনি ভারতের জাতীয় দলে ডাক পান।
স্লগ সুইপ খেলছেন যুবরাজ সিং
অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপ ২০০০
ভারতের ইতিহাসে একটা অন্যতম আইকোনিক ম্যাচ হলো ২০০২ সালের নাটওয়েস্ট সিরিজের ফাইনাল ম্যাচ হা ওই ম্যাচের কথা বলছি যে যেই ম্যাচে সৌরভ গাঙ্গুলি লর্ডসের বারান্দায় গেঞ্জি ঘুরছিলেন। ভারতের অবস্থা ভালো ছিলো না ৩২৬ রান তাড়া করতে গিয়ে ১৪৬ রানে ৫ উইকেট , দুই নিউকামার ক্রিজে মোহাম্মদ কাইফ এবং যুবরাজ সিং, কাইফ শতক করে ম্যাচ শেষ করলেও , দুই জনের ১২১ রানের জুটি ম্যাচ ঘুরিয়ে দিয়েছিল । ১২১ রানের মধ্যে যুবরাজ করে ৬৩ বলে ৬৯।
যুবরাজ সিং এর বন্ধু কাইফ
যুবরাজ ও কাইফ, ২০০২
মোহাম্মদ কাইফ এর কথা যখন বললেই ফেলাম এই বার যুবরাজ সিং ফিল্ন্ডিং নিয়ে কথা বলি, কাইফ ধরতেন কাভারে আর যুবরাজ পয়েন্টে তাদের মধ্যে ফিল্ডিং নিয়ে প্রতিযোগিতা লেগেই থাকতো। যুবরাজ পয়েন্ট থেকে কিছু চোখ ধাঁধানো ক্যাচ ধরেছিলেন আর কাইফ এর দৌড়ানোর গতি তৎকালীন সময়ে সর্বোচ্চ ছিলো। কিন্তু সম্প্রতিক সময়ে কাইফ আর যুবরাজ এক সাক্ষাৎকরে বলেন যে তাদের এই ভালো ফিল্ন্ডিং করা নিয়ে সিনিয়র খেলোয়াড়রা মজা করতো, হাসাহাসি করতো। তারা ওই সাক্ষাৎকরে আরো বলেন যে , ফিল্ন্ডিং তাদের ব্যাটিংকে আরো শক্ত করে তুলেছিল, খেলোয়াড় হিসাবে তাদের খেলায় যোগ হয়েছিলো “X-factor”।
যুবরাজের গেম প্লে ছিলো একটু ভিন্ন ধরনের , তিনি ছিলেন Instinct খেলোয়াড় , ঘুম ভালো গেম রিড করতে পারতেন, On situation ব্যাটিং করতেন, তার এই সব বিরল গুণের জন্য তাকে অনেককেই out and out ম্যাচ উইনার বলে আর যুবরাজ যে বিগ ম্যাচ বা বিগ টুর্নামেন্ট প্লেয়ার তা আমরা উপরের আলোচনা থেকে পরিষ্কার। পেস বল ভালো খেলতেন কিন্তু স্পিন বোলারদের বিরুদ্ধে ছিলেন খুনে সেটা মুরালিধরন হোক আর বা হোক ওয়ার্ন। তার মিড উইকেটের উপর দিয়ে লফটেড ড্রাইভে ছিল শিল্পিক ছোয়া, আর তাঁর কভার ড্রাইভ ছিলো পাবলো পিকাসোর তুলির টানের মতো, মোট কথা তার ব্যাটিং স্টাইলে ছিল এলিগ্যান্স।
এতক্ষন যাকে নিয়ে কথা বললাম সে পাঞ্জাবের চান্দিগ্রর শহরের এক ছেলে যে এক সময় “World Beater” এ পরিণত হয় এবং সে ছেলেটি মৃত্যুকে উপপেক্ষা করে দেশের জন্য সব উজাড় করে দিয়েছেন, হোক ক্রিকেটের জন্য কিন্তু জীবনতো বাজি লাগিয়েছিলেন, ওই জন্যই যুবরাজ সিং যোদ্ধা বা মহারথী
যুবরাজ সিং তার ১৯ বছরের ক্যারিয়ার শেষ করেন ২০১৯ সালে। তিনি ৪০২ টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন। নিজেকে ভারতের ক্রিকেটীয় ইতিহাসে অমর করে দিয়েছেন তার কিছু চোখ ধাঁধানো পারফরম্যান্স দিয়ে। জিতিয়েছেন অনেক ম্যাচ, রেখেছে উল্লেগ্যোগ্য ভূমিকা, এক কথায় তিনি ছিলেন impact খেলোয়াড়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here