এই লেখাটি লিখেছেন একজন সম্মানিত কন্ট্রিবিউটর।

বিশ্বের জানা-অজানা সব বিষয় নিয়ে আমাদের সাথে লিখতে আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন।

রাশিয়া, আনুষ্ঠানিকভাবে রুশ ফেডারেশন (Российская Федерация)। আয়তনে বিশ্বের বৃহত্তম রাষ্ট্র রাশিয়া আমাদের কাছে পরিচিত একটি মহাশক্তি হিসেবে। গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার ইনডেক্স অনুযায়ী, সামরিক শক্তির দিক থেকে বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ রাষ্ট্র রাশিয়া। বিশ্বের সর্ববৃহৎ ট্যাঙ্ক বহর রাশিয়ার। বিশ্বের মাত্র দুইটি রাষ্ট্রের দূরপাল্লার কৌশলগত বোমারু বিমান বহর রয়েছে এবং এদের একটি রাষ্ট্র রাশিয়া। পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষ রাষ্ট্র রাশিয়া। সামগ্রিকভাবে, রাশিয়া একটি খুবই সামরিকীকৃত (militarized) রাষ্ট্র।
কিন্তু রাশিয়ার এই সামরিকীকরণের কারণ কী? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিগত ৭৫ বছরের মধ্যে রাশিয়া কোনো বহিঃশত্রুর আক্রমণের শিকার হয়নি। তবুও রুশরা সর্বদা তাদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে তৎপর। রাশিয়ার পূর্বসূরি রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের অন্যতম কারণ ছিল মাত্রাতিরিক্ত সামরিক ব্যয় এবং এর ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সঙ্কট। তারপরও রাশিয়া এখনো একটি সামরিকীকৃত রাষ্ট্র।
তবে কি রুশরা খুবই সাম্রাজ্যবাদী? সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্যই কি তাদের এত সামরিক আয়োজন? রুশ বিরোধীদের বক্তব্য এটাই। কিন্তু বাস্তব সত্য হচ্ছে যে, বর্তমানে রুশরা সাম্রাজ্য বিস্তারে মোটেই আগ্রহী নয়। যদি রুশরা সাম্রাজ্যবাদী হতো, তাহলে প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের পূর্ব ও মধ্য ইউরোপীয় উপগ্রহ রাষ্ট্রগুলো (satellite states) এত সহজে রুশদের নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে যেতে পারতো না, কিংবা প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের পূর্ব ইউরোপীয়, বাল্টিক, দক্ষিণ ককেশীয় ও মধ্য এশীয় প্রজাতন্ত্রগুলোও এত সহজে প্রায় বিনা রক্তপাতে মস্কো থেকে বিচ্ছিন্নতা ঘোষণা করতে পারতোনা। অন্যদিকে, ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং অন্যান্য ইউরোপীয় সাম্রাজ্যগুলো প্রচুর রক্তপাতের পরই কেবল তাদের সাম্রাজ্য ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। ভারত ও ফিলিস্তিনে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ও স্থানীয় জনসাধারণের মধ্যে রক্তাক্ত সংঘাত, ইন্দোচীন ও আলজেরিয়ায় ফ্রান্সের বিরুদ্ধে প্রলম্বিত স্বাধীনতা যুদ্ধ, ইন্দোনেশিয়ায় নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে রক্তাক্ত বিপ্লব এবং আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলে পর্তুগালের বিরুদ্ধে দীর্ঘ গেরিলা যুদ্ধ – এগুলো তারই পরিচায়ক।
বস্তুত, বর্তমান রুশ জনসাধারণ সাম্রাজ্য বিস্তারতো দূরে থাকুক, রুশ সীমান্ত থেকে দূরে কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ব্যাপারেও উৎসাহী নয়। ১৯৮০–এর দশকে আফগানিস্তানের গৃহযুদ্ধে সোভিয়েত হস্তক্ষেপের প্রতি এবং ২০১০–এর দশকে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে রুশ হস্তক্ষেপের প্রতি রুশ জনগণের অনীহা এর প্রমাণ। তাহলে রাশিয়ার সামরিকশক্তি বৃদ্ধিকে রুশ জনসাধারণ কেন সমর্থন করছে?
এর উত্তর হচ্ছে, গত ৭৫ বছরে রাশিয়া কোনো বহিঃশত্রুর আক্রমণের শিকার হয়নি, সেটা ঠিক, কিন্তু তার আগের রাশিয়ার ৭৫০ বছরের ইতিহাস উপর্যূপরি বৈদেশিক আক্রমণের ইতিহাস। কখনো রুশরা এই আক্রমণগুলো প্রতিহত করতে পেরেছে, কখনো পারেনি – কিন্তু প্রতিটি বিদেশি আক্রমণের ফলেই রাশিয়া চরম ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। চলুন, জেনে নেয়া যাক রাশিয়ার ইতিহাসের সেই ভয়াল পর্বগুলোর কথা।

 

মোঙ্গল আক্রমণ (১২২৩–১৪৮০)


71bangladesh
ভ্লাদিমির শহরের দ্বারপ্রান্তে মোঙ্গল সৈন্যবাহিনী, চিত্রকর: ভ্লাদিমির মাক্সিমভ; (Image Source: Wikimedia Commons)
ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে ‘রাশিয়া’ নামে একক কোনো রাষ্ট্র ছিলনা। বর্তমান ইউরোপীয় রাশিয়া, ইউক্রেন ও বেলারুশের ভূমিতে ছিল অনেকগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্র, যেগুলো প্রায়ই পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হতো। এই রাষ্ট্রগুলো ছিল জাতিগতভাবে স্লাভিক এবং ধর্মগতভাবে অর্থোডক্স খ্রিস্টান। এই রাষ্ট্রগুলোর পূর্বে ও দক্ষিণে ছিল আরো কিছু রাষ্ট্র, যেগুলো ছিল জাতিগতভাবে তুর্কি ও ধর্মগতভাবে মুসলিম। এই তুর্কি রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ও রুশ রাষ্ট্রগুলোর যুদ্ধবিগ্রহ লেগেই থাকতো।
ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথমদিকে মোঙ্গল নেতা চেঙ্গিস খান যাযাবর মোঙ্গল গোত্রগুলোকে একত্রিত করে মোঙ্গল সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন করেন এবং চীন ও মধ্য এশিয়ায় বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। ১২২৩ সালে চেঙ্গিসের সেনাপতি জেবেও সুবুতাইয়ের নেতৃত্বে ২০,০০০ থেকে ২৩,০০০ মোঙ্গল সৈন্য ককেশাসের মধ্য দিয়ে রুশ ভূমিতে হানা দেয়। এতদঞ্চলের রুশ ও তুর্কি রাষ্ট্রগুলো একজোট হয়ে ৩০,০০০ থেকে ৮০,০০০ সৈন্যের একটি বাহিনী নিয়ে মোঙ্গলদের বাধাদানের জন্য অগ্রসর হয়। বর্তমান দক্ষিণ–পূর্ব ইউক্রেনের কালকা নদীর তীরে মোঙ্গলদের সঙ্গে রুশ–তুর্কি যৌথবাহিনীর যুদ্ধ হয়। মোঙ্গলদের সৈন্য সংখ্যা কম হওয়া সত্ত্বেও নিপুণ রণ কৌশলের কারণে তারা এই যুদ্ধে জয়ী হয়। এই যুদ্ধে মোঙ্গলদের খুব কম ক্ষয়ক্ষতি হয়, কিন্তু রুশ–তুর্কি বাহিনীর ৯০% ধ্বংস হয়ে যায় এবং ৬ জন রুশ রাজাকে মোঙ্গলরা খুন করে। কিন্তু মোঙ্গলরা এই সাফল্য লাভের পর রাশিয়ার অভ্যন্তরে অগ্রসর না হয়ে ঐ অঞ্চলে লুটতরাজ চালিয়ে প্রত্যাবর্তন করে।
১২৩৭ সালে চেঙ্গিসের নাতি বাতু খান ৩৫,০০০ মোঙ্গল অশ্বারোহী এবং ৪০,০০০–এর বেশি তুর্কি সহায়ক সৈন্যসহ রুশ ভূমি আক্রমণ করেন এবং রুশদের তীব্র প্রতিরোধ সত্ত্বেও ১২৪২ সালের মধ্যে রাশিয়ার প্রায় সমস্ত রাষ্ট্রকে পরাজিত ও বিধ্বস্ত করে ফেলেন। রুশ সংস্কৃতির তদানীন্তন কেন্দ্র কিয়েভসহ রাশিয়ার প্রায় সমস্ত বড় বড় শহর মোঙ্গল আক্রমণে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। কমপক্ষে ৫ লক্ষ রুশ মোঙ্গল আক্রমণের ফলে নিহত হয়, অসংখ্য রুশ নারী মোঙ্গল সৈন্যদের পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয় এবং হাজার হাজার রুশ নর নারীকে মোঙ্গলরা ক্রীতদাসে পরিণত করে।
মোঙ্গল আক্রমণের ফলে রাশিয়ার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নগর–রাষ্ট্রগুলো মোঙ্গল সাম্রাজ্যের করদ রাজ্যে পরিণত হয়। পরবর্তী প্রায় ২৫০ বছর ধরে রুশ ভূমি ছিল মোঙ্গল ‘সোনালি হোর্ড’ (Golden Horde) খানাতের অধীনস্থ। রুশ রাষ্ট্রগুলোর শাসকদের ক্ষমতা লাভের জন্য সোনালি হোর্ডের খানের সমর্থনলাভ ছিল অবশ্যম্ভাবী। কোনো রুশ রাষ্ট্র মোঙ্গলদেরকে কর প্রদান করলে তাদের ওপরে নেমে আসতো মোঙ্গল–তাতার আক্রমণের খড়গ। রুশ ইতিহাসে এই সময়টি পরিচিত ‘মোঙ্গল–তাতার জোয়াল’ হিসেবে। অবশেষে ১৪৮০ সালে মস্কো সোনালি হোর্ডের কর্তৃত্ব অস্বীকার করে এবং স্বাধীনতা লাভ করে।
মোঙ্গল আক্রমণ রাশিয়ার ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। মোঙ্গল শাসনের অবসানের পর রাশিয়ায় যে রাষ্ট্রগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেগুলোর (মাস্কোভি, রুশ সাম্রাজ্য, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং রুশ ফেডারেশন) স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার পিছনে সুদীর্ঘ মোঙ্গল শাসনের প্রভাব দায়ী বলে অনেক বিশেষজ্ঞের ধারণা। মোঙ্গলদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে রুশ জন সাধারণের বড় একটি অংশের চেহারায় মঙ্গোলয়েড ছাপ রয়েছে। সর্বোপরি, মোঙ্গল–তাতারদের দুঃশাসনের কারণে রুশদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে ‘পীত আতঙ্ক’ (Yellow Peril), যার ফলে রুশদের মধ্যে চীনা, জাপানি ও অন্যান্য মঙ্গোলয়েড জাতির লোকেদের প্রতি এক ধরনের অবিশ্বাস বা ভীতি কাজ করে।

 

সুইডিশ আক্রমণ (১২৪০)


71 Bangladesh
সুইডিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত নভগরোদীয় রুশ জাতীয় বীরআলেক্সান্দর নেভস্কি, চিত্রকর: বোরিস চোরিকভ; (Image Source: Wikimedia Commons)
উত্তর রাশিয়ার নভগরোদ প্রজাতন্ত্র (Новгородская Республика) ছিল একমাত্র রুশ রাষ্ট্র, যেটি মোঙ্গলদের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছে ১২৩৭–১২৪২ সালের মোঙ্গল আক্রমণের থাবা থেকে রক্ষা পেয়েছিল। কিন্তু এই রাষ্ট্রটির সঙ্গে প্রতিবেশী রোমান ক্যাথলিক রাষ্ট্র সুইডেনের সুদীর্ঘ বিরোধ ছিল। মোঙ্গল আক্রমণে সমগ্র রাশিয়ায় যে নৈরাজ্যের সৃষ্টি হয়েছিল, তার সুযোগে সুইডেন রাশিয়ার উত্তরাঞ্চল দখল করে নিয়ে সেখানে ক্যাথলিক খ্রিস্টান ধর্ম চাপিয়ে দেয়ার প্রয়াস পায়।
কিন্তু নভগরোদের রাজকুমার আলেক্সান্দর এই আক্রমণের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ১২৪০ সালের ১৫ জুলাই নেভা নদীর তীরে সংঘটিত একটি যুদ্ধে নভগরোদীয় রুশ সৈন্যদের নিকট সুইডিশ সৈন্যদের শোচনীয় পরাজয় ঘটে। এর ফলে সুইডিশদের উত্তর রাশিয়া দখল এবং এতদঞ্চলে ক্যাথলিক ধর্মচাপিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এই যুদ্ধে নভগরোদের বিজয়ের নায়ক রাজকুমার আলেক্সান্দরকে তাঁর কৃতিত্বের জন্য ‘নেভস্কি’ উপাধি প্রদান করা হয়।

 

জার্মান আক্রমণ (১২৪২)


71 Bangladesh
‘বরফের যুদ্ধে’ নভগরোদের বিজয়ের ৭৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ১৯৯২ সালে প্রকাশিত ডাকটিকেট; (Image Source: Wikimedia Commons)
সুইডিশ আক্রমণ প্রতিহত করার মাত্র দুই বছরের মাথায় রুশদেরকে আরেকটি আক্রমণের মুখোমুখি হতে হয়। ১২৪২ সালে বাল্টিক অঞ্চলে অবস্থিত লিভোনীয় অর্ডার ও এস্তোনীয়রা জার্মান নাইটদের নেতৃত্বে উত্তর রাশিয়া আক্রমণ করে। তাদেরও উদ্দেশ্য ছিল মোঙ্গল আক্রমণে বিধ্বস্ত উত্তর রাশিয়া দখল করে দেখানে একটি জার্মান–শাসিত ক্যাথলিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।
জার্মানরা উত্তর রাশিয়ার পস্কভ দখল করে নেয় এবং একজন জার্মান রাজকুমারকে পস্কভের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করে। স্থানীয় অর্থোডক্স খ্রিস্টানরা বিজাতীয় জার্মান শাসন ও ক্যাথলিক মতবাদ চাপিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টার বিরোধিতা করলে জার্মানরা তাদের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালায় এবং বহু সংখ্যক মানুষকে খুন করে। এমনকি তারা স্থানীয় জনসাধারণকে ভয় দেখিয়ে বাধ্য করার জন্য ক্যাথলিক বিশপের উপস্থিতিতে শিশুদেরকে আগুনে নিক্ষেপ করে।
জার্মানদের নির্মম শাসনে রুশরা ক্ষিপ্ত হয়ে নভগরোদের বীর আলেক্সান্দর নেভস্কিকে পস্কভ থেকে জার্মানদের উৎখাত করার জন্য আহবান জানায়। ১২৪২ সালের ৫ এপ্রিল একটি বরফাবৃত নদীর ওপরে নভগরোদীয় রুশ সৈন্যদের সঙ্গে জার্মানদের যুদ্ধ হয়। এইযুদ্ধটি ‘বরফের যুদ্ধ’ (Battle of the Ice) নামে পরিচিত। যুদ্ধে রুশদের তুলনা মূলকভাবে উন্নত রণ কৌশলের নিকট জার্মান সৈন্যরা চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয় এবং উত্তর রাশিয়ায় জার্মান–শাসিত ক্যাথলিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার অবসান ঘটে।
মোঙ্গল আক্রমণের বিপর্যয়ের মাঝে সুইডিশ ও জার্মানদের বিরুদ্ধে বিজয় লাভ বিপর্যস্ত রুশদের জন্য একটি আশার আলো হিসেবে কাজ করে। মোঙ্গলরা রুশদের ওপর অবর্ণনীয় অত্যাচার করলেও এবং রুশ রাষ্ট্রগুলোকে করদ রাজ্যে পরিণত করলেও রুশদের ধর্মীয় বা সামাজিক রীতিনীতিতে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করে নি এবং রুশ রাজবংশগুলোকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করে নি। কিন্তু সুইডিশ বা জার্মানরা বিজয়ী হলে রুশদের ওপর বিজাতীয় শাসন এবং ক্যাথলিক ধর্ম চাপিয়ে দিত, যার ফলে রুশদের জাতীয় অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়তো। এজন্য বহু রুশ মোঙ্গল হুমকির চেয়ে সুইডিশ ও জার্মান হুমকিকে বেশি গুরুতর বলে বিবেচনা করতো। তদুপরি, ঐতিহাসিকভাবে কিয়েভকে রুশ সংস্কৃতির উৎপত্তিস্থল হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বর্তমানে রুশ–ইউক্রেনীয় দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপটে বহু রুশ জাতীয়তাবাদী মোঙ্গলদের হাতে পরাজিত ও বিধ্বস্ত কিয়েভের পরিবর্তে সুইডিশ ও জার্মান ক্যাথলিকদের বিরুদ্ধে বিজয়ী নভগরোদকে রুশ জাতীয়তাবাদের উৎপত্তিস্থল হিসেবে বিবেচনা করে।

 

ক্রিমীয় তাতার আক্রমণ (১৫০৭–১৭৬৯)


১৪৮০ সালে মস্কো মোঙ্গল শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে, কিন্তু মোঙ্গল–তাতার আক্রমণ থেকে মুক্তি পায় নি। ক্রিমিয়া উপদ্বীপে প্রতিষ্ঠিত ক্রিমীয় তাতার খানাত ও উত্তর ককেশাসে প্রতিষ্ঠিত নোগাই হোর্ড ছিল চেঙ্গিস খানের মুসলিম উত্তরাধিকারীদের দ্বারা শাসিত রাষ্ট্র। ১৫০৭ সাল থেকে এরা, বিশেষত ক্রিমীয় তাতাররা, রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে আক্রমণ চালাতে থাকে। এই আক্রমণগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল রুশদেরকে বন্দি করে দাস হিসেবে বিক্রি করা। ১৪৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত ক্রিমীয় তাতার খানাত ১৪৭৫ সাল থেকে ছিল ওসমানীয় সাম্রাজ্যের একটি আশ্রিত রাষ্ট্র। ওসমানীয় সাম্রাজ্য ক্রিমীয় তাতারদের এই দাস ব্যবসাকে সক্রিয়ভাবে সমর্থন করতো।
প্রায় প্রতি বছরই ক্রিমীয় তাতাররা রাশিয়ায় আক্রমণ চালাতে থাকে এবং প্রচুর সংখ্যক রুশ নর-নারীকে বন্দি করে নিয়ে গিয়ে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেয়। ১৫০৭ সাল থেকে ১৭৬৯ সাল পর্যন্ত ২৬০ বছরের বেশি সময়ে তারা কমপক্ষে ২০ লক্ষ রুশকে দাসে পরিণত করে।
71 Bangladesh
রাশিয়ার দক্ষিণ সীমান্তে রুশ সীমান্তরক্ষীরা প্রহরা দিচ্ছে, চিত্রকর: সের্গেই ইভানভ; (Image Source: Wikimedia Commons)
১৫৭১ সালে ক্রিমীয় তাতার খান প্রথম দৌলত গিরাই রাশিয়া আক্রমণ করেন। ৮০,০০০ ক্রিমীয় তাতার এবং ৪০,০০০ ওসমানীয় সৈন্য এই আক্রমণে অংশ নেয়। এই আক্রমণের উদ্দেশ্য শুধু দাস সংগ্রহ করা ছিলনা, রাষ্ট্র হিসেবে রাশিয়াকে ধ্বংস করে দেয়াই ছিল এই আক্রমণের উদ্দেশ্য। ১৫৭১ সালের মে মাসে ক্রিমীয় তাতার ও ওসমানীয় যৌথ বাহিনী মস্কো পর্যন্ত অগ্রসর হয় এবং মস্কোয় অগ্নিসংযোগ করে, যার ফলে ৬০,০০০ থেকে ২,০০,০০০ রুশ নিহত হয়।
কিন্তু পরবর্তী বছরে অর্থাৎ ১৫৭২ সালে মোলোদির যুদ্ধে রুশ জার চতুর্থ ইভান (‘ভয়ঙ্কর ইভান’ নামে সমধিক পরিচিত) ক্রিমীয় তাতার–ওসমানীয় যৌথ বাহিনীকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করেন এবং আক্রমণকারী বাহিনীটি প্রায় সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়। দৌলত গিরাই কোনোক্রমে প্রাণ নিয়ে পালাতে সক্ষম হন। এই যুদ্ধে ব্যর্থতার ফলে রুশ ভূমিতে ওসমানীয় সাম্রাজ্যবিস্তারের সম্ভাবনা চিরতরে রহিত হয়।
কিন্তু এরপরও ক্রিমীয় তাতাররা দাস সংগ্রহের জন্য দক্ষিণ রাশিয়ায় আক্রমণ অব্যাহত রাখে। রুশরা এই আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য দক্ষিণ রাশিয়ায় বহু সংখ্যক দুর্গ নির্মাণ করে, যেটি ‘বৃহৎ আবাতিস লাইন’ নামে পরিচিতি অর্জন করে। এর ফলে ক্রিমীয় তাতারদের আক্রমণের কার্যকারিতা হ্রাস পায়, কিন্তু আক্রমণ বন্ধ হয়নি। ১৭৬৯ সালে ক্রিমীয় তাতাররা রাশিয়ায় সর্বশেষ আক্রমণ চালায়। ১৭৮৩ সালে রাশিয়া ক্রিমিয়া উপদ্বীপ দখল করে নেয় এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ক্রিমীয় তাতার খানাতের বিলুপ্তি ঘটায়।
২৫০ বছরেরও বেশি সময়ব্যাপী ক্রিমীয় তাতারদের আক্রমণের ফলে অসংখ্য রুশ নর-নারী দাসে পরিণত হয় এবং মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হয়। এর ফলে ক্রিমীয় তাতারদের প্রতি রুশদের মধ্যে তীব্র জাতিগত বিদ্বেষের সৃষ্টি হয়েছিল। ফলশ্রুতিতে রাশিয়া ক্রিমিয়া দখল করে নেয়ার পর ক্রিমীয় তাতাররা জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ–সহ বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়। অবশ্য বর্তমানে কিছু উগ্র জাতীয়তাবাদী ছাড়া রুশ জনসাধারণের মধ্যে ক্রিমীয় তাতার বিরোধী মনোভাব নেই বললেই চলে।

 

পোলিশ–লিথুয়ানীয় আক্রমণ (১৬০৫–১৬১৮)


সপ্তদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে রুরিক রাজবংশের অবসান, ১৬০১–১৬০৩ সালের দুর্ভিক্ষ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ায় ‘সমস্যাকাল’ (Time of Troubles) শুরু হয়। এই অরাজকতার সুযোগে কিছু প্রতারক রুরিক রাজবংশের উত্তরাধিকারী সেজে রাশিয়ার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়। এই অন্তর্দ্বন্দ্বের সুযোগে পোলিশ–লিথুয়ানীয় কমনওয়েলথের রাজা তৃতীয় সিগিসমুন্ড রাশিয়ায় সাম্রাজ্য বিস্তার ও ক্যাথলিক ধর্ম প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ১৬০৫ সালে রাশিয়া আক্রমণ করেন।
71 Bangladesh
১৬১২ সালে পোলিশ–লিথুয়ানীয় সৈন্যরা রাজকুমার দিমিত্রি পোঝারস্কির রুশ মিলিশিয়া বাহিনীর কাছে মস্কো ক্রেমলিন হস্তান্তর করছে, চিত্রকর: আর্নস্ত লিসনার; (Image Source: Russia Beyond)
অভ্যন্তরীণ কোন্দলে বিপর্যস্ত রুশ সৈন্যরা সুসংগঠিত পোলিশ–লিথুয়ানীয় সৈন্যদের কাছে পরাজিত হতে থাকে এবং বেশ কয়েক দফা সংঘর্ষের পর ১৬১০ সালে পোলিশ–লিথুয়ানীয় সৈন্যরা মস্কো দখল করে নেয়। পোলিশ–লিথুয়ানীয়পন্থী রুশ অভিজাতরা পোলিশ–লিথুয়ানীয় যুবরাজ ভ্লাদিস্লাভকে রাশিয়ার জার ঘোষণা করেন। কিন্তু রাজা তৃতীয় সিগিসমুন্ড ভ্লাদিস্লাভকে সরিয়ে নিজেকে রাশিয়ার জার ঘোষণা করেন এবং রোমান ক্যাথলিক ধর্মকে রাশিয়ার রাষ্ট্র ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন।
রুশদের ধর্মীয় স্বাধীনতাকে কেড়ে নেয়ার প্রচেষ্টা এবং রুশ জনসাধারণের ওপরে পোলিশ–লিথুয়ানীয় সৈন্যদের নির্বিচার খুন–ধর্ষণ–লুণ্ঠনের ফলে রুশরা পোলিশ–লিথুয়ানীয়দের ওপরে ক্ষিপ্ত হয়। রুশ রাজকুমার দিমিত্রি পোঝারস্কি এবং বণিক কুজমা মিনিন এই অবস্থার প্রতিকারের জন্য জনসাধারণের মধ্যে থেকে একটি মিলিশিয়া বাহিনী গঠন করেন। এই বাহিনীটি ১৬১২ সালে পোলিশ–লিথুয়ানীয় সৈন্যদের পরাজিত করে এবং মস্কো থেকে বিতাড়িত করে।
১৬১৩ সালে রুশ অভিজাতরা মিখাইল রোমানভকে রাশিয়ার জার নির্বাচিত করেন এবং এর মধ্য দিয়ে রাশিয়ায় রোমানভ রাজবংশের শাসনের গোড়াপত্তন ও ‘সমস্যাকালে’র অবসান ঘটে। কিন্তু পোল্যান্ড–লিথুয়ানিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার যুদ্ধ চলতে থাকে এবং পশ্চিম রাশিয়ায় পোলিশ–লিথুয়ানীয়দের দখলকৃত অঞ্চল মুক্ত করতে রুশরা ব্যর্থ হয়। অবশেষে ১৬১৮ সালে স্বাক্ষরিত দেউলিনোর সন্ধি অনুযায়ী তৃতীয় সিগিসমুন্ড রাশিয়ার সিংহাসনের ওপর থেকে তাঁর দাবি প্রত্যাহার করে নেন, কিন্তু স্মোলেনস্ক ও সেভেরিয়া অঞ্চলদ্বয় পোল্যান্ড–লিথুয়ানিয়ার হস্তগত হয়। প্রায় একই সময়ে সুইডেন রাশিয়া আক্রমণ করে ইনগ্রিয়া অঞ্চলটি দখল করে নেয়।
পোলিশ–লিথুয়ানীয় আক্রমণের ফলে রাশিয়ায় পোলিশদের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির সৃষ্টি হয় এবং ফলশ্রুতিতে রুশ–পোলিশ দ্বন্দ্ব চিরস্থায়ী রূপ লাভ করে।পরবর্তীতে রুশ ও পোলিশদের মধ্যে আরো বহুবার যুদ্ধ হয়েছে এবং রুশ ও পোলিশদের মধ্যে এই পারস্পরিক বিদ্বেষ চার শতাব্দী পর বর্তমানেও বজায় আছে।

 

সুইডিশ আক্রমণ (১৭০৮–১৭০৯)


71 Bangladesh
পলতাভার যুদ্ধ, চিত্রকর: ডেনিস মার্টেন্স; (Image Source: Wikimedia Commons)
১৭০০ সালে রাশিয়ার জার প্রথম পিটারের (‘মহামতি পিটার’ নামে সমধিক পরিচিত) উদ্যোগে রাশিয়া, পোল্যান্ড–লিথুয়ানিয়া, ডেনমার্ক–নরওয়ে ও স্যাক্সোনির সমন্বয়ে একটি সুইডেন বিরোধী জোট গঠিতহয়। রাশিয়ার উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব, মধ্য ও উত্তর ইউরোপে সুইডিশ আধিপত্য বিলুপ্ত করা এবং বাল্টিক সাগরে রুশ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু সুইডেনের উন্নত ও সুসংগঠিত সৈন্যবাহিনীর নিকট ১৭০০ সালে ডেনমার্ক–নরওয়ে এবং ১৭০৬ সালে পোল্যান্ড–লিথুয়ানিয়া ও স্যাক্সোনি পরাজিত হয়।
১৭০৮ সালে সুইডেনের রাজা দ্বাদশ চার্লস প্রায় ১ লক্ষ সৈন্যসহ রাশিয়া আক্রমণ করেন। রুশদেরকে কয়েকটি খণ্ড যুদ্ধে পরাজিত করার পর ১৭০৯ সালের ৮ জুলাই সুইডিশ বাহিনী বর্তমান ইউক্রেনের পলতাভায় রুশ বাহিনীর মুখোমুখি হয়। যুদ্ধের প্রাক্কালে চার্লস আহত হওয়ায় এবং রুশদের সংখ্যাধিক্য ও উন্নততর রণকৌশলের নিকট সুইডিশরা পরাজিত হয়। এই যুদ্ধে পরাজয়ের পর অবশিষ্ট সুইডিশ সৈন্যরা আত্মসমর্পণ করে এবং রাজা চার্লসের সুইডেনে প্রত্যাবর্তনের পথ রুশদের দ্বারা অবরুদ্ধ হওয়ায় চার্লস রাশিয়া থেকে ওসমানীয় সাম্রাজ্যে পালিয়ে যান।
এই আক্রমণের ফলে প্রায় ১০,০০০ রুশ সৈন্য নিহত ও প্রায় ১৫,০০০ সৈন্য আহত হয়, এবং হাজার হাজার সৈন্য তীব্র শীতে জমে মৃত্যুবরণ করে। অন্যদিকে, ৫,৬৯০ জন সুইডিশ সৈন্য নিহত, ৭,৩৬৭ জন আহত ও ১৫,৬৭৬ জন বন্দি হয়, এবং ১৩,৭৫৯ জন শীতে জমে মৃত্যুবরণ করে।
রাশিয়ার ওপর সুইডেনের আক্রমণ প্রতিহত হলেও ১৭০৯ সালে যুদ্ধ শেষ হয় নি। আরো প্রায় ১২ বছর যুদ্ধ চলার পর ১৭২১ সালে নিস্তাদের সন্ধি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে উত্তরের মহাযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। এই যুদ্ধের ফলে রাশিয়া বাল্টিক সাগরে প্রবেশাধিকার লাভের মাধ্যমে একটি সামুদ্রিক শক্তিতে পরিণত হয় এবং একটি ইউরোপীয় মহাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। অন্যদিকে, এই যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে ইউরোপে সুইডেনের প্রভাব হ্রাস পেতে শুরু করে এবং ক্রমেই সুইডেন একটি দ্বিতীয় শ্রেণির শক্তিতে পরিণত হতে থাকে।

 

ফরাসি/ নেপোলিয়নীয় আক্রমণ (১৮১২)


১৮০৫ সালে অস্টারলিটজের যুদ্ধে এবং ১৮০৭ সালে ফ্রিডল্যান্ডের যুদ্ধে ফ্রান্সের নিকট রাশিয়া পরাজিত হওয়ার পর ১৮০৭ সালে ফরাসি সম্রাট প্রথম নেপোলিয়ন এবং রুশ সম্রাট প্রথম আলেক্সান্দরের মধ্যে ‘তিলসিতের সন্ধি’ স্বাক্ষরিত হয়। এই সন্ধি অনুযায়ী রাশিয়া ও ফ্রান্সের মধ্যে মৈত্রী স্থাপিত হয় এবং ফ্রান্স কর্তৃক ব্রিটেনের বিরুদ্ধে আরোপিত অর্থনৈতিক অবরোধে রাশিয়া যোগদান করে। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই নানা কারণে রাশিয়া ও ফ্রান্সের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয় এবং রাশিয়া ব্রিটেনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করে। এতে নেপোলিয়ন রাশিয়ার ওপর ক্ষিপ্ত হন এবং রাশিয়া আক্রমণের জন্য একটি বিশাল সৈন্যবাহিনী গঠন করেন।
১৮১২ সালের ২৪ জুন নেপোলিয়নের ‘বিশাল বাহিনী’ (Grande Armée) রুশ সীমান্ত অতিক্রম করে। ফ্রান্স, ওয়ারশ (ফ্রান্সের আশ্রিত পোলিশ রাষ্ট্র), ইতালি (ফ্রান্সের নিয়ন্ত্রণাধীন), নেপলস (ফ্রান্সের আশ্রিত রাষ্ট্র), রাইন কনফেডারেশন (ফ্রান্সের নিয়ন্ত্রণাধীন জার্মান রাষ্ট্রসমূহের একটি ফেডারেশন), সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক–নরওয়ে এবং প্রাশিয়া এই আক্রমণে অংশগ্রহণ করে। নেপোলিয়নের এই বিশাল সৈন্যবাহিনীতে ছিল ৬,৮৫,০০০ সৈন্য।
71bangladesh
নেপোলিয়নের সৈন্যরা মস্কো থেকে পশ্চাৎপসরণ করছে, চিত্রকর: ভাসিলি ভেরেশ্চাগিন; (Iamge Source: Russia Beyond)
রুশরা কয়েকটি খণ্ডযুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর ক্রমশ পশ্চাৎপসরণ করতে থাকে এবং ৭ সেপ্টেম্বর বোরোদিনোর যুদ্ধে উভয় পক্ষের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতির পর নেপোলিয়ন মস্কো দখল করেন। কিন্তু তাঁর আশা মোতাবেক রুশরা আত্মসমর্পণ না করে গেরিলা পদ্ধতিতে তাঁর সৈন্যদের ওপর আক্রমণ অব্যাহত রাখে। উপর্যুপরি গেরিলা আক্রমণ এবং রাশিয়ার ভয়াবহ শীতের প্রকোপে নেপোলিয়নের বিশাল সৈন্যবাহিনী বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। অবশেষে নেপোলিয়ন মস্কো ত্যাগ করে পশ্চাৎপসরণের সিদ্ধান্ত নেন। ফিরতি পথে তীব্র শীতে, বিভিন্ন রোগে এবং রুশ আক্রমণে তাঁর অসংখ্য সৈন্য নিহত হয়। ১৮১২ সালের ১৪ ডিসেম্বর সর্বশেষ নেপোলিয়নীয় সৈন্য রাশিয়া ত্যাগ করে।
এই যুদ্ধে ৩,৪০,০০০ থেকে ৪,০০,০০০ নেপোলিয়নীয় সৈন্য নিহত ও ৫০,০০০ সৈন্য আহত হয় এবং ৮০,০০০ সৈন্যদল ত্যাগ করে। অন্যদিকে, ১,৫০,০০০ থেকে ২,১০,০০০ রুশ সৈন্য নিহত ও ১,৫০,০০০ সৈন্য আহত হয় এবং ৫০,০০০ সৈন্য দল ত্যাগ করে। তদুপরি, প্রায় ৫,০০,০০০ বেসামরিক রুশ এই যুদ্ধে প্রাণ হারায় এবং সমগ্র পশ্চিম রাশিয়া জুড়ে ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
নেপোলিয়নকে রাশিয়ার মাটি থেকে বিতাড়িত করে রুশ সৈন্যরা তাঁর পশ্চাদ্ধাবন করে এবং অস্ট্রিয়া ও প্রাশিয়া নেপোলিয়নের পক্ষ ত্যাগ করে তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। ১৮১৩ সালে লিপজিগের যুদ্ধে নেপোলিয়নের পরাজয়ের পর ১৮১৪ সালে রুশ, অস্ট্রীয়, প্রাশীয় ও ব্রিটিশ সৈন্যরা ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে প্রবেশ করে। নেপোলিয়নকে বন্দি করে এলবা দ্বীপে নির্বাসনে প্রেরণ করা হয়। ১৮১৫ সালে নেপোলিয়ন ফ্রান্সে ফিরে এসে ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেন, কিন্তু ওয়াটারলুর যুদ্ধে পরাজয়ের পর তাঁকে চূড়ান্তভাবে সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নির্বাসনে প্রেরণ করা হয়।
এই যুদ্ধে বিজয়ের ফলে রাশিয়ার জার আলেক্সান্দর ‘ইউরোপের রক্ষাকর্তা’ হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেন এবং রাশিয়া ‘কনসার্ট অফ ইউরোপে’র একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। নেপোলিয়নকে পরাজিত করার ফলে ‘রুশরা অপরাজেয়’ এরকম একটি মিথের সৃষ্টি হয়।অন্যদিকে, এই যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে ইউরোপের মাটিতে ফ্রান্সের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের সম্ভাবনা চিরতরে তিরোহিত হয়।

 

[এই নিবন্ধটির অবশিষ্ট অংশ পরবর্তী পর্বে দেয়া হবে]

 


References:
  1. “The Mongol Invasion of Russia in the 13th Century.” https://study.com/academy/lesson/the-mongol-invasion-of-russia-in-the-13th-century.html
  1. “Battle of the Neva.” http://www.goldschp.net/SIG/nevskii/nev2.html
  1. Eve Conant, “Behind the Headlines: Who Are the Crimean Tatars?” National Geographic, March 15, 2014. https://www.google.com/amp/s/api.nationalgeographic.com/distribution/public/amp/news/2014/3/140314-crimea-tatars-referendum-russia-muslim-ethnic-history-culture
  1. Aleksey Timofeychev, “The 1612 Battle for Moscow: How the Russian state prevail,” Russia Beyond The Headlines, August 18, 2017. https://www.rbth.com/multimedia/romanovs/2017/08/18/the-1612-battle-for-moscow-how-the-russian-state-prevailed_824862
  1. “Battle of Poltava,” Encyclopedia of Ukraine. http://www.encyclopediaofukraine.com/pages/P/O/PoltavaBattleof.htm
  1. Jesse Greenspan, “Why Napoleon’s Invasion of Russia Was the Beginning of the End,” History, June 22, 2012. https://www.google.com/amp/s/www.history.com/.amp/news/napoleons-disastrous-invasion-of-russia-200-years-ago

 

3 COMMENTS

  1. প্রথম দুই প্যারা খুবই ভাল লেগেছে।তথ্যবহুল এই পোষ্টটি গ্লোবাল মিলিটারি ফায়ার পাওয়ার নিয়ে কিউরিয়াসদের রাশিয়া সম্পর্কে সম্পূর্ণ না হলেও,ভাল রকম একটা ধারণা দিবে বলে মনে করি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here