রুশদের বিদেশি আক্রমণভীতি: রাশিয়ার সামরিকীকরণের ঐতিহাসিক উৎস (পর্ব–২)

এই লেখাটি লিখেছেন একজন সম্মানিত কন্ট্রিবিউটর। বিশ্বের জানা-অজানা সব বিষয় নিয়ে আমাদের সাথে লিখতে আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন।

১৮১২–১৮১৫ সালে ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়নকে পরাজিত করার পর রাশিয়া ইউরোপের একটি বৃহৎ শক্তি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং রুশরা ‘অপরাজেয়’ এরকম একটি মিথের সৃষ্টি হয়। ইরান (১৮২৫–১৮২৮) এবং ওসমানীয় সাম্রাজ্যের (১৮২৮–১৮২৯) বিরুদ্ধে যুদ্ধে অসাধারণ সাফল্যের ফলে রুশ জনসাধারণের মধ্যে এই বিশ্বাস আরো সুদৃঢ় হয়।
কিন্তু বাস্তবে সেসময় রাশিয়া ছিল সামরিকভাবে দুর্বল, প্রশাসনিকভাবে অদক্ষ এবং প্রযুক্তিগতভাবে পশ্চাৎপদ। দক্ষিণ দিকে সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য সেন্ট পিটার্সবার্গের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা থাকলেও রুশরা দক্ষিণাভিমুখে রেলপথ নির্মাণ করে নি, ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল অপ্রতুল। রুশ আমলাতন্ত্র দুর্নীতি, অকর্মণ্যতা এবং দীর্ঘসূত্রিতায় পরিপূর্ণ ছিল। রুশ সেনাবাহিনী ছিল সংখ্যাগতভাবে বিশাল, কিন্তু রুশ সামরিক কর্মকর্তারা ছিল সাধারণভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত, সৈনিকদের মনোবল ছিল কম এবং অন্যান্য ইউরোপীয় বৃহৎ শক্তির (যেমন: ব্রিটেন ও ফ্রান্স) তুলনায় রুশরা সামরিক প্রযুক্তির দিক থেকে পিছিয়ে ছিল। রুশ নৌবাহিনী ছিল দুর্বল এবং প্রযুক্তিগতভাবে পশ্চাৎপদ। এজন্য, ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে রাশিয়া প্রকৃতপক্ষে বড় মাত্রার কোনো যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিল না।

ইঙ্গ–ফরাসি–ওসমানীয় আক্রমণ (১৮৫৩–১৮৫৬)


১৮৫০–এর দশকের প্রারম্ভে রাশিয়া ও ইউরোপীয় শক্তিগুলোর মধ্যে ‘প্রাচ্য সমস্যা’, অর্থাৎ ক্ষয়িষ্ণু ওসমানীয় সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ, নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। রুশ সম্রাট প্রথম নিকোলাই ওসমানীয় সাম্রাজ্যকে ‘ইউরোপের রুগ্ন মানব’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন এবং ওসমানীয় সাম্রাজ্যের একাংশ রুশ সাম্রাজ্যের সঙ্গে সংযুক্ত করতে আগ্রহী ছিলেন। বিশেষত, ওসমানীয় সাম্রাজ্য বসফরাস ও দার্দানেলিস প্রণালীদ্বয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কৃষ্ণসাগরের প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণ করত এবং এই প্রণালীদ্বয়ের নিয়ন্ত্রণ লাভ করলে রাশিয়া ভূমধ্যসাগরে প্রবেশাধিকার লাভ করত, যা রাশিয়ার সামুদ্রিক বাণিজ্যের পরিমাণ ও নৌশক্তি উভয়ই বৃদ্ধি করতে পারত। তদুপরি, রাশিয়া নিজেকে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের উত্তরসূরী হিসেবে বিবেচনা করত এবং ওসমানীয় সাম্রাজ্যের রাজধানী কন্সটান্টিনোপল (বর্তমান ইস্তাম্বুল) ছিল অর্থোডক্স খ্রিস্টীয় সভ্যতার কেন্দ্র, যেটি দখলের মাধ্যমে রাশিয়ার ‘ঐতিহাসিক উদ্দেশ্য’ পূরণ হবে বলে রুশ জাতীয়াতাবাদীরা মনে করত।

১৮৫৪ সালে পেত্রোপাভলভস্কের যুদ্ধে ইঙ্গ–ফরাসি জোটের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত কামান। Source: Wikimedia Commons

ব্রিটেন, ফ্রান্স ও অস্ট্রিয়া রুশদের এই পরিকল্পনার বিরোধী ছিল। রুশদেরকে তারা ইউরোপীয় নয়, বরং অর্ধ–এশীয় বর্বর জাতি হিসেবে বিবেচনা করত; ওসমানীয় ভূমিতে সম্ভাব্য রুশ সাম্রাজ্য বিস্তারের ফলে রাশিয়ার শক্তি বৃদ্ধিকে তারা ইউরোপের ‘ক্ষমতার ভারসাম্যে’র প্রতি হুমকি হিসেবে বিবেচনা করত (কিন্তু ফ্রান্স ওসমানীয় সাম্রাজ্যের কর্তৃত্ব থেকে আলজেরিয়া দখল করে নিলে বা ব্রিটেন একের পর এক ভারতীয় রাজ্য দখল করে নিলেও সেটিকে ‘ক্ষমতার ভারসাম্যে’র প্রতি হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হত না); এবং রাশিয়ার স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা ও পোলিশদের স্বাধীনতা সংগ্রাম দমনের কারণে ইউরোপীয় জনসাধারণ রাশিয়াকে নেতিবাচকভাবে দেখত (যদিও তাদের নিজেদের রাষ্ট্রগুলোর কোনোটিই পুরোপুরি গণতান্ত্রিক ছিল না এবং ফ্রান্স ও ব্রিটেন যথাক্রমে আলজেরীয় ও ভারতীয়দের স্বাধীনতা সংগ্রাম একইভাবে দমন করলেও সেগুলো তাদের বিবেচনায় আসত না)। তদুপরি, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও অস্ট্রিয়া নিজেরাই ওসমানীয় সাম্রাজ্যের অংশবিশেষ দখল করে নিতে ইচ্ছুক ছিল।
১৮৫০–এর দশকে ফ্রান্স ওসমানীয় সাম্রাজ্যে বসবাসরত রোমান ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের ‘রক্ষাকর্তা’ হিসেবে ওসমানীয় সরকারের কাছ থেকে স্বীকৃতি আদায় করে। এর ফলে রাশিয়াও ওসমানীয় সাম্রাজ্যে বসবাসরত অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের ‘রক্ষাকর্তা’ হিসেবে স্বীকৃতি লাভের দাবি জানায়, যেটি ওসমানীয় সাম্রাজ্য প্রত্যাখ্যান করে। ব্রিটেন ও ফ্রান্সের প্ররোচনায় ওসমানীয় সাম্রাজ্য কূটনৈতিকভাবে এই সমস্যার সমাধান করতে অস্বীকৃতি জানায়। প্রত্যুত্তরে রাশিয়া ১৮২৯ সালে স্বাক্ষরিত আদ্রিয়ানোপলের চুক্তি অনুযায়ী ওসমানীয় সাম্রাজ্যের অন্তর্গত কিন্তু ১৮২৯ সাল থেকে রুশ প্রভাবাধীন দানিয়ুবীয় রাজ্যগুলোতে (Danubian Principalities), অর্থাৎ মোলদাভিয়া ও ওয়ালাসিয়ায়, সৈন্য প্রেরণ করে। এরপর ব্রিটেন ও ফ্রান্সের প্ররোচনায় ওসমানীয় সাম্রাজ্য ১৮৫৩ সালের ১৬ অক্টোবর রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।
১৮৫৩ সালের ৩০ নভেম্বর সিনোপের নৌযুদ্ধে রুশ নৌবাহিনীর নিকট ওসমানীয় নৌবাহিনী সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত হয়। ব্রিটিশ ও ফরাসি প্রচার মাধ্যম এটিকে ‘সিনোপের গণহত্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে এবং এটিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে ১৮৫৪ সালের ২৮ মার্চ রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। রাশিয়া যুদ্ধ এড়ানোর জন্য মোলদাভিয়া ও ওয়ালাসিয়া থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়, কিন্তু এরপরও ব্রিটেন ও ফ্রান্স রাশিয়ার ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল।
বস্তুত ওসমানীয় সাম্রাজ্যকে রক্ষা করা বা ইউরোপে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা ব্রিটেন বা ফ্রান্সের মূল উদ্দেশ্য ছিল না। ফ্রান্স ১৮১২–১৮১৫ সালের যুদ্ধে পরাজয়ের জন্য রাশিয়ার ওপর প্রতিশোধ নিতে ইচ্ছুক ছিল। ব্রিটেনের উদ্দেশ্য ছিল রুশ নৌবাহিনীকে ধ্বংস করা (যাতে ভবিষ্যতে এটি ব্রিটিশ রাজকীয় নৌবাহিনীর জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে না পারে), কৃষ্ণসাগরে রুশ সামরিক উপস্থিতির অবসান ঘটানো (যাতে রাশিয়া ভবিষ্যতে ভূমধ্যসাগরে প্রবেশাধিকার লাভ না করে) এবং ককেশাস ও কাস্পিয়ান অঞ্চল থেকে রুশদেরকে বিতাড়িত করা।
১৮৫৪ সালের ১৭ অক্টোবর ব্রিটিশ, ফরাসি ও ওসমানীয় সৈন্যরা রাশিয়ার ক্রিমিয়া উপদ্বীপ আক্রমণ করে এবং রুশদের প্রবল প্রতিরোধ সত্ত্বেও দীর্ঘ এক বছর ধরে অবরোধ করে রাখার পর তারা ১৮৫৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর কৃষ্ণসাগরের তীরে অবস্থিত রুশ নৌঘাঁটি সেভাস্তোপোল দখল করে নিতে সক্ষম হয়। কিন্তু রুশ–অধিকৃত ককেশাসে ওসমানীয় আক্রমণ ব্যর্থ হয় এবং রুশ সৈন্যরা ওসমানীয় ভূমিতে অগ্রসর হয়। বাল্টিক ও শ্বেত সাগরে ইঙ্গ–ফরাসি নৌবাহিনী রুশ নৌবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়, কিন্তু রুশ নৌবাহিনীর দুর্বলতা সত্ত্বেও তারা ইঙ্গ–ফরাসি আক্রমণ প্রতিহত করতে সক্ষম হয়। সুদূর প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে এশীয় রাশিয়ার পেত্রোপাভলভস্কেও ইঙ্গ–ফরাসি নৌবাহিনী আক্রমণ চালায়, কিন্তু পরাজিত হয়।
এই যুদ্ধ ইতিহাসে ‘ক্রিমিয়ার যুদ্ধ’ নামে পরিচিতি অর্জন করেছে। যদিও ক্রিমিয়া ছিল এই যুদ্ধের অনেকগুলো রণাঙ্গনের একটি, কিন্তু রুশবিরোধী জোট যেহেতু শুধু ক্রিমিয়াতেই রুশদেরকে পরাজিত করতে পেরেছিল, এজন্য তাদের ইতিহাসে এটি ক্রিমিয়ার যুদ্ধ নামে পরিচিতি লাভ করে। রুশ ইতিহাসে এটি ‘প্রাচ্যের যুদ্ধ’ (Восточная война) নামেই বেশি পরিচিত।
এই যুদ্ধে রাশিয়া আক্রমণে ১,১০,০০০ ব্রিটিশ, ৩,১০,০০০ ফরাসি, ১,৬৫,০০০ ওসমানীয় (যাদের মধ্যে ছিল ৪০,০০০ মিসরীয় ও ১০,০০০ তিউনিসীয় সৈন্য) এবং ২১,০০০ সার্ডিনীয় সৈন্য – সর্বমোট ৬,০৬,০০০ সৈন্য – অংশগ্রহণ করেছিল। এদের মধ্যে ২২,১৮২ জন ব্রিটিশ, ৯৫,৬১৫ জন ফরাসি, ৪৫,৪০০ জন ওসমানীয় এবং ২,১৬৬ জন সার্ডিনীয় সৈন্য – সর্বমোট ১,৬৫,৩৬৩ জন সৈন্য – প্রাণ হারায়। ৮,৯০,০০০ সৈন্যের বিশাল রুশ সশস্ত্রবাহিনীর মোট ৩,২৫,০০০ সৈন্য এই যুদ্ধে অংশ নেয় এবং ১,৩০,০০০ রুশ সৈন্য এই যুদ্ধে প্রাণ হারায়। এদের মধ্যে অধিকাংশ সৈন্যই যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর হাতে নয়, বরং বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছিল।
সেভাস্তোপোলের পতন রাশিয়াকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করার জন্য যথেষ্ট ছিল না। কিন্তু সেভাস্তোপোলের পতনের পর অস্ট্রিয়া ও সুইডেনের রুশবিরোধী জোটে যোগ দেয়ার এবং ইউক্রেন ও ফিনল্যান্ডে রুশদেরকে আক্রমণ করার সম্ভাবনা দেখা দেয়। এতগুলো শক্তির বিরুদ্ধে একই সময়ে যুদ্ধ করার সামর্থ্য রাশিয়ার ছিল না এবং প্রায় তিন বছরব্যাপী যুদ্ধের ফলে রুশ অর্থনীতি প্রায় ভেঙে পড়েছিল। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে রাশিয়া ইঙ্গ–ফরাসি জোটের শর্ত মেনে নিয়ে ১৮৫৬ সালের ৩০ মার্চ প্যারিসের চুক্তিতে স্বাক্ষর করে।
এই চুক্তির ফলে রাশিয়া সেভাস্তোপোলকে সম্পূর্ণরূপে অসামরিকীকৃত (demilitarized) করতে বাধ্য হয় এবং কৃষ্ণসাগরে নৌবহর রাখার অধিকার হারায়। তদুপরি, রাশিয়া ওসমানীয় সাম্রাজ্যের অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের ‘রক্ষাকর্তা’ হিসেবে স্বীকৃতি লাভের দাবি প্রত্যাহার করে নেয়, মোলদাভিয়া ও ওয়ালাসিয়ায় রুশ প্রভাবের অবসান ঘটে এবং রাশিয়া মোলদাভিয়ার কাছে দক্ষিণ বেসারাবিয়া হস্তান্তর করতে বাধ্য হয়। সর্বোপরি, এই যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে রাশিয়া উত্তর আমেরিকায় অবস্থিত রুশ উপনিবেশ আলাস্কার নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং ১৮৬৭ সালে সুবৃহৎ আলাস্কাকে নামেমাত্র মূল্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিক্রি করে দেয়।
এই যুদ্ধের ফলাফল ছিল রুশদের জন্য চরম অবমাননাকর। এই যুদ্ধের ফলে রাশিয়ার পশ্চাৎপদতা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই অবস্থা কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যে রুশরা তাদের সশস্ত্রবাহিনী ও অবকাঠামোর আধুনিকায়নের জন্য ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করে, ভূমিদাস প্রথার উচ্ছেদ করে এবং শিল্পায়ন আরম্ভ করে। ১৮৭০–১৮৭১ সালের ফরাসি–জার্মান যুদ্ধে জার্মানির কাছে ফ্রান্সের শোচনীয় পরাজয়ের পর রাশিয়া প্যারিসের চুক্তিকে বাতিল ঘোষণা করে এবং সেভাস্তোপোলের সামরিকায়ন ও কৃষ্ণসাগরে নৌবহর নির্মাণ শুরু করে এবং ১৮৭৭–১৮৭৮ সালের রুশ–ওসমানীয় যুদ্ধের পর দক্ষিণ বেসারাবিয়া পুনর্দখল করে নেয়।

জাপানি আক্রমণ (১৯০৪–১৯০৫)


১৮৫৩–১৮৫৬ সালের যুদ্ধে ইঙ্গ–ফরাসি জোটের কাছে পরাজয়ের পর রুশ সশস্ত্রবাহিনীর ব্যাপক আধুনিকায়ন শুরু হয়। এই নতুন রুশ সশস্ত্রবাহিনী ১৮৬০ থেকে ১৮৯০ সালের মধ্যে মধ্য এশিয়ার বিশাল অঞ্চল দখল করে নেয় এবং ১৮৭৭–১৮৭৮ সালের যুদ্ধে ওসমানীয় সাম্রাজ্যকে পরাজিত করে বলকান রাষ্ট্রগুলোকে ওসমানীয় শাসন থেকে মুক্ত করে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকেও রাশিয়ার পশ্চাৎপদতার অবসান ঘটে নি এবং তখনো রাশিয়া অর্থনৈতিক, সামরিক ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো থেকে পিছিয়ে ছিল।

১৯০৫ সালে মুকদেনের যুদ্ধের সময় রুশ অশ্বারোহী সৈন্যরা জাপানি সৈন্যদের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করছে। Source: Wikimedia Commons

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে রাশিয়া দূরপ্রাচ্যে সাম্রাজ্য বিস্তারে আগ্রহী হয়ে ওঠে এবং মাঞ্চুরিয়া (উত্তর–পূর্ব চীন) ও কোরিয়ায় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে রাশিয়া ও জাপানের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়৷ ১৮৯০–এর দশকে রাশিয়া কোরিয়ায় প্রভাব বিস্তার করে এবং ১৮৯৯–১৯০১ সালে চীনে বিদেশি প্রভাবের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দেখা দিলে সেই বিদ্রোহ দমনের সুযোগ নিয়ে মাঞ্চুরিয়ায় লক্ষাধিক সৈন্য প্রেরণ করে। ১৯০২ সালে জাপান ও ব্রিটেনের মধ্যে একটি রুশবিরোধী মৈত্রীচুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং জাপান রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে থাকে।
১৯০৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জাপান যুদ্ধ ঘোষণা ব্যতিরেকে মাঞ্চুরিয়ায় অবস্থিত রাশিয়ার পোর্ত–আর্তুর (ইংরেজিতে পোর্ট আর্থার) নৌঘাঁটি আক্রমণ করলে রুশ–জাপানি যুদ্ধ শুরু হয়। মাঞ্চুরিয়া, কোরিয়া, পীত সাগর এবং জাপান সাগরে রুশ ও জাপানিদের মধ্যে তীব্র যুদ্ধ শুরু হয়। জলে ও স্থলে প্রতিটি যুদ্ধে রুশরা জাপানিদের কাছে পরাজিত হতে থাকে, কারণ জাপানিদের রণকৌশল ও অস্ত্রশস্ত্র ছিল রুশদের চেয়ে উন্নত, জাপানি সৈন্যদের মনোবল ও রণস্পৃহা ছিল রুশ সৈন্যদের চেয়ে অনেক বেশি এবং ইউরোপীয় রাশিয়া থেকে দূরপ্রাচ্যে সৈন্য ও রসদপত্র সরবরাহ ছিল রুশদের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। তদুপরি, জাপানি গোয়েন্দা সংস্থা রাশিয়ার অভ্যন্তরে বিপ্লবী দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে তাদেরকে সরকারবিরোধী বিদ্রোহ করার জন্য প্ররোচনা দেয়, যার ফলে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও মারাত্মক অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। ব্রিটেন রাশিয়াকে দুর্বল করে ফেলার জন্য এই যুদ্ধে জাপানকে ব্যাপক অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা প্রদান করে।
প্রায় ৬,৫০,০০০ জাপানি সৈন্য এবং ৭,০০,০০০ রুশ সৈন্য এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। এই যুদ্ধে ৮০,৩৭৮ থেকে ৮৬,১০০ জন জাপানি সৈন্য নিহত হয়। অন্যদিকে, এই যুদ্ধে ৪৩,৩০০ থেকে ৭১,৪৫৩ জন রুশ সৈন্য নিহত ও ১,৪৬,০৩২ জন আহত হয়, এবং ৭৪,৩৬৯ জন রুশ সৈন্য জাপানিদের হাতে বন্দি হয়। এছাড়া, এই যুদ্ধ চলাকালে প্রায় ২০,০০০ বেসামরিক চীনা নরনারী রুশ ও জাপানি সৈন্যদের হাতে প্রাণ হারায়।
১৯০৫ সালের প্রথমার্ধের মধ্যে জাপানিরা রুশদেরকে প্রতিটি স্থল ও নৌযুদ্ধে পরাজিত করে এবং দক্ষিণ মাঞ্চুরিয়ায় অবস্থিত রুশ উপনিবেশগুলো ও শাখালিন দ্বীপ দখল করে নেয়। তবুও রুশরা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে ইচ্ছুক ছিল, কারণ রাশিয়ার সৈন্যসংখ্যা, শিল্প উৎপাদন ক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক সামর্থ্য ছিল জাপানের চেয়ে বেশি, অন্যদিকে জাপানের অর্থনীতি যুদ্ধের চাপে প্রায় ভেঙে পড়েছিল। এজন্য রুশদের ধারণা ছিল, দীর্ঘমেয়াদে যুদ্ধ চললে তারাই বিজয়ী হবে। কিন্তু ১৯০৫ সালের রুশ বিপ্লবের ফলে রুশ সরকারের অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়ে এবং অবশেষে ১৯০৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় রাশিয়া ও জাপানের মধ্যে পোর্টসমাউথের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
এই চুক্তির ফলে রাশিয়া দক্ষিণ মাঞ্চুরিয়া ও কোরিয়ায় জাপানি আধিপত্য স্বীকার করে নেয় এবং উত্তর মাঞ্চুরিয়া থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়। তদুপরি, দক্ষিণ মাঞ্চুরিয়ায় অবস্থিত রুশ উপনিবেশ ও নৌঘাঁটি এবং শাখালিন দ্বীপের দক্ষিণাংশ রাশিয়া জাপানের নিকট হস্তান্তর করতে বাধ্য হয়। সর্বোপরি, এই যুদ্ধের ফলে রুশ প্রশান্ত মহাসাগরীয় ও বাল্টিক নৌবহর সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়।
একটি এশীয় শক্তির কাছে সুবিশাল রুশ সাম্রাজ্যের পরাজয় ছিল রুশদের জন্য অপমানজনক। এই যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে রুশ সাম্রাজ্যের দুর্বলতা বিশ্বের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দূরপ্রাচ্যে সাম্রাজ্য বিস্তারে ব্যর্থ হয়ে রাশিয়া ইউরোপের প্রতি মনোনিবেশ করে, ফলে জার্মানি ও অস্ট্রিয়া–হাঙ্গেরির সঙ্গে রাশিয়ার সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে ওঠে। এক দশকের মধ্যে এই সংঘর্ষ প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেয়।

কেন্দ্রীয় শক্তির আক্রমণ (১৯১৪–১৯১৮)


১৯১৪ সালের ২৮ জুন একজন বসনীয় সার্ব সন্ত্রাসবাদী অস্ট্রিয়া–হাঙ্গেরির যুবরাজকে খুন করে। অস্ট্রিয়া–হাঙ্গেরি এজন্য রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র রাষ্ট্র সার্বিয়াকে দায়ী করে এবং ১৯১৪ সালের ২৮ জুলাই সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। প্রত্যুত্তরে ২৯ জুলাই রাশিয়া অস্ট্রিয়া–হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে আংশিক সৈন্য সমাবেশের ঘোষণা দেয়। এর প্রত্যুত্তরে ১ আগস্ট জার্মানি এবং ৬ আগস্ট অস্ট্রিয়া–হাঙ্গেরি রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ফ্রান্স, ব্রিটেন ও জাপানও এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে এবং শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ।

১৯১৬ সালে ‘ব্রুসিলভ আক্রমণাভিযানে’র সময় অগ্রসরমান রুশ অশ্বারোহী সৈন্যদল। Source: Wikimedia Commons

যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে রাশিয়া জার্মানির পূর্ব প্রাশিয়া ও অস্ট্রিয়া–হাঙ্গেরির গ্যালিসিয়া আক্রমণ করে। পূর্ব প্রাশিয়ায় রুশরা পরাজিত হয়, কিন্তু গ্যালিসিয়ায় বিজয়ী হয়। অক্টোবরে একজন জার্মান নৌ কর্মকর্তার নেতৃত্বে ওসমানীয় নৌবাহিনী রাশিয়ার ওদেসা বন্দরে গোলাবর্ষণ করলে রাশিয়া, ব্রিটেন ও ফ্রান্স ওসমানীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ১৯১৫ সালে জার্মান ও অস্ট্রো–হাঙ্গেরীয় সৈন্যরা রুশদেরকে পরাজিত করে রুশ–অধিকৃত পোল্যান্ড দখল করে নেয়, কিন্তু ককেশাস অঞ্চলে রুশদের কাছে ওসমানীয় সৈন্যরা পরাজিত হয়। ১৯১৬ সালে রুশদের ‘ব্রুসিলভ আক্রমণাভিযানে’র ফলে অস্ট্রো–হাঙ্গেরীয় সেনাবাহিনী প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়, কিন্তু জার্মান হস্তক্ষেপের ফলে অস্ট্রিয়া–হাঙ্গেরি রক্ষা পায়। ককেশাস অঞ্চলেও রুশ বাহিনী ওসমানীয় ভূমিতে অগ্রসর হয়।
কিন্তু যুদ্ধে বিপুল পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি, যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারের দুর্নীতি ও অকর্মণ্যতা এবং যুদ্ধের ফলে জনসাধারণের অশেষ ভোগান্তির ফলে রুশরা ক্রমশ যুদ্ধবিরোধী ও সরকারবিরোধী হয়ে ওঠে এবং ১৯১৭ সালের মার্চে রাজধানী পেত্রোগ্রাদে একটি বিপ্লবের ফলে রাশিয়ায় রাজতন্ত্রের পতন ঘটে। তদস্থলে একটি অস্থায়ী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে, কিন্তু সমগ্র রাশিয়া জুড়ে নৈরাজ্য ছড়িয়ে পড়ে। জুলাইয়ে রুশ বাহিনীর ‘কেরেনস্কি আক্রমণাভিযান’ শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয় এবং জার্মান সৈন্যরা বাল্টিক অঞ্চল দখল করে রাজধানী পেত্রোগ্রাদের সন্নিকটে এসে উপস্থিত হয়।
এদিকে ১৯১৭ সালের নভেম্বরে বলশেভিকরা রাশিয়ার ক্ষমতা দখল করে এবং যুদ্ধ বন্ধ করার ঘোষণা প্রদান করে। তারা জার্মানদের সঙ্গে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে, কিন্তু জার্মানরা শান্তির জন্য যেসব কঠোর শর্ত আরোপ করে, সেগুলো নতুন সোভিয়েত রুশ সরকার প্রত্যাখ্যান করে। এর ফলে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কেন্দ্রীয় শক্তির (Central Powers) সৈন্যরা আবার যুদ্ধ শুরু করে এবং ইউক্রেন দখল করে নেয়। এসময় বিপ্লবের ফলে সৃষ্ট অরাজকতার কারণে রুশ সশস্ত্রবাহিনী সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়েছিল এবং কেন্দ্রীয় শক্তির সৈন্যদেরকে বাধা দেয়ার মতো ইচ্ছা বা সামর্থ্য কোনোটাই তাদের ছিল না।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ১,৭৩,৮৫৮ জন জার্মান ও ৭,৩০,০০০ অস্ট্রো–হাঙ্গেরীয় সৈন্য – মোট ৯,০৩৮৫৮ জন সৈন্য – নিহত হয়, এবং ১১,৫১,১৫৩ জন জার্মান ও ২১,৭২,০০০ অস্ট্রো–হাঙ্গেরীয় সৈন্য – মোট ৩৩,২৩,১৫৩ জন সৈন্য – আহত হয়। ১,৪৩,৮১৮ জন জার্মান এবং ১৪,৭৯,০০০ অস্ট্রো–হাঙ্গেরীয় সৈন্য – মোট ১৬,২২,৮১৮ জন সৈন্য – রুশদের হাতে বন্দি হয়। এছাড়া প্রায় ৩,০০,০০০ ওসমানীয় সৈন্য রুশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে হতাহত অথবা বন্দি হয়। তদুপরি, অস্ট্রো–হাঙ্গেরীয় মাটিতে যুদ্ধ চলাকালে প্রায় ১,২০,০০০ বেসামরিক অস্ট্রো–হাঙ্গেরীয় নরনারী সরাসরি যুদ্ধের ফলে এবং ৪,৬৭,০০০ বেসামরিক মানুষ যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষ ও রোগব্যাধির কারণে মৃত্যুমুখে পতিত হয়।
অন্যদিকে, এই যুদ্ধে ২২,৫৪,৩৬৯ জন রুশ সৈন্য নিহত ও ৩৭,৪৯,০০০ জন আহত হয়, এবং ৩৩,৪৩,৯০০ জন রুশ সৈন্য জার্মান, অস্ট্রো–হাঙ্গেরীয় বা ওসমানীয়দের হাতে বন্দি হয়। তদুপরি, প্রায় ৪,১০,০০০ বেসামরিক রুশ সরাসরি যুদ্ধের ফলে এবং প্রায় ৭,৩০,০০০ বেসামরিক রুশ যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষ বা মহামারীর ফলে প্রাণ হারায়।
১৯১৮ সালের ৩ মার্চ সোভিয়েত রাশিয়া কেন্দ্রীয় শক্তির সঙ্গে ব্রেস্ত–লিতোভস্কের চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়। এই চুক্তির ফলে পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া, লাতভিয়া, এস্তোনিয়া, ফিনল্যান্ড ও ইউক্রেন এবং বেলারুশের অধিকাংশ সোভিয়েত রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এছাড়া সোভিয়েত রাশিয়া ওসমানীয় সাম্রাজ্যের নিকট কার্স, আরদাহান ও বাতুমি অঞ্চলত্রয় হস্তান্তর করতে বাধ্য হয়। এই চুক্তির ফলে রাশিয়া তার মোট জনসংখ্যার ৩৪℅, মোট শিল্পাঞ্চলের ৫৪%, মোট কয়লাখনির ৮৯℅ এবং মোট রেলপথের ২৬℅ কেন্দ্রীয় শক্তির কাছে হারায়। তদুপরি, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সোভিয়েত রাশিয়া তার সশস্ত্রবাহিনীকে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দিতে এবং জার্মানিকে ৬০০ কোটি (বা ৬ বিলিয়ন) স্বর্ণের মার্ক (gold marks) ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রদান করতে বাধ্য হয়।
ব্রেস্ত–লিতোভস্কের চুক্তি ছিল রুশ ইতিহাসের সবচেয়ে অপমানজনক চুক্তি। এই চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে রাশিয়া অবমাননাকরভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে বের হয়ে আসে। অবশ্য, সোভিয়েত নেতৃবৃন্দ এই চুক্তিকে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি ছাড়া অন্য কিছু হিসেবে বিবেচনা করেন নি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে কেন্দ্রীয় শক্তির পরাজয়ের পর সোভিয়েত রাশিয়া এই চুক্তিকে বাতিল বলে ঘোষণা করে এবং পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যে ইউক্রেন ও বেলারুশের অংশবিশেষ এবং বাতুমি অঞ্চলটি পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়, কিন্তু রুশ গৃহযুদ্ধের কারণে বাকি অঞ্চলগুলো তাদের হাতছাড়া হয়ে যায়।

মিত্রশক্তির আক্রমণ (১৯১৮–১৯২৫)


১৯১৭ সালের নভেম্বরে ভ্লাদিমির লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকদের ক্ষমতা দখলের পর রাশিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। রুশ গৃহযুদ্ধের মতো জটিল বহুপাক্ষিক যুদ্ধ সম্ভবত পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কমই হয়েছে। বিশাল রুশদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অসংখ্য দল ছিল এবং এদের সঙ্গে যুক্ত হয় বিভিন্ন বিদেশি শক্তি। বলশেভিকরা প্রথমে পেত্রোগ্রাদে এবং পরবর্তীতে মস্কোতে নিজেদেরকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিল, কিন্তু বিশাল রুশদেশের সকল অংশে তাদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় নি। বলশেভিকবিরোধী শ্বেত বাহিনী এবং বাল্টিক সাগর থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য দলের বিরুদ্ধে বলশেভিকরা যুদ্ধে লিপ্ত হয়।

১৯১৯ সালে আর্খানজেলস্কে ব্রিটিশ সৈন্যদের কাছ থেকে দখলকৃত একটি ‘মার্ক–৪’ ট্যাঙ্ক। Source: Wikimedia Commons

তখনো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছিল এবং বলশেভিকরা এই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিলে মিত্রশক্তি তাদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়। বলশেভিকরা সমস্ত রাষ্ট্রের কৃষক ও শ্রমিকদের বিপ্লবের মাধ্যমে তাদের শাসকশ্রেণিকে উৎখাত করার আহবান জানালে তারা রাষ্ট্রবিপ্লবের আশঙ্কায় শঙ্কিত হয়। বলশেভিকদের ক্ষমতা থেকে উৎখাত করে একটি বলশেভিকবিরোধী সরকারকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা এবং রাশিয়াকে পুনরায় জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামানোর উদ্দেশ্যে তারা রাশিয়ায় সৈন্য প্রেরণ করে। এভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালেই মিত্রশক্তি রাশিয়া আক্রমণ করে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে রাশিয়া বন্দি অস্ট্রো–হাঙ্গেরীয় সৈন্যদের মধ্য থেকে জাতিগত চেক ও স্লোভাক সৈন্যদের নিয়ে ‘চেকোস্লোভাক লেজিয়ন’ (Czechoslovak Legion) গঠন করেছিল এবং এই বাহিনীটি অস্ট্রিয়া–হাঙ্গেরির কাছ থেকে চেক ও স্লোভাক–অধ্যুষিত অঞ্চলগুলো মুক্ত করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের উদ্দেশ্যে পূর্ব রণাঙ্গনে মিত্রশক্তির পক্ষে যুদ্ধ করেছিল। বলশেভিকরা কেন্দ্রীয় শক্তির সঙ্গে যুদ্ধবিরতি সম্পাদন করলে এই বাহিনীটি বলশেভিকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিশাল ট্রান্স–সাইবেরীয় রেলপথ দখল করে নেয়। এই বাহিনীটিকে উদ্ধার করা ছিল মিত্রশক্তির ঘোষিত উদ্দেশ্য, কিন্তু তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য কারোরই অজানা ছিল না।
বলশেভিকদের ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে ব্রিটেন (এবং ব্রিটিশ কর্তৃত্বাধীন কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও ভারত), ফ্রান্স, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান গৃহযুদ্ধ–কবলিত রাশিয়ায় সৈন্য প্রেরণ করে, এবং গ্রিস, ইতালি, রুমানিয়া, সার্বিয়া ও চীন এদের সঙ্গে যোগদান করে। উত্তর রাশিয়ায় ব্রিটেন, ফ্রান্স ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৪,০০০ সৈন্য প্রেরণ করে। বাল্টিক অঞ্চলে ব্রিটেন সৈন্য মোতায়েন করে। দক্ষিণ রাশিয়া ও ইউক্রেনে ফ্রান্স ১৬,০০০ ও গ্রিস ২৩,০০০ সৈন্য প্রেরণ করে। বেসারাবিয়ায় রুমানিয়া ৫০,০০০ সৈন্য প্রেরণ করে। সাইবেরিয়া ও দূরপ্রাচ্যে জাপান ৭০,০০০, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ৭,০০০ এবং ব্রিটেন, ফ্রান্স ও চীন স্বল্পসংখ্যক সৈন্য প্রেরণ করে, তদুপরি সেখানে প্রায় ৭০,০০০ চেকোস্লোভাক সৈন্য ছিল। ককেশাস এবং মধ্য এশিয়াতেও ব্রিটেন সৈন্য প্রেরণ করে।
এই আক্রমণে অংশগ্রহণকারীদের সকলেই বলশেভিকদের ক্ষমতাচ্যুত করার ব্যাপারে একমত হলেও প্রত্যেকেরই নিজস্ব পরিকল্পনা ছিল। বিশেষত বিশ্বযুদ্ধে কেন্দ্রীয় শক্তির পরাজয় সুনিশ্চিত হওয়ার পর মিত্রশক্তি যুদ্ধবিধ্বস্ত রাশিয়ায় সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য আগ্রহী হয়ে ওঠে। উত্তর রাশিয়ার ব্রিটেন, ফ্রান্স ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণের উদ্দেশ্য ছিল ঐ অঞ্চল থেকে বলশেভিকদের বিতাড়িত করা, আর্খানজেলস্ক বন্দরে মজুদকৃত মিত্রশক্তির সরবরাহকৃত অস্ত্রশস্ত্র বাজেয়াপ্ত করা এবং মিত্রশক্তির নিয়ন্ত্রণাধীনে একটি পুতুল সরকার প্রতিষ্ঠা করা। বাল্টিক অঞ্চলে ব্রিটেনের আক্রমণের উদ্দেশ্য ছিল বাল্টিক সাগরে ব্রিটিশ নৌ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা, এতদঞ্চল থেকে বলশেভিকদের বিতাড়িত করা এবং এস্তোনিয়া ও লাতভিয়াকে সোভিয়েত রাশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করার মাধ্যমে বাল্টিক সাগরে প্রবেশাধিকার থেকে রুশদেরকে বঞ্চিত করা। দক্ষিণ রাশিয়া ও ইউক্রেনে ফ্রান্স ও গ্রিসের আক্রমণের উদ্দেশ্য ছিল এই অঞ্চল থেকে জার্মান সৈন্য প্রত্যাহার নিশ্চিত করা, বলশেভিকদের বিতাড়িত করে এক বা একাধিক পুতুল সরকার প্রতিষ্ঠা করা এবং এতদঞ্চলে একটি ‘অর্থনৈতিক প্রভাব বলয়’ প্রতিষ্ঠা করা। বেসারাবিয়ায় রুমানিয়ার আক্রমণের উদ্দেশ্য ছিল এই অঞ্চল থেকে বলশেভিকদের বহিষ্কার করা এবং অঞ্চলটিকে রাশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে রুমানিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত করে ‘বৃহত্তর রুমানিয়া’ গঠন করা।

একটি জাপানি প্রচারণামূলক পোস্টার, যাতে বলা হয়েছে, ‘আমরা জল, স্থল ও আকাশপথে আক্রমণ করব এবং শত্রুকে সাইবেরিয়া থেকে বিতাড়িত করব’। Source: Wikimedia Commons

সাইবেরিয়া ও দূরপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের আক্রমণের উদ্দেশ্য ছিল এই অঞ্চলে বলশেভিকদের বিতাড়িত করে শ্বেত বাহিনীকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা এবং এই অঞ্চলে জাপানি প্রভাব বিস্তার রোধ করা। অন্যদিকে, জাপানের এই অঞ্চলে আক্রমণের উদ্দেশ্য ছিল এই বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ অঞ্চলটি সরাসরি দখল করে নেয়া কিংবা এতদঞ্চলে এক বা একাধিক পুতুল সরকার প্রতিষ্ঠা করে বলশেভিক রাশিয়া ও জাপানের মধ্যে একটি ‘নিরপেক্ষ অঞ্চল’ (buffer zone) প্রতিষ্ঠা করা। ককেশাস অঞ্চলে ব্রিটেনের আক্রমণের উদ্দেশ্য ছিল এতদঞ্চলে জার্মান বা তুর্কি প্রভাব বিস্তার রোধ করা, বলশেভিকদের বিতাড়িত করা এবং বাকু অঞ্চলের তেলক্ষেত্রগুলোর ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মধ্য এশিয়ায় ব্রিটেনের আক্রমণের উদ্দেশ্য ছিল এই অঞ্চলে বলশেভিকবিরোধী পুতুল সরকার প্রতিষ্ঠা করা, অঞ্চলটিকে রুশ নিয়ন্ত্রণ থেকে বিচ্ছিন্ন করা এবং এর মাধ্যমে ব্রিটিশ–শাসিত ভারতবর্ষে সম্ভাব্য বলশেভিক আক্রমণের পথ রুদ্ধ করা।
মিত্রশক্তির রাশিয়া আক্রমণের ফলাফল ছিল মিশ্র। মিত্রবাহিনী প্রযুক্তিগতভাবে বলশেভিক সৈন্যদের থেকে উন্নত ছিল এবং তারা স্থানীয় বিভিন্ন বলশেভিকবিরোধী দলের সহায়তা লাভ করেছিল। কিন্তু মিত্রবাহিনীর বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ছিল, তাদের সৈন্যরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণের পর ক্লান্ত ও যুদ্ধবিমুখ ছিল, বলশেভিক প্রচারণায় অনেক মিত্রসৈন্য বিদ্রোহভাবাপন্ন হয়ে উঠেছিল এবং বলশেভিক সৈন্য ও গেরিলারা সর্বত্র মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। এমতাবস্থায় মিত্রবাহিনীর সাফল্য ছিল সীমিত। রুমানিয়া বেসারাবিয়া দখল করে নেয় এবং ব্রিটিশ সহায়তায় এস্তোনিয়া ও লাতভিয়া রাশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
কিন্তু অন্যান্য রণাঙ্গনে মিত্রশক্তি ব্যর্থ হয়। ১৯২০ সালের মধ্যে রুশ গৃহযুদ্ধে বলশেভিকদের জয় সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং এর ফলে জাপান ছাড়া অন্যান্য মিত্রপক্ষীয় রাষ্ট্র রাশিয়া থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়। জাপানিরা রুশ দূরপ্রাচ্য ও সাইবেরিয়ার একাংশ এবং শাখালিন দ্বীপের উত্তরাংশ দখল করে রাখে, কিন্তু সোভিয়েতদের ক্রমাগত প্রতিআক্রমণের মুখে এবং জাপানি অর্থনীতির ওপরে প্রচণ্ড চাপ পড়ায় তারাও রাশিয়া থেকে সৈন্য প্রত্যাহারে বাধ্য হয়। ১৯২২ সালে রুশ দূরপ্রাচ্য ও সাইবেরিয়া থেকে এবং ১৯২৫ সালে উত্তর শাখালিন থেকে জাপানি সৈন্য প্রত্যাহার সম্পন্ন হয়।
মিত্রশক্তির এই আক্রমণ ছিল রাশিয়ার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এই আক্রমণের ফলে রুশ গৃহযুদ্ধ প্রলম্বিত হয় এবং রাশিয়া বিপুল পরিমাণ আর্থিক, সামরিক ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়। চেকোস্লোভাক সৈন্যরা বলশেভিকদের বিরুদ্ধে প্রচুর নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ চালায় এবং জাপানি সৈন্যরা বলশেভিক ও সাধারণ রুশদের বিরুদ্ধে ব্যাপক হারে হত্যাযজ্ঞ, নারী ধর্ষণ ও লুণ্ঠন পরিচালনা করে। মিত্রশক্তির অন্যান্য সৈন্যরাও এই ধরনের অপরাধে জড়িত ছিল, যদিও সেগুলোর মাত্রা ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক কম। উল্লেখ্য, এসময় বলশেভিক এবং বলশেভিকবিরোধীরাও পরস্পরের বিরুদ্ধে নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ চালায়, যেগুলো যথাক্রমে ‘লাল সন্ত্রাস’ (Red Terror) এবং ‘শ্বেত সন্ত্রাস’ (White Terror) নামে পরিচিতি অর্জন করে। এছাড়া এসময় রাশিয়ার বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন দল জাতিগত, মতাদর্শগত ও ধর্মীয় নিধনযজ্ঞ চালিয়েছিল।

পোলিশ আক্রমণ (১৯১৯–১৯২০)


প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রথমে রাশিয়া এবং পরবর্তীতে জার্মানি ও অস্ট্রিয়া–হাঙ্গেরির পরাজয়ের ফলে পোল্যান্ড স্বাধীনতা লাভ করে। রুশ গৃহযুদ্ধ এবং রাশিয়ায় মিত্রশক্তির আক্রমণের সুযোগে পোল্যান্ড রাশিয়ার জাতিগত ইউক্রেনীয় ও বেলারুশীয়–অধ্যুষিত ভূমি দখল করে নিয়ে পোল্যান্ডের সীমানা পূর্বদিকে বর্ধিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯১৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি পোল্যান্ড ইউক্রেনীয় বলশেভিকবিরোধীদের সহায়তায় সোভিয়েত রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চল আক্রমণ করে। ইউক্রনীয় বলশেভিকদের সঙ্গে প্রলম্বিত ও বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের পর ১৯২০ সালের এপ্রিলে পোলিশ সৈন্যরা কিয়েভ দখল করে নেয়।

১৯২০ সালের এপ্রিলে কিয়েভে পোলিশ সৈন্যরা। Source: Wikimedia Commons

কিন্তু এরপর রুশ ও ইউক্রেনীয় বলশেভিকদের পাল্টা আক্রমণে পোলিশ সৈন্যরা ইউক্রেন থেকে পশ্চাৎপসরণ করে। বলশেভিকরা তাদের পশ্চাদ্ধাবন করে পোল্যান্ডে প্রবেশ করে এবং পোল্যান্ডে বলশেভিক শাসন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে রাজধানী ওয়ারশের দিকে অগ্রসর হয়। বলশেভিকদের ধারণা ছিল, পোল্যান্ডের পতন হলে জার্মানি ও পশ্চিম ইউরোপের শ্রমিক শ্রেণি তাদের নিজ নিজ সরকারের বিরুদ্ধে বিপ্লব ঘটাবে এবং পোল্যান্ড অতিক্রম করে বলশেভিক ‘লাল ফৌজ’ তাদেরকে সহায়তা করার জন্য অগ্রসর হবে।
মিত্রশক্তি একই আশঙ্কায় যে কোনো মূল্যে বলশেভিকদের কাছে পোল্যান্ডের পতন রোধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। ফরাসি সামরিক উপদেষ্টা এবং ব্রিটিশ ও মার্কিন স্বেচ্ছাসেবকরা পোলিশ সশস্ত্রবাহিনীতে যোগ দিয়ে বলশেভিকদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনায় নেতৃত্ব প্রদান করে। ১৯২০ সালের আগস্টে ওয়ারশ–এর যুদ্ধে পোলিশ ও ফরাসি সৈন্যদের নিকট বলশেভিকরা পরাজিত হয় এবং পশ্চাৎপসরণে বাধ্য হয়। পোলিশ সৈন্যরা তাদের পশ্চাদ্ধাবন করে এবং বলশেভিক নিয়ন্ত্রিত বেলারুশ ও ইউক্রেনে আবার আক্রমণ চালায়। পোলিশ আক্রমণের গতি রোধ করতে ব্যর্থ হয়ে বলশেভিকরা যুদ্ধবিরতির জন্য অনুরোধ করে এবং ১৯২০ সালের ১৮ অক্টোবর উভয় পক্ষের মধ্যে রিগা শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
এই যুদ্ধের জন্য পোল্যান্ড প্রায় ১০ লক্ষ সৈন্য মোতায়েন করেছিল। যুদ্ধে প্রায় ৪৭,০০০ পোলিশ সৈন্য নিহত ও ১,১৩,৫১৮ জন আহত হয়, এবং ৫১,৩৫১ জন পোলিশ সৈন্য বলশেভিকদের হাতে বন্দি হয়। অন্যদিকে, বলশেভিকরা এই যুদ্ধের জন্য প্রায় ৮,০০,০০০ থেকে ৯,৫০,০০০ সৈন্য মোতায়েন করেছিল। যুদ্ধে ৬৭,০০০ থেকে ৭০,০০০ বলশেভিক সৈন্য নিহত হয় এবং ৮০,০০০ থেকে ১,৫৭,০০০ সৈন্য পোলিশদের হাতে বন্দি হয়। তদুপরি, রিগার সন্ধি অনুসারে বলশেভিকরা পশ্চিম ইউক্রেন ও পশ্চিম বেলারুশ পোল্যান্ডের নিকট হস্তান্তর করতে বাধ্য হয়।

জাপানি আক্রমণ (১৯৩৮–১৯৩৯)


১৯৩০–এর দশকে জাপান মাঞ্চুরিয়া দখল করে নিয়ে সেখানে একটি পুতুল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার পর জাপান ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে একটি স্থল সীমান্ত স্থাপিত হয়। জাপান সোভিয়েত দূরপ্রাচ্য ও সাইবেরিয়ায় সাম্রাজ্য বিস্তার করতে আগ্রহী ছিল এবং ১৯৩০–এর দশক জুড়ে জাপান ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে ছোট ছোট সীমান্ত সংঘর্ষ চলতে থাকে। জাপানি সেনাবাহিনী সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপরে একটি ঝটিকা আক্রমণ চালিয়ে এশীয় সোভিয়েত ইউনিয়ন দখল করে নেয়ার পরিকল্পনা করতে থাকে।

১৯৩৯ সালে খালখিন গোলের যুদ্ধে দখলকৃত জাপানি কামানের সঙ্গে সোভিয়েত সৈন্যরা। Source: Wikimedia Commons

১৯৩৮ সালের জুলাইয়ে জাপানিরা সোভিয়েত সীমান্তবর্তী খাসান হ্রদ অঞ্চলে আক্রমণ চালায় এবং এর উদ্দেশ্য ছিল এতদঞ্চলে সোভিয়েত ইউনিয়নের শক্তিমত্তা পরীক্ষা করা। জুলাই থেকে আগস্ট পর্যন্ত জাপানি ও সোভিয়েতদের মধ্যে পুরোদমে যুদ্ধ চলে। এই যুদ্ধে ৭,০০০ থেকে ৭,৩০০ জাপানি সৈন্য অংশ নেয় এবং তাদের মধ্যে ৫২৬ জন সৈন্য নিহত ও ৯১৩ জন আহত হয়। অন্যদিকে, প্রায় ২৩,০০০ সোভিয়েত সৈন্য এই যুদ্ধে অংশ নেয় এবং তাদের মধ্যে ৭৯২ জন সৈন্য নিহত বা নিখোঁজ ও ৩,২৭৯ জন আহত হয়। যুদ্ধ শেষে জাপানি সৈন্যরা খাসান হ্রদ অঞ্চল থেকে পশ্চাৎপসরণ করে।
খাসান হ্রদের যুদ্ধে সোভিয়েতরা বিজয়ী হয়, কিন্তু জনবল ও অস্ত্রবল বেশি থাকা সত্ত্বেও জাপানিদের তুলনায় তাদের ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়। এই বিষয়টি বিবেচনা করে জাপানিরা এতদঞ্চলে সোভিয়েতদের দুর্বলতা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়। ফলে জাপানিরা আরেকবার সোভিয়েতদের মুখোমুখি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ১৯৩৯ সালের মে মাসে জাপান ও জাপানি–নিয়ন্ত্রিত মাঞ্চুকুয়ো সোভিয়েত মিত্র রাষ্ট্র মঙ্গোলিয়ার খালখিন গোল নদী অঞ্চলে আক্রমণ চালায়।
২০,০০০ থেকে ৩০,০০০ জাপানি ও মাঞ্চুরীয় সৈন্য এবং ৬২,০০০ থেকে ৭৪,০০০ সোভিয়েত ও মঙ্গোলীয় সৈন্য এই যুদ্ধে অংশ নেয়। জাপানি সৈন্যরা যুদ্ধে অসীম সাহসিকতা প্রদর্শন করে, কিন্তু সোভিয়েতদের উন্নততর রণকৌশল ও অস্ত্রশস্ত্রের কাছে তারা পরাজিত হয়। এই যুদ্ধে ৮,৪৪০ জন জাপানি সৈন্য নিহত ও ৮,৭৬৬ জন আহত হয়, এবং প্রায় ৩,০০০ জাপানি ও মাঞ্চুরীয় সৈন্য সোভিয়েতদের হাতে বন্দি হয়। অন্যদিকে, এই যুদ্ধে ৯,৭৯৩ জন সোভিয়েত সৈন্য নিহত বা নিখোঁজ এবং ১৫,৯৫২ জন আহত হয়। তদুপরি, ৫৫৬ থেকে ৯৯০ জন মঙ্গোলীয় সৈন্য এই যুদ্ধে হতাহত হয়। ১৬ সেপ্টেম্বর উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হয়। ততদিনে ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।
খালখিন গোলের যুদ্ধে জাপানিদের শোচনীয় পরাজয়ের পর জাপানি সেনাবাহিনীর সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণের পরিকল্পনা পরিত্যক্ত হয়, কারণ এই যুদ্ধে এটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল যে, সোভিয়েতরা সাইবেরিয়া ও দূরপ্রাচ্য রক্ষা করতে সক্ষম এবং প্রযুক্তিগত ও সংখ্যাগত দিক থেকে তারা জাপানিদের চেয়ে বেশি শক্তিশালী। এর ফলে এশিয়ায় সম্ভাব্য একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন রক্ষা পায় এবং ইউরোপের দিকে মনোনিবেশ করতে সক্ষম হয়।

অক্ষশক্তির আক্রমণ (১৯৪১–১৯৪৫)


১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে জার্মানি পোল্যান্ড, ডেনমার্ক, নরওয়ে, বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ, নেদারল্যান্ডস ও ফ্রান্স দখল করে নেয় এবং ১৯৪১ সালে ইতালির সঙ্গে মিলে গ্রিস ও যুগোস্লাভিয়া দখল করে নেয়। ১৯৪১ সালের মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটেন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন ছাড়া ইউরোপের সমস্ত রাষ্ট্র হয় অক্ষশক্তির দখলে ছিল কিংবা অক্ষশক্তির সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলছিল।
সোভিয়েত ইউনিয়ন এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রুশ সাম্রাজ্যের হারানো অংশগুলো পুনরুদ্ধার করার এবং সম্ভাব্য জার্মান আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সোভিয়েত রাষ্ট্রসীমা যতদূর সম্ভব পশ্চিমে প্রসারিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। জার্মানদের কাছে পোল্যান্ড পরাজিত হওয়ার পর সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯২০ সালে পোল্যান্ডের কাছে হারানো পশ্চিম ইউক্রেন ও পশ্চিম বেলারুশের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৩৯–১৯৪০ সালে ফিনল্যান্ডের সঙ্গে একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন ফিনল্যান্ডের ১০% ভূমি দখল করে নেয়। ১৯৪০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ৩টি বাল্টিক রাষ্ট্র লিথুয়ানিয়া, লাতভিয়া ও এস্তোনিয়াকে অঙ্গীভূত করে নেয় এবং রুমানিয়ার কাছ থেকে ১৯১৮ সালে হারানো বেসারাবিয়া ও দক্ষিণ বাকুভিনা পুনর্দখল করে।
১৯৪১ সালের ২২ জুন অক্ষশক্তি যুদ্ধ ঘোষণা ব্যতিরেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করে। জার্মানি, রুমানিয়া, হাঙ্গেরি, ইতালি, ফিনল্যান্ড, জার্মান–নিয়ন্ত্রিত স্লোভাকিয়া ও জার্মান–ইতালীয় যৌথ নিয়ন্ত্রণাধীন ক্রোয়েশিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্র থেকে আগত স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী এই আক্রমণে অংশ নেয়। প্রায় ৪০ লক্ষ সৈন্যের বিশাল অক্ষবাহিনী অপ্রস্তুত সোভিয়েত ইউনিয়নের অভ্যন্তরে দ্রুতগতিতে অগ্রসর হতে থাকে। এটি ছিল মানব ইতিহাসের বৃহত্তম আক্রমণকারী বাহিনী।

১৯৪৫ সালে জার্মানির বার্লিনে সোভিয়েত সৈন্যরা। Source: Sputnik News

এই যুদ্ধকে জার্মান নেতা অ্যাডলফ হিটলার এই যুদ্ধকে অভিহিত করেছিলেন ‘নিশ্চিহ্ন করার যুদ্ধ’ (war of annihilation) হিসেবে। চরম ইহুদিবিদ্বেষী ও বর্ণবাদী জার্মান উগ্র জাতীয়তাবাদী সরকার সোভিয়েত ইউনিয়নকে ‘ইহুদি বলশেভিকদের দ্বারা শসিত’ এবং স্লাভ ও এশীয় ‘অবমানব’–অধ্যুষিত একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্র হিসেবে দেখত। এই যুদ্ধে জার্মানির উদ্দেশ্য ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রযন্ত্র ও সশস্ত্রবাহিনীকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়া, সোভিয়েত জনসাধারণের তিন–চতুর্থাংশকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলে অবশিষ্ট এক–চতুর্থাংশকে জার্মানদের দাসে পরিণত করা, ককেশাস অঞ্চলের তেলসম্পদের ওপর জার্মান নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা এবং উরাল পর্বতমালা পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের বিস্তৃত অঞ্চলকে জার্মান উপনিবেশে পরিণত করা।
রুমানিয়ার উদ্দেশ্য ছিল সোভিয়েত মোলদাভিয়ার সম্পূর্ণ অংশ এবং সোভিয়েত ইউক্রেনের একাংশ দখল করে ‘বৃহত্তর রুমানিয়া’র সৃষ্টি করা। হাঙ্গেরির উদ্দেশ্য ছিল সোভিয়েত ইউক্রেনের অংশবিশেষ দুখল করে হাঙ্গেরির সীমা বৃদ্ধি করা। ইতালির উদ্দেশ্য ছিল ক্রিমিয়া উপদ্বীপ দখল করে সেখানে একটি ইতালীয় উপনিবেশ স্থাপন করা এবং কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করা। ফিনল্যান্ডের উদ্দেশ্য ছিল কারেলিয়াসহ উত্তর রাশিয়ার একটি বিস্তৃত অংশ দখল করে ‘বৃহত্তর ফিনল্যান্ড’ প্রতিষ্ঠা করা।
যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে সোভিয়েত বিমানবাহিনী প্রায় সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায় এবং সোভিয়েত সেনাবাহিনী বিপুল ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়। ১৯৪১ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে অক্ষবাহিনী সোভিয়েত ইউনিয়নের তদানীন্তন ১৬টি প্রজাতন্ত্রের মধ্যে ৭টি (ইউক্রেন, মোলদাভিয়া, বেলারুশ, লিথুয়ানিয়া, লাতভিয়া, এস্তোনিয়া ও কারেলিয়া) সম্পূর্ণরূপে দখল করে নেয় এবং পশ্চিম রাশিয়ার অধিকাংশ স্থান দখল করে রাজধানী মস্কোর দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়। কিন্তু লেনিনগ্রাদ দখল করতে অক্ষবাহিনী ব্যর্থ হয় এবং ১৯৪১ সালের ডিসেম্বরে সোভিয়েত প্রতিআক্রমণে অক্ষবাহিনী মস্কোর দ্বারপ্রান্ত থেকে পশ্চাৎপসরণ করতে বাধ্য হয়।
১৯৪২ সালে অক্ষবাহিনী ককেশাস দখলের প্রচেষ্টা চালায়, কিন্তু ব্যর্থ হয়। স্তালিনগ্রাদ এবং কুরস্কের যুদ্ধে সোভিয়েতরা অক্ষবাহিনীর বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করার পর যুদ্ধের চাকা ঘুরে যায়। ১৯৪৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন পশ্চিম ইউরোপে জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে, অন্যদিকে, সোভিয়েতরা লেনিনগ্রাদের যুদ্ধে জয়লাভ করে, প্রায় সমস্ত হারানো ভূমি পুনরুদ্ধার করে এবং অক্ষশক্তির সদস্য রাষ্ট্রগুলোর দিকে ধাবিত হয়। তারা রুমানিয়া ও হাঙ্গেরি দখল করে নেয়, ফিনল্যান্ডকে একটি সন্ধিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করে, জার্মান মিত্র রাষ্ট্র বুলগেরিয়ায় সৈন্য প্রেরণ করে, জার্মান–অধিকৃত যুগোস্লাভিয়ার একাংশ ও পোল্যান্ডকে মুক্ত করে এবং জার্মানিতে প্রবেশ করে। ১৯৪৫ সালের এপ্রিলে সোভিয়েত সৈন্যরা জার্মানির রাজধানী বার্লিন দখল করে এবং মে মাসে চেকোস্লোভাকিয়াকে মুক্ত করে। ১৯৪৫ সালের ৯ মে জার্মানি মিত্রশক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করে।
১৯৪৫ সালের আগস্টে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মঙ্গোলিয়া জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। সোভিয়েত সৈন্যরা জাপানিদেরকে পরাজিত করে মাঞ্চুরিয়া ও কোরীয় উপদ্বীপ থেকে বিতাড়িত করে এবং কুরিল দ্বীপপুঞ্জ ও ১৯০৫ সালে জাপানের দখল করে নেয়া দক্ষিণ শাখালিন পুনর্দখল করে নেয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্ব রণাঙ্গন ছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বিধ্বংসী যুদ্ধ। এই যুদ্ধে ৪১,৩৭,১০০ জন জার্মান সৈন্য নিহত হয় এবং প্রায় ৩০ লক্ষ জার্মান সৈন্য সোভিয়েতদের হাতে বন্দি হয়, যাদের মধ্যে ৪,৫০,৬০০ জন বন্দিদশায় মৃত্যুবরণ করে। এছাড়া ২,৮১,০০০ রুমানীয়, প্রায় ৩ লক্ষ হাঙ্গেরীয়, ৮২,০০০ ইতালীয়, ৬৩,২০৪ জন ফিনিশ এবং ৮৩,৭৩৭ জন জাপানি এই যুদ্ধে নিহত হয়। প্রায় ৫ লক্ষ রুমানীয়, ৫ লক্ষ হাঙ্গেরীয়, ৭০,০০০ ইতালীয়, ৩,৫০০ ফিনিশ এবং ৬,৪০,০০০ জাপানি সৈন্য সোভিয়েতদের হাতে বন্দি হয়। এছাড়া প্রায় ২,১৫,০০০ সোভিয়েত নাগরিক, যারা অক্ষবাহিনীতে যোগদান করেছিল, এই যুদ্ধে নিহত হয়। উল্লেখ্য, এটি শুধু সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নিহত ও বন্দি অক্ষবাহিনীর সৈনিকদের হিসাব।
অন্যদিকে, এই যুদ্ধে প্রায় ৬৪ লক্ষ সোভিয়েত সৈন্য নিহত হয় এবং ১,৪৬,৮৫,৫৯৩ জন সোভিয়েত সৈন্য আহত হয়। তদুপরি, প্রায় ৫৭ লক্ষ সোভিয়েত সৈন্য যুদ্ধ চলাকালে অক্ষবাহিনীর হাতে বন্দি হয় এবং এদের মধ্যে প্রায় ৩৬ লক্ষ সৈন্য বন্দি অবস্থায় প্রাণ হারায়। বিশ্বের কোনো সশস্ত্রবাহিনী কোনো একক যুদ্ধে এই পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয় নি।
এই যুদ্ধের ফলে সোভিয়েত বেসামরিক জনসাধারণের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল আরো ব্যাপক। প্রায় ১৫ লক্ষ সোভিয়েত বেসামরিক নাগরিক যুদ্ধের ফলে (গোলাবর্ষণ, বিমান হামলা বা অন্যান্য কারণে) নিহত হয়। প্রায় ৭১ লক্ষ স্লাভ (রুশ, ইউক্রেনীয় ও বেলারুশীয়), ইহুদি এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষকে জার্মান ও অন্যান্য অক্ষ সৈন্যরা পরিকল্পিতভাবে খুন করে। লক্ষ লক্ষ সোভিয়েত নরনারীকে দাস শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করার জন্য জার্মানিতে প্রেরণ করা হয় এবং প্রায় ১৮ লক্ষ সোভিয়েত এই প্রক্রিয়ায় প্রাণ হারায়৷ তদুপরি, যুদ্ধের কারণে এবং জার্মানদের কার্যকলাপের ফলে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষে প্রায় ৫৫ লক্ষ সোভিয়েত নাগরিক মৃত্যুমুখে পতিত হয়৷ এভাবে অক্ষশক্তির আক্রমণের ফলে প্রায় ১ কোটি ৫৯ লক্ষ বেসামরিক সোভিয়েত নাগরিক নিহত হয়। ১৯৪৬–১৯৪৭ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হওয়া ক্ষয়ক্ষতির কারণে যে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, তার ফলে আরো প্রায় ১০ থেকে ১৫ লক্ষ সোভিয়েত নাগরিক প্রাণ হারায়।
শুধু তাই নয়, জার্মান ও অন্যান্য অক্ষশক্তির সৈন্যরা সোভিয়েত ইউনিয়ন দখলকালে ১ কোটিরও বেশি সংখ্যক সোভিয়েত নারীকে ধর্ষণ করে এবং এই যুদ্ধ চলাকালে সোভিয়েত ইউনিয়নে ১০ লক্ষাধিক যুদ্ধশিশুর জন্ম হয়। এছাড়া, অক্ষশক্তির আক্রমণের ফলে সোভিয়েত ইউনিয়নের ১,৭১০টি শহর, ৭০,০০০ গ্রাম, ২,৫০৮টি গির্জা, ৩১,৮৫০টি শিল্পকারখানা, ৬৪,০০০ কি.মি. রেলপথ, ৪,১০০টি রেল স্টেশন, ৪০,০০০ হাসপাতাল, ৮৪,০০০ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ৪৩,০০০ গ্রন্থাগার সম্পূর্ণরূপে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। অক্ষবাহিনী সোভিয়েত ইউনিয়নের ৭০ লক্ষ ঘোড়া, ১ কোটি ৭০ লক্ষ গরু, ২ কোটি শূকর এবং ২ কোটি ৭০ লক্ষ ভেড়া হয় মেরে ফেলে নয়ত জার্মানি ও অন্যান্য রাষ্ট্রে নিয়ে যায়। তদুপরি, এই যুদ্ধের ফলে প্রায় আড়াই কোটি সোভিয়েত নাগরিক গৃহহীন হয়ে পড়ে।
সামগ্রিকভাবে, এই যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন অর্থনৈতিকভাবে সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত হয়। কিন্তু এই যুদ্ধে বিজয়ের ফলে সোভিয়েত ইউনিয়ন একটি পরাশক্তিতে পরিণত হয়। পোল্যান্ড ও ফিনল্যান্ড ছাড়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপে হারানো প্রায় সমস্ত ভূমি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ফিরে পায়। এছাড়া, সোভিয়েত ইউনিয়ন রুমানিয়ার কাছ থেকে দক্ষিণ বাকুভিনা, হাঙ্গেরির কাছ থেকে কার্পেথীয় রুথেনিয়া, জার্মানির কাছ থেকে কালিনিনগ্রাদ এবং জাপানের কাছ থেকে দক্ষিণ শাখালিন ও কুরিল দ্বীপপুঞ্জ লাভ করে। পোল্যান্ড, রুমানিয়া, হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়া, ফিনল্যান্ড, আলবেনিয়া, যুগোস্লাভিয়া, চেকোস্লোভাকিয়া, জার্মানির পূর্বাংশ এবং কোরিয়ার উত্তরাংশে সোভিয়েত–নিয়ন্ত্রিত বা সোভিয়েত–প্রভাবাধীন সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়।
সোভিয়েত সৈন্যরাও পূর্ব ও মধ্য ইউরোপ দখলকালে যুদ্ধাপরাধে লিপ্ত ছিল। প্রায় ৩,৪০,০০০ জার্মান ও ৪০,০০০ হাঙ্গেরীয় বেসামরিক নরনারী সরাসরি সোভিয়েত সৈন্যদের হাতে অথবা যুদ্ধের ফলে নিহত হয়। এছাড়া, ২ লক্ষ থেকে ২০ লক্ষ জার্মান এবং ৫,০০০ থেকে ২ লক্ষ হাঙ্গেরীয় নারী অগ্রসরমান সোভিয়েত সৈন্যদের দ্বারা ধর্ষিত হয় বলে অভিযোগ ওঠে, যদিও এই বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে এবং স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালে সোভিয়েত ইউনিয়নকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করার জন্য ও জার্মানদের নিজেদের যুদ্ধাপরাধকে বৈধ প্রতিপন্ন করার জন্য এই বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত আকারে প্রকাশ করা হয়। তবে সোভিয়েত সামরিক কর্তৃপক্ষ বহু ক্ষেত্রে যুদ্ধাপরাধে লিপ্ত সৈন্যদের শাস্তি প্রদান করত, যেটা অক্ষশক্তির সদস্যরা প্রায় কখনোই করে নি।
ভবিষ্যৎ?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন একটি সামরিক পরাশক্তি এবং পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাদের বিদেশি আগ্রাসনের স্বীকার হওয়ার ভয় সর্বদাই তাদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ধ্বংসাত্মক পারমাণবিক যুদ্ধের সম্ভাবনা। স্নায়ুযুদ্ধের পুরোটা সময় জুড়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে একটি সর্বাত্মক যুদ্ধের আশঙ্কায় শঙ্কিত ছিল।
বিশেষত ১৯৫০–এর দশকে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক অস্ত্রের দিক থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের চেয়ে অগ্রসর ছিল, তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপরে একটি মার্কিন–নেতৃত্বাধীন আক্রমণের ভয় সোভিয়েত নেতৃবৃন্দের মনে সব সময়ই ছিল। এসময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নরওয়ে থেকে জাপান পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের চতুর্দিকে সামরিক ঘাঁটি দিয়ে ঘিরে ফেলে, যেটি সোভিয়েতদের বিদেশি আক্রমণভীতিকে আরো বাড়িয়ে তোলে।
এর ফলে সোভিয়েতরা পূর্ব ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোতে মস্কোর প্রতি অনুগত সরকারগুলোকে ক্ষমতায় রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল, যাতে অঞ্চলটি সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পশ্চিম ইউরোপের মধ্যে ‘বাফার জোন’ হিসেবে কাজ করে। সোভিয়েতদের উদ্দেশ্য ছিল, পশ্চিমাদের সঙ্গে পরবর্তী যে কোনো যুদ্ধ যেন সোভিয়েত ইউনিয়নের মাটিতে নয়, বরং পূর্ব বা পশ্চিম ইউরোপের মাটিতে সংঘটিত হয়। তদুপরি, বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্বের বৃহত্তম সশস্ত্রবাহিনী গড়ে তোলে। সশস্ত্রবাহিনীর পিছনে বিপুল পরিমাণ অর্থব্যয় ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নে অর্থনৈতিক সঙ্কট দেখা দেয়ার অন্যতম কারণ, যা সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনকে ত্বরান্বিত করেছিল।
১৯৬০–এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন পারমাণবিক অস্ত্রের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমতা অর্জন করে এবং এর ফলে তাদের মার্কিন আক্রমণভীতি আংশিক দূরীভূত হয়। কিন্তু এসময় চীনের সঙ্গে তাদের আদর্শগত ও সীমান্ত সমস্যা সংক্রান্ত বিরোধ শুরু হয় এবং ১৯৬৯ সালে চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে একটি ছোটখাটো সীমান্ত যুদ্ধও হয়। এর ফলে ১৯৭০–এর দশক জুড়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন দূরপ্রাচ্য, সাইবেরিয়া ও মধ্য এশিয়ায় লক্ষ লক্ষ চীনা সৈন্যের অতর্কিত আক্রমণের আশঙ্কায় ভীত ছিল, যদিও বাস্তবে এ ধরনের আক্রমণ চালানোর সামর্থ্য তখন চীনের ছিল না।

১৯৬৯ সালে চীনা–সোভিয়েত সীমান্তে কেজিবির সীমান্তরক্ষী সৈন্যরা। Source: HSDL.org

১৯৮০–এর দশকে আফগান যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন ধর্মীয় উগ্রপন্থী গেরিলাদের পরাজিত করতে ব্যর্থ হয় এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ১৯৯০–এর দশকে রুশ ফেডারেশন চেচেন যুদ্ধে উগ্রপন্থী গেরিলাদের হাতে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। এর ফলে সোভিয়েত–উত্তর রাশিয়ায় উগ্রপন্থী গেরিলা আক্রমণের আতঙ্ক সৃষ্টি হয় এবং ১৯৯৯ সালে চেচেন উগ্রপন্থী যোদ্ধারা রাশিয়ার দাগেস্তান আক্রমণ করলে রুশদের এই আতঙ্ক বাস্তবতা লাভ করে।
এর ফলে রুশরা আক্রমণকে আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে গ্রহণ করে এবং ১৯৯৯ সালে চেচনিয়া আক্রমণ করে সেখানে রুশ শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। ফলে ধর্মীয় উগ্রপন্থীরা চেচনিয়াকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে একটি ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ হারায়। ২০১৫ সালে রাশিয়া যে সিরীয় গৃহযুদ্ধে সিরীয় সরকারের পক্ষে যুদ্ধে যোগদান করে, তার একটি অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে, যেসব রুশ ও মধ্য এশীয় মুসলিম সিরিয়ায় বিভিন্ন উগ্রপন্থী দলের সঙ্গে যোগ দিয়েছে, তারা যেন জীবিত অবস্থায় রাশিয়ার মাটিতে ফিরতে না পারে সেটি নিশ্চিত করা।
কিন্তু ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের ভয়ের চেয়ে আরেকটি ভয় রুশদের মধ্যে বেশি মাত্রায় রয়েছে, যেটি স্নায়ুযুদ্ধকালীন সময়েও ছিল। সেটি হচ্ছে মার্কিন–নেতৃত্বাধীন জোট এবং চীনের আক্রমণের ভয়। এই ভয় যে পুরোপুরি অমূলক তা নয়। স্নায়ুযুদ্ধের পর সোভিয়েত–নেতৃত্বাধীন ওয়ারশ জোট বিলুপ্ত হয়েছে, কিন্তু মার্কিন–নেতৃত্বাধীন ন্যাটো এখনো সক্রিয় রয়েছে। বস্তুত, ন্যাটোকে বিলুপ্ত করার পরিবর্তে এটিকে বর্ধিত করা হয়েছে এবং রাশিয়া ছাড়া প্রাক্তন ওয়ারশ জোটের সকল সদস্য এখন ন্যাটোর সদস্য। প্রাক্তন সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র লিথুয়ানিয়া, লাতভিয়া ও এস্তোনিয়া ন্যাটো জোটে যোগদান করেছে এবং ইউক্রেন ও জর্জিয়া ন্যাটোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। অন্যান্য প্রাক্তন সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রও ক্রমশ পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।
স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর রাশিয়া পূর্ব ও মধ্য ইউরোপ থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নিয়েছে, কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম ইউরোপ থেকে সৈন্য প্রত্যাহার তো করেই নি, বরং মধ্য ও পূর্ব ইউরোপেও তাদের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করেছে। মার্কিন–নেতৃত্বাধীন জোট রাশিয়ার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে এবং ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোকে রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক হ্রাস করতে চাপ দেয়ার মাধ্যমে রুশ অর্থনীতিকে ধ্বংস করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত। তদুপরি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একে একে প্রতিটি অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিচ্ছে, যার ফলে রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের আরেকটি অস্ত্র প্রতিযোগিতা (arms race) শুরু হয়েছে। এসবের ফলে রুশদের মধ্যে পশ্চিমা জোটের আক্রমণের একটি ভীতি তৈরি হয়েছে।
সাইবেরিয়া ও দূরপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নিয়েও রুশরা উদ্বিগ্ন। ১৯৯০–এর দশকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যাডেলিন অলব্রাইট মন্তব্য করেছিলেন যে, ‘সাইবেরিয়া এতটাই বড় যে এতে কেবল একটি দেশের অধিকার থাকা উচিত নয়’। এর ফলে প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ সাইবেরিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়েও রুশদের মধ্যে ভীতির সৃষ্টি হয়েছে। তদুপরি, চীন বর্তমানে একটি অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছে এবং চীনের সামরিক শক্তি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে জনবিরল রুশ দূরপ্রাচ্যে চীনা আক্রমণের আশঙ্কাও মস্কোর রয়েছে, যদিও বর্তমানে রাশিয়া ও চীনের মধ্যে সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ।
রুশরা তাদের পুরো ইতিহাস জুড়ে বারংবার বিদেশি আক্রমণের শিকার হয়েছে এবং এর ফলে রাশিয়াকে দিতে হয়েছে চরম মূল্য। বর্তমানেও রাশিয়া বিদেশি আক্রমণের আশঙ্কা থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত নয়। এই নিরাপত্তাহীনতা রুশদেরকে বাধ্য করেছে তাদের সুরক্ষার জন্য বিশাল সামরিক বাহিনী তৈরি করতে। ফলে রাশিয়া পরিণত হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে সামরিকীকৃত রাষ্ট্রগুলোর একটিতে। ১৮৮০–এর দশকে রুশ সম্রাট তৃতীয় আলেক্সান্দর মন্তব্য করেছিলেন, ‘রাশিয়ার কেবল দুইটি মিত্র আছে – সেনাবাহিনী এবং নৌবাহিনী।’ ইতিহাস প্রমাণ করেছে যে, ‘ইউরোপের স্টিমরোলার’ নামে পরিচিত রাশিয়ার এই মিত্ররাই (সশস্ত্রবাহিনী) সর্বোচ্চ ত্যাগের বিনিময়ে রুশ রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করেছে।

References:

1. Evan Andrews, “8 Facts about the Crimean War,” History, March 30, 2016. https://www.google.com/amp/s/www.history.com/.amp/news/8-things-you-may-not-know-about-the-crimean-war
2. “Russo-Japanese War,” Britannica. https://www.britannica.com/event/Russo-Japanese-War
3. Timothy C. Dowling, “Eastern Front,” International Encyclopedia of the First World War. https://encyclopedia.1914-1918-online.net/article/eastern_front
4. Evan Mawdsley, The Russian Civil War, Edinburgh: Birlinn Limited, 2008.
5. Alvin Coox, Nomonhan: Japan against Russia, Stanford University Press, 1985.
6. Liddel Hart, History of the Second World War, Da Capo Press, 1999.

Himel Rahman
Himel Rahman
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্র। প্রাক্তন সোভিয়েত রাষ্ট্রসমূহ এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি ও ইতিহাস নিয়ে আগ্রহী।

Related Stories

Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

error: