‘রমজানের ঐ রোজার শেষে’- নজরুলের এক কালজয়ী গান সৃষ্টির আখ্যান

বিশ্বের জানা-অজানা সব বিষয় নিয়ে আমাদের সাথে লিখতে আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন।

‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’, গানটি যেন বাংলাদেশে রীতিমতো ঈদ উৎসবের আবহ সঙ্গীত হয়ে উঠেছে। ঈদের চাঁদ দেখার সাথে সাথে অর্থাৎ চাঁদ রাতে প্রায় সব জায়গায় এই গান বাজতে শোনা যায়। শুধু তাই না রেডিও বা টেলিভিশন প্রায় সব মিডিয়াতে এই গান বাজবেই। আসলে এই গানটি না বাজলে ঠিক ঈদ বলে যেন মনেই হয়না, বিশেষ করে তো বাংলাদেশে।
আমরা সবাই হয়ত জানি বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম গানটি লিখেছিলেন। কিন্তু এই গান এর জন্ম কিভাবে হয়েছিল আর কিভাবেই তা বাংলাদেশের ঈদ আনন্দের এক  গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে উঠলো তার একটি অনবদ্য ইতিহাস আছে। আজকে সেই ইতিহাসটাই এই লেখনীতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।

গান এর সময়কাল ও পিছনের কিছু কথা


 প্রথমেই বলে নেওয়া ভাল যে, এই গানটি কিন্তু ১৯৩১ সালের সমসাময়িক ট্রেন্ড এর বিপরীতে বিদ্রোহের এক জ্বলন্ত উদাহরণ যেটা পরবর্তীতে নতুন এক ট্রেন্ড এর জন্ম দিয়েছিল, আর এই কীর্তি আসলে শুধু বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের দ্বারাই সম্ভব।
সেই সময়ে বাজারে শ্যামা সঙ্গীতের ধুন্ধুমার কাটতি মানে শ্যামা সঙ্গীতের বিশাল ট্রেন্ড চলছিল। সব শিল্পীরা তখন শ্যামা সঙ্গীত গাইতেই ব্যস্ত। আর গাইবেন ই বা না কেন শ্যামা সঙ্গীত গেয়ে সবাই রাতারাতি বিখ্যাতও হয়ে যাচ্ছিলেন।
যেহেতু শ্যামা সঙ্গীত হিন্দু রীতির একটি সঙ্গীত তাই সমসাময়িক অনেক মুসলিম শিল্পীও হিন্দু নাম ধারণ করে গান গাওয়া শুরু করেছিলেন, কারণ ঐ যে, বিখ্যাত হওয়া। যেমন উদাহরণ হিসাবে তালাত মাহমুদ হয়ে যান তপন কুমার, মুনশী কাশেম হয়ে যান কে মল্লিক, এই রকম তালিকা করলে তালিকা অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে। এমনকি কাজী নজরুল নিজেও শ্যামা সঙ্গীত লিখতেন এবং সুর করতেন। মোট কথা বাজারে তখন শ্যামা সঙ্গীত ছাড়া কোন কথাই ছিল না।     ‍

কালজয়ী এই গান লেখার ইতিবৃ্ত্ত


চারিদিকে শ্যামা সঙ্গীতের জয়জয়কার, এমনি এক সময়ে শ্যামা সঙ্গীতের রেকর্ডিং শেষে বাড়ী ফেরার পথে কাজী নজরুলের সাথে দেখা হয় আব্বাস উদ্দীন আহমেদ এর। এই আব্বাস উদ্দীন আহমেদ আর কেউ নন যাকে আমার সকলেই সুর সম্রাট আব্বাস উদ্দীন আহমেদ হিসাবে চিনি। যাই হোক নজরুলের সাথে আব্বাস উদ্দীন এর দেখা হওয়া কোন কাকতালীয় ব্যাপার ছিল না, আসলে আব্বাস উদ্দীনই পরিকল্পনা করে এসেছিলেন নজরুল এর সাথে দেখা করতে।
আব্বাস উদ্দীন নজরুলকে বললেন, “কাজীদা একটা কথা বলার জন্য তোমার কাছে এসেছি।” এখানে উল্লেখ্য আব্বাস উদ্দীন নজরুলকে ভালবেসে ‘কাজীদা’ বলে ডাকতেন। আব্বাসউদ্দিন বয়সে একটু ছোট হলেও দু জনের সম্পর্ক বন্ধুর মতোই ছিল। যাই হোক নজরুল বললেন, “কি কথা?” আব্বাস উদ্দীন বললেন, “কাজীদা, আসলে কথা বলতে এসেছি বললে ভূল হবে, আমি এসেছি একটি আবদার নিয়ে।” নজরুল অবাক হয়ে বললেন, কি আবদার? বলে ফেলো।”
আব্বাস উদ্দীন আহমেদ সুযোগটা পেয়ে গেলেন এবং বললেন, “কাজীদা, এই যে পেয়ারু কাওয়াল ঈদের সময় কত সুন্দর গান রচনা করে আর এইচএমভি থেকে যখন গ্রামোফোন বের হয়, হাজার হাজার কপি মুসলমানরা কিনে নেয়। তুমি এরকম একটা গান লেখো না?”

আব্বাস উদ্দীন আহমেদ (Image Source: www.wikimedia.org)

আবদার শুনে তো নজরুল কি উত্তর দেবেন ঠিক বুঝে উঠতে পারলেন না। আর বুঝবেনই বা কি করে গানের বাজারে তো তখন শ্যামা সঙ্গীত ছাড়া আর কিছুই চলছে না। স্রোতের বিপরীতে সুর মেলানো চট্টিখানি কথাও না। সবদিক চিন্তা করে নজরুল আব্বাস উদ্দীনকে বললেন, “গান তো আমি লিখতেই পারি কিন্তু রেকর্ড কিভাবে হবে? গান রেকর্ড করতে হলে তো টাকা লাগবে, সরঞ্জাম লাগবে। এগুলোই বা কোথা থেকে আসবে?”
আব্বাস উদ্দীন তখন বললেন, “আমি না হয় ভগবতী বাবুর সাথে কথা বলি।” নজরুল বললেন, “দেখো ভগবতী বাবুকে রাজী করাতে পারো কিনা।” আর এই ভগবতী বাবু ছিলেন সেই সময়কার বিখ্যাত রেকর্ড কোম্পানি এইচ.এম.ভি-র কর্মকর্তা ভগবতী ব্যানার্জি।
আব্বাস উদ্দীন দেরী না করে ভগবতী ব্যানার্জির কাছে ইসলামি গান এর ব্যাপারে কথা বললেন। আব্বাস উদ্দীন এর কথা শুনে ভগবতী ব্যানার্জি বললেন “আব্বাস সাহেব মুসলমানদের পয়সা নেই। তারা রেকর্ড কিনতেও পারবে না। পুঁজোর সময় গান বিক্রি হয়। ঈদের সময় কোন গান বিক্রি হবে না”। অর্থাৎ সরাসরি না করে দিলেন। না করাটাই স্বাভাবিক ছিল। কারণ একে তো শ্যামা সঙ্গীতের চলতি ট্রেন্ড তার উপর আবার মুসলমানদের দূর্বল অর্থনৈতিক অবস্থা। কোন ব্যবসায়ী তো আর লস্ হবে এমন কোন কিছুতে বিনিয়োগ করবেন না। আপনি বা আমি হলেও করতাম না।
কিন্তু আব্বাস উদ্দীন আহমেদও হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র ছিলেন না। ভগবতী ব্যানার্জির পিছনে আঁঠার মত লেগেই থাকলেন। ইতিমধ্যে কেটে গেল প্রায় ছয়টি মাস। ভগবতী ব্যানার্জি কোন মতেই রাজী হচ্ছেন না।
ভাগ্যক্রমে একদিন ভগবতী ব্যানার্জিকে ফুরফুরে মেজাজে পেয়ে গেলেন আব্বাস উদ্দীন। আব্বাস উদ্দীন সুযোগটা মোটেও হাতছাড়া করলেন না। তিনি ভগবতী ব্যানার্জিকে বললেন, “একবার না হয় পরীক্ষামূলক ভাবে অল্প করে রেকর্ডিং করে দেখুন, যদি অবিক্রিত থাকে তাহলে না হয় বাদ দিয়ে দেবেন। ক্ষতি কি একবার পরীক্ষা করে দেখতে?” ভগবতী বাবুও ‘না’ বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলেন, আর কতো ‘না’ বলবেন। অবশেষে ভগবতী বাবু বললেন “আচ্ছা যান, এক্সপেরিমেন্টটা করেই দেখি। গান নিয়ে আসুন।”
ছয় মাসের কষ্টের পর আব্বাস উদ্দীন ভগবতী ব্যানার্জিকে রাজী করাতে পেরে নিজে এতটাই খুশি হয়েছিলেন যে, আর দেরী না করে সোজা কাজী নজরুল ইসলাম এর কাছে চলে যান। নজরুল আব্বাস ‍উদ্দীনকে পান আর চা নিয়ে আসতে বললেন। কারণ নজরুল পান চিবোতে আর চা পান করতে খুবই পছন্দ করতেন।
আব্বাস উদ্দীন অনেকগুলো পান আনলেন। আর নজরুলকে বললেন চা আসছে। পান মুখে নজরুল কাগজ কলম হাতে নিয়ে গান লেখা শুরু করলেন। প্রায় ঘন্টা খানিক পরে আব্বাস উদ্দীনের হাতে একটা কাগজ দিয়ে হাসি মুখে বললেন, “এই নাও।”
আব্বাস উদ্দীন আহমেদ তখন ঐ কাগজটি হাতে নিলেন এবং জোরে জোরে পড়তে শুরু করলেন,
“ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানী তাগিদ।”
গানটি আব্বাস উদ্দীন আহমেদ পুরোটা পড়ার পরে নজরুল বলে উঠলেন, “সুরটা কি এখনই করবো না পরে করবো? আব্বাসউদ্দিন বললেন, কাজীদা তোমার মনের যে অনুভূতিটা, যেটা গানের মধ্যে প্রকাশ করেছ এখন না করলে সেই মজাটা হবে না। এখনই সুরটা করে ফেলো।”

71bangladesh
কাজী নজরুল ইসলাম (Image Source: www.wikimedia.org)

গানটি এক বসায় লেখা ও সুর করা হয়েছিল। গানটি যখন লেখা হয় তখন থেকে ঈদের আর বেশীদিন বাকি ছিল না। তাই গান লেখার অল্প কয়েক দিনের মধ্যে গানের রেকর্ডিং শুরু হয়ে গিয়েছিল। রেকর্ডিং এর সময় কাজী নজরুল ইসলাম নিজেই হারমোনিয়ামের উপর আব্বাস উদ্দীনের চোখ-বরাবর কাগজটি ধরে রেখেছিলেন। অবশেষে সুর সম্রাট, সুরের পাখি, আব্বাস উদ্দীনের কণ্ঠে রেকর্ডিং হলো- “ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ….।” (হিজ মাস্টার্স কোম্পানির রেক রেকর্ড নম্বর এন‌- ৪১১১, প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দ।)

71bangladesh, গান, ঈদ
রেকর্ডিং এর সময় আব্বাস উদ্দীন (Image Source: www.wikimedia.org)

বাজারে আসার অল্প কয়দিনের মধ্যেই গানটির হাজার হাজার কপি রেকর্ড বিক্রি হয়েছিল। আর ভগবতী বাবুও ছিলেন মহাখুশি, ব্যবসা যদি ভাল হয় কে না খুশি হয় বলুন।  এই ভগবতী ব্যানার্জিই একসময় ইসলামি সঙ্গীতের প্রস্তাবে ‘না’ বলে দিয়েছিলেন, পরে তিনি নিজ উদ্যাগে নজরুল ও আব্বাসকে দিয়ে আরো কয়েকটি ইসলামি গান গাইয়ে নিয়েছিলেন।” শুরু হয়েছিল নজরুলের রচনায় আর আব্বাস উদ্দীনের কণ্ঠে ইসলামি গানের চলন। শুরু হয়েছিল ইসলামি সঙ্গীতের আনকোরা এক নতুন ট্রেন্ড।

ঈদ আনন্দে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে ওঠা


কবি নজরুলকে নিয়ে বাংলাদেশে প্রথম গবেষণা শুরু করেন অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম। এই গান সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন, “সেসময়কার বাঙালী মুসলিম সমাজ এই গানটি তখন লুফে নিয়েছিল। অন্য এলাকায় মুসলিমরা গান করলেও বাঙালী মুসলিমের কাছে সঙ্গীত ছিল অপাঙতেও। কিন্তু এই গানটিতে ধর্মীও ভাবধারা আর ঈদের যে খুশি সেটা খুব চমৎকারভাবে ধরা পরেছে।”
আসলে সেই সময় থেকে এই গানের শুধু উত্থানই হয়েছে। এমনকি বিখ্যাত অমুসলিম শিল্পী সতীনাথ মুখার্জি সহ আরো অনেকের কণ্ঠে শোনা গেছে গানটি। আব্বাসউদ্দিনের ছেলে ও মেয়ে মুস্তাফা জামান আব্বাসি ও ফেরদৌসি রহমানও গানটিকে বেশ অনেকখানিই জনপ্রিয় করেছেন।
কিন্তু গানটিকে ধীরে ধীরে আরো বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতার। ঈদের চাঁদ দেখা গেলেই এই গানটি বাজানোর একটি রীতি প্রচলন করেছে সরকারি এই দুটি সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান। যার ফলে এখনকার সময়ে কালজয়ী ও ইতিহাস সৃষ্টিকারী এই গানটি ঈদ আনন্দের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ উঠেছে।
কল্লোল কান্তি মন্ডল
ফার্মাসিস্ট, পাবলিক হেল্থ এক্সপার্ট এবং কন্টেন্ট রাইটার।

Related Stories

Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

error: