প্রাচীন বিশ্বে বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে হত্যা করার প্রক্রিয়াটি খুব প্রচলিত ছিল। সেই সময়ে যারা রাজ্যের ক্ষমতায় থাকতো তাদের মধ্যে অনেকেরই মৃত্যু কাছের মানুষের দ্বারা বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে হয়েছিল। সেইজন্যে সবাই নিজ নিজ আত্মরক্ষার কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। তবে আজকে যার কথা বলবো তিনি আত্মরক্ষার জন্য ভিন্নধর্মী পথ বেছে নিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন পন্টাসের বিখ্যাত রাজা। তিনি বেশি পরিচিত রোমান সাম্রাজ্যের সাথে বিখ্যাত তিনটি মিথ্রিডেটিক যুদ্ধের জন্যে।

মিথ্রিডেটস ষষ্ঠ এর শুরুর জীবন


মিথ্রিডেটস ষষ্ঠ, পুরো নাম মিথ্রিডেটস ষষ্ঠ ইউপেটর ডায়োনিসিয়াস। তিনি সিনোপি শহরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তার বাবা ছিলেন পন্টাস রাজ্যের রাজা মিথ্রিডেটস পঞ্চম। পন্টাস রাজ্যটি এখন তুরস্ক, রাশিয়া, রোমানিয়া এবং গ্রিসের বিভিন্ন অঞ্চল জুড়ে রয়েছে। মিথ্রিডেটস পঞ্চম রাজা হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় অনেক প্রশংসনীয় ছিলেন এবং তার শাসনামলে রোমান প্রজাতন্ত্রের সাথে ছিল ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব সম্পৰ্ক।
মৃত্যু71bd
মিথ্রিডেটস/Image Source: commons.wikimedia.org
মিথ্রিডেটস পঞ্চমকে ১২০ খ্রিষ্টপূর্বে খাদ্যে বিষ মিশিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। বাবার এই আকস্মিক মৃত্যু মিথ্রিডেটস ষষ্ঠকে বিপদে ফেলে দিয়েছিল কারণ তার বা তার ভাইয়ের সিংহাসনে বসার মতো যথেষ্ট বয়স হয়েছিল না। পরবর্তীতে তার মা লাওডিস ষষ্ঠ তার প্রতিনিধি হিসেবে রাজ্য পরিচালনা করেন।
ধারণা করা হয় মিথ্রিডেটস ষষ্ঠ এর বাবার হত্যাকাণ্ডে রাজ্যের উপদেষ্টাদের সাথে তার মাও জড়িত ছিলেন। তাই সে নিজের জীবন হারানোর আশঙ্কায় রাজ্য থেকে আত্মগোপন করেছিলেন। তার বাবার বিষক্রিয়ায় মৃত্যুতে তিনি এতটাই ভয় পেয়েছিলেন যে তাকে যেন কেউ বিষক্রিয়ায় হত্যা করতে না পারে সেজন্য আত্মগোপন থাকাকালে সে অতি অল্প মাত্রায় রোজ খাবারের সাথে বিভিন্ন ধরণের বিষ সেবন করতেন। তিনি বিস্বাস করতেন নিয়মিত অল্প মাত্রায় বিষ সেবনে তার শরীর বিষ প্রতিরোধে সক্ষম হবে। এই সময়ে তিনি বিভিন্ন গবেষণার মাধ্যমে সকল বিষের জন্য সর্বজনীন প্রতিষেধক তৈরি করেছিলেন যা পরবর্তীতে ‘মিথ্রিডেট’ নামে পরিচিত হয়েছিল।

মিথ্রিডেটস ষষ্ঠ এর রাজ্য দখল ও রোমানদের সাথে কলহের কারণ


আনুমানিক ১১৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে তিনি রাজ্যে ফিরে আসেন এবং রাজ্যের দায়িত্ব নিতে চান। তার মাকে সরিয়ে সিংহাসনে বসেন এবং তার মাকে কারাগারে বন্দি করেন তার বাবার হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অপরাধে। পরবর্তীতে জানা যায় মিথ্রিডেটস ষষ্ঠ উনার মা কে ও ছোট ভাই কে হত্যা করেছিলেন। ১১৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে মিথ্রিডেটস ষষ্ঠ এককভাবে রাজ্য শাসন করতে থাকেন।
মিথ্রিডেটস ষষ্ঠ উচ্চাভিলাষী ছিলেন এবং সেই লক্ষ্যে সেনা ও নৌবাহিনী পুনর্গঠন করেছিলেন। তার বাবার সম্প্রসারণবাদী নীতির ধারাবাহিকতায় কৃষ্ণসাগরের উত্তর ও পূর্বাঞ্চল ধরে পশ্চিমে দানিউব পর্যন্ত নিজের সীমানা বৃদ্ধি করেন। এই রাজ্য ‘কিংডম অফ পন্টাস’ (পন্টাসের শাব্দিক অর্থ- কৃষ্ণসাগরের উপকূলীয় এলাকা) নামে পরিচিত হয়। তার পরবর্তী টার্গেট ছিল পন্টাসের পূর্ব প্রতিবেশী পাফলাগোনিয়া, তিনি বিথিনিয়ার রাজা নিকোমেডেস তৃতীয় ইউয়েরজিটসের সহায়তায় খ্রিস্টপূর্ব ১০৮/১০৭ সালে পাফলাগোনিয়া দখল করেছিলেন।
রাজাbangladeshekattor
পন্টাস রাজ্যের মানচিত্র/Image Source: commons.wikimedia.org
যদিও পরে রোমানরা চেষ্টা করেছিলেন পাফলাগোনিয়ার রাজা অ্যাস্ট্রিওডনকে সিংহাসনে ফিরিয়ে আনতে কিন্তু রোমানদের সেই প্রচেষ্টা ব্যার্থ হয়েছিল।
১০৪/১০৩ খ্রিষ্টপূর্বে কলচিস দখল করেন মিথ্রিডেটস ষষ্ঠ। তিনি রাজ্য সম্প্রসারণ করতে থাকেন ফলে রোমান সিনেট শঙ্কিত হয়ে পড়ে। প্রাচ্যে রোমানদের মূলনীতি ছিল যেকোনো উপায়ে রোমের অধিকৃত এলাকায় আধিপত্য বজায় রাখা এবং রোমের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে এমন কাউকে মাথা তুলে দাঁড়াতে না দেওয়া। কিন্তু ৯১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ইতালীয় প্রতিবেশীদের সাথে গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ফলে তারা এশিয়া মাইনরে নতুন করে সামরিক অভিযান চালাতে ইচ্ছুক ছিল না।

বিখ্যাত মিথ্রিডেটিক যুদ্ধ


মিথ্রিডেটস ষষ্ঠ খ্রিস্টপূর্ব ৮৯ সালে রোমের সাথে সরাসরি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছিল, যা প্রথম মিথ্রিডেটিক যুদ্ধের সূচনা করে। যুদ্ধের কারণগুলোর মধ্যে একটি ছিল বিথিনিয়ায় মিথ্রিডেটস ষষ্ঠ এর হস্তক্ষেপ।
রাজাakattorbd
যুদ্ধের রথ/Image Source: commons.wikimedia.org
৯৪ খ্রিষ্টপূর্বে তৃতীয় নিকোমেডেস মারা গিয়েছিলেন এবং তার পুত্র চতুর্থ নিকোমেডেস, ফিলোপেটর রাজা হন। বলা হয় ফিলোপেটর ছিলেন রোমের পুতুল রাজা কিন্তু মিথ্রিডেটস ষষ্ঠ চাইতেন তার ইচ্ছে মতো রাজা বসাতে যেটা রোমের জন্য হুমকিস্বরূপ ছিল। আরেকটি কারণ হিসেবে দেখা হয় মিথ্রিডেটস ষষ্ঠ আরিওবার্জানেসকে পরাজিত করেছিলেন এবং কাপ্পাডোসিয়া দখল করেছিলেন। আরিয়বার্যান্স ছিলেন রোমের মিত্র।
মিথ্রিডেটসakattur
মিথ্রিডেটস চিত্রিত একটি মুদ্রা/Image Source: commons.wikimedia.org/
প্রথম মিথ্রিডেটিক যুদ্ধ ৮৪ খ্রিস্টপূর্ব পর্যন্ত চলেছিল। যুদ্ধের প্রথমে মিথ্রিডেটস ষষ্ঠ সাফল্যের মুখ দেখলেও রোমানদের বিজয়ের মাধ্যমে যুদ্ধের সমাপ্তি হয়েছিল। তবে এই যুদ্ধই শেষ নয় কারণ ৮৩ খ্রিষ্টপূর্বে দ্বিতীয় মিথ্রিডেটিক যুদ্ধ শুরু হয়েছিল এবং ৮১ খ্রিষ্টপূর্ব পর্যন্ত চলেছিল। দ্বিতীয় মিথ্রিডেটিক যুদ্ধে রোমানরা পরাজিত হয়েছিল।
মিথ্রিডেটিকekattorbangladesh
মিথ্রিডেটিক যুদ্ধ/Image Source: commons.wikimedia.org/
আবারও ৭৫ খ্রিষ্টপূর্বে তৃতীয় মিথ্রিডেটিক যুদ্ধ শুরু হয়েছিল এবং মিথ্রিডেটস ষষ্ঠ এর চূড়ান্ত পরাজয়ের মাধ্যমে সেই ঐতিহাসিক যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটেছিল। পরাজয়ের পর তিনি কৃষ্ণ সাগরের উত্তরে পালিয়ে যান।

মিথ্রিডেটস ষষ্ঠ এর মৃত্যু


মিথ্রিডেটস ষষ্ঠ সাহসিকতার সাথে রোমান সাম্রাজ্যের সাথে একা লড়ে গেলেও তিনি সব সময় ভাবতেন যে তার মৃত্যু হবে বিষক্রিয়ার দ্বারা তার বাবার মতো আর এটাই ছিল তার সবচেয়ে বড় ভয়। তাই তার রাজ্য থেকে আত্মগোপনের সময়কালে তিনি বিষক্রিয়া থেকে বাঁচতে রোজ বিভিন্ন ধরণের বিষ খাবারের সাথে প্রতিদিন স্বল্প মাত্রায় সেবন করতেন যাতে পরবর্তীতে বিষ দ্বারা হত্যাচক্রের শিকার হলেও বিষ তার শরীরে কোনো প্রভাব ফেলতে না পারে। তিনি বিষ সম্মন্ধে যথেষ্ট গবেষণা করেছিলেন। তবে শেষ সময়ে তার এই অধ্যাবসাইই তার চরম শত্রু হয়ে দাঁড়াবে সেটি তিনি কল্পনাও করতে পারেননি।
মিথ্রিডেটস71bd
মিথ্রিডেটস বিষপানের সময়/Image Source: commons.wikimedia.org/
বর্তমান সময়েও এই বিষ সেবন প্রক্রিয়াটি মিথ্রিডাটিজম হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন অংশে যেমন যারা সাপ ধরার কাজে নিয়োজিত রয়েছে যারা তারা এই প্রক্রিয়াটি অনুসরণ করে।
মিথ্রিডেটস ষষ্ঠ যখন তার রাজত্ব ও তার সবকিছু  হারিয়ে ফেলেছিলেন তখন তিনি কৃষ্ণ সাগরের উত্তরে এক দুর্গে পালিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে রোমান সৈন্যরা তাকে চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলে এবং তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আত্মহত্যা করবেন কিন্তু তার শরীর ততদিনে বিষ প্রতিরোধক হয়ে উঠেছিল ফলে তিনি বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করতে চাইলেও, পারেননি। পরবর্তীতে তিনি একজন সৈনিককে তার উপর তলোয়ার দ্বারা আঘাত করতে আদেশ দিয়েছিলেন। এইভাবে ৬৬ খ্রিষ্টপূর্বে রোমকে ঘৃনাকারী পন্টিক কিংডম ও তার শাসকের অবসান হয়েছিল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here