কোসেম সুলতান: উসমানীয় সাম্রাজ্যের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারী

বিশ্বের জানা-অজানা সব বিষয় নিয়ে আমাদের সাথে লিখতে আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন।

ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত সবগুলো সাম্রাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে বেশি দিন টিকে থাকা সাম্রাজ্য হলো অটোমান সাম্রাজ্য। ইউরোপ থেকে শুরু করে এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকা পর্যন্ত বিসৃত ছিল এই সাম্রাজ্য। অটোমান ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ছিল মূলত ইসলামিক জীবনধারা নির্ভর।

অটোমান সাম্রাজ্যের পতাকা/ সোর্স: commons.wikimedia.org/

অটোমান সাম্রাজ্যের নির্মম কিছু নিয়মের মধ্যে একটি ছিল সিংহাসনে উঠার জন্য ভ্রাতৃহত্যা বৈধতা, কারণ এমন এক বিশাল সাম্রাজ্যের সিংহাসনে বসতে সবাই চাইতো। অটোমান সাম্রাজ্যে সুলতান মারা যাওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী তার ছেলে হবে পরবর্তী সুলতান কিন্তু যদি একাধিক ছেলে থাকতো সেক্ষেত্রে নিজ শক্তিবলে যে টিকে থাকতো সেই হতে পারতো পরবর্তী সুলতান। সুলতান তৃতীয় মুরাদ তার ১৯ জন ভাইকে হত্যা করে সিংহাসনে আহরণ করেছিলেন।

অটোমান সাম্রাজ্য/ সোর্স: commons.wikimedia.org/

অটোমান রাজপ্রাসাদের হারেম একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল যেখানে সুলতানের দাসীরা থাকতো। অটোমান সুলতানদের মধ্যে কেবল মাত্র দুইজন সুলতান দাসীদের বিয়ে করেছিলেন, তার মধ্যে একজন সুলতান সুলাইমান (দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট)।

সুলতান সুলাইমান (দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট)/ সোর্স: commons.wikimedia.org/

হারেমে থাকা দাসীরা সুলতানদের অনেক সন্তান জন্ম দিতেন আর অটোমান সাম্রাজ্যে টিকে থাকার লড়ায়ে ছিল চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতা। প্রত্যেক সন্তানের মা চাইতেন তাদের সন্তানকে সিংহাসনে দেখতে কারণ এতে নিজ সন্তান হতো অটোমান সাম্রাজ্যের মতো বিশাল সাম্রাজ্যের সুলতান আর নিজেও পেতেন গুরুত্বপূর্ণ পদ ‘ভ্যালিদে সুলতান’। সিংহাসনে আরোহনকারী সুলতানের মা এই পদের অধিকারী হতেন।

কোসেম সুলতানের পরিচয় ও হাসেকি সুলতান হয়ে ওঠা

কোসেম সুলতান এমন একজন ক্ষমতাধর নারী যিনি অটোমান সাম্রাজ্যের সিংহাসনে না বসেও সাম্রাজ্যের সকল ক্ষমতা ছিল তার হাতে। তার সকল সিদ্ধান্ত এমন প্রভাব ফেলেছিল যে তার মৃত্যুর পর সাম্রাজ্যের অভিজাত‍্যরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে পরবর্তীতে আর কোনো নারীকে এতটা ক্ষমতাবান হতে দেওয়া যাবেনা।

কোসেম সুলতান/ সোর্স: commons.wikimedia.org/

ইতিহাসবিদদের মতে কোসেম ১৫৮৯ সালে তিনোস দ্বীপে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মগ্রহণ কালে তার নাম ছিল আনাসতাসিয়া, তবে পরবর্তীতে তার নাম ‘ম্যাহপেকার’ (তুর্কি শব্দ) রাখা হয় যার অর্থ , যে নারীর মুখ চাঁদের মতো।
তোপকাপির প্রাসাদে জীবন খুব ঝুঁকিপূর্ণ ছিল তাই সুলতান প্রথম আহমেদ পাশে এমন একজন ভরসামান ব্যক্তি চেয়েছিলেন যার উপর তিনি চোখ বুজে ভরসা করতে পারেন। তিনি এইরকম ব্যক্তিত্ব একজন মহিলার মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলেন আর তিনি হলেন কোসেম সুলতান। কোসেম সেই সময় বসনিয়ায় দাসী হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন।

তোপকাপি প্রাসাদ/ সোর্স: commons.wikimedia.org/

আহমেদ কোসেমকে তার বাড়ি থেকে অপহরণ করেছিলেন এবং তার হারেমে নিয়ে আসেন। হারেমে আসার পর তিনি মুসলিম ধর্ম গ্রহন করেন এবং সুলতান প্রথম আহমেদ তার নাম রাখেন কোসেম। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই কোসেম সুলতানের সবচেয়ে পছন্দের দাসী হয়ে ওঠেন। কোসেম যখন সুলতানের খাসদাসী ছিলেন তখন হারেমের দায়িত্বে ছিলেন সুলতানের দাদী সাফিয়ে সুলতান।

সুলতান আহমেদ প্রথম/ সোর্স: commons.wikimedia.org/

১৬০৪ সালে সাফিয়ে সুলতান তার কর্তৃত্ব হারান। একই বছর সুলতান আহমেদের মা এবং ভ্যালিদে হান্দান সুলতান এর মৃত্যুর পর কোসেম সুলতানের নিকট সুযোগ আসে হারেমের দায়িত্ব নিজ হাতে নেওয়ার। সুলতান আহমেদ তাকে বিয়ে করলে তিনি হাসেকি সুলতান পদ লাভ করেন। হাসেকি সুলতান হলো উসমানীয় সাম্রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ। সুলতানের সবচেয়ে সুন্দর ও প্রিয়তমা স্ত্রী এই পদে আসীন হতেন।

সুলতানের মৃত্যু ও কোসেম সুলতানের ক্ষমতাচ্যুতি

১৬১৭ সালের নভেম্বরে সুলতান আহমেদ রোগাক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন মাত্র ২৭ বছর বয়সেই। তবে অনেক ইতিহাসবিদরাই মনে করেন, সুলতানকে বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে মারা হয়েছিল। সুলতানের মৃত্যুর আগে কোসেম পাঁচ জন সন্তানের জনক হয়েছিলেন। সুলতান মারা যাওয়ার পর তার পুত্রকে সিংহাসনে না বসিয়ে তার ভাই প্রথম মুস্তফাকে সিংহাসনে বসানো হয়। তিনি ছিলেন মানসিক ভারসাম্যহীন। ফলে খুব দ্রুত তাকে সরিয়ে সুলতান প্রথম আহমেদের আরেক প্রিয় স্ত্রী মাহফিরোজের জ্যেষ্ঠ পুত্র দ্বিতীয় ওসমানকে সিংহাসনে বসানো হয়। এতে শুরু হয় সিংহাসনে বসা নিয়ে ক্রন্দল। অনেক বছর সাম্রাজ্যে শান্তির পর শুরু হয় সিংহাসনে বসা নিয়ে লড়াই ও রাজনৈতিক যুদ্ধ।

ভ্যালিদে সুলতানের অংকিত ছবি/ সোর্স: commons.wikimedia.org/

সুলতানের মৃত্যুর পর কোসেম তোপকাপি প্রাসাদে তার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, আর যেহুতু কোসেম সুলতানের পুত্রদের মধ্যে কেউ সিংহাসনে বসতে পেরেছিল না সেহেতু তাকে রাজ বংশের রীতি অনুযায়ী জৌলুসবিহীন প্রাসাদে থাকতে হবে। তাকে একটি পুরাতন বা ইস্কি প্রাসাদে প্রেরণ করা হয়।

ইতিহাসবিদদের মতে কোসেম সুলতান ও তার পুত্র মুরাদ অথবা ইব্রাহিম/ সোর্স: commons.wikimedia.org/

কোসেম যখন বিধবা হন তার বয়স ছিল মাত্র ২৮ বছর। তথ্যসূত্র মতে সুলতানের মৃত্যুর পর কোসেম তার পুত্রদের স্বয়ংসম্পূর্ণ করে গড়ে তোলার দিকে মনোনিবেশ করেছিলেন। কিন্তু তার আসল উদ্দেশ্য যে তার ছেলেদের সিংহাসনে বসিয়ে অটোমান সাম্রাজ্যের একজন শাসক হয়ে উঠা ছিলোনা সেটাও বলা যাবেনা কারণ তার উদ্দেশ্য কখনোই পরিষ্কার ছিলোনা।
কোসেম ছয় বছর তোপকাপি প্রাসাদ থেকে দূরে ছিলেন, পুরাতন ইস্কি প্রাসাদে বাস করতেন। সেই সময় সিংহাসন প্রথম মোস্তফা এবং দ্বিতীয় ওসমানের হাতে ছিল। কয়েক বছর পরে রাজনৈতিক মোড় ঘুরতে শুরু করে এবং ভাগ্য আরো একবার কোসেমের সহায় হয়।

কোসেমের পুনরায় ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন

কোসেম ১৬২৩ সালে রাজনৈতিক খেলায় ফিরে আসেন। এইবার তিনি আগের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ফিরেছিলেন। ধারণা করা হয় কোসেম প্রথম সুলতান মুস্তফার মাতা হালিমে সুলতানের সহযোগিতায় দ্বিতীয় ওসমানকে জেনিসারি বাহিনী দ্বারা হত্যা করিয়েছিলেন। তাদের এই পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে কোসেম কৌশলে তার পুত্র চতুর্থ মুরাদকে ১৬২৩ সালে সিংহাসনে বসিয়েছিলেন এবং তোপকাপি প্রাসাদে ফিরে ভ্যালিদে সুলতান পদবি গ্রহণ করেছিলেন। চতুর্থ মুরাদ অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় কোসেম শুধুমাত্র ভ্যালিদে সুলতান পদেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, তিনি নিজেকে একজন রাজপ্রতিনিধি হিসেবেও নিযুক্ত করেন। সুলতান চতুর্থ মুরাদের রাজত্বকালে কোসেম সাম্রাজ্যের সকল দিক নিজেই পরিচালনা করতেন। পর্দার আড়ালে থেকেও রাজ্যের সকল ক্ষমতা ছিল তার হাতে। এমনকি ১৬৩২ সালের পরেও যখন তিনি রাজপ্রানিধিও ছিলেন না তখনও রাজ্যের সকল ক্ষমতা ছিল তার হাতে।
১৯৪০ সালে মুরাদের মৃত্যুর পরে তিনি তার আরেক পুত্র ইব্রাহিমকে সিংহাসনে বসান। ইব্রাহিম ছিল কোসেমের বেঁচে থাকা শেষ রাজপুত্র। কোসেম ও তার পুত্র ইব্রাহিম পরবর্তী আট বছর একসাথে রাজত্ব করেছিলেন। ৮ আগস্ট, ১৬৪৮ সালে ইব্রাহিমকে ক্ষমতাচ্যুত করে কারাবাস দেওয়া হয়। ইব্রাহিমের পরে তার উত্তরসূরি হিসেবে তারই পুত্র মেহমেতকে সিংহাসনে বসানো হয়। ১৮ আগস্ট ১৬৪৮ সালে ইব্রাহিমের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল।

তুরহান/ সোর্স: commons.wikimedia.org/

নতুন ভ্যালিদে সুলতান হিসেবে নিয়োগ হয় মেহমেতের মাতা তুরহান। তুরহান ক্ষমতায় আসার পর তার শাশুড়ি কোসেমের ক্ষমতা চিরতরে দমিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন এবং তিনি সফলতার সাথে তা করতে পেরেছিলেন।

কোসেমের মৃত্যু

কোসেমের মৃত্যুর জন্য তার ক্ষমতার প্রতি তীব্র আকাঙ্খায় দায়ী বলে মনে করা হয়। তুরহান হ্যটিস এর একজন সেবকের দ্বারা কোসেমকে খুন করা হয়েছিল ঠিক সেইভাবে যেটা অনেকের সাথেই তিনি তার ক্ষমতা থাকতে করেছিলেন।

কোসেম সুলতানের হত্যাকান্ড/ সোর্স: youtube.com

তুরহান, ইব্রাহিমের মৃত্যুর জন্য কোসেমকেই দায়ী করেছিলেন এবং তিনি মেহমেতকে রক্ষার জন্যেই কোসেমকে চিরতরে সরাতে চেয়েছিলেন কারণ তিনি ভয় পেতেন যে কোসেম আবার মেহমেতকে ব্যবহার করে রাজপ্রতিনিধি হওয়ার চেষ্টা করবেন।

মেহমেত/ সোর্স: commons.wikimedia.org/

কোসেম তার শত্রুদের প্রতি ছিল নির্দয় যে তার রাস্তার কাটা হতো তাকে হত্যা করতে কোসেম দ্বিতীয় বার ভাবতেন না, তবে গরিব মানুষেরা যারা কোসেমের নিকট সাহার্য্য প্রার্থনা করতো কোসেম সব সময় তাদেরকে মুক্ত হস্তে দান করতেন। তুর্কির ইস্তানবুলে সুলতান আহমেদ মসজিদ তার নির্দেশে বানানো হয়েছিল যা এখন নীল মসজিদ নামে বিখ্যাত।
কোসেমের মৃত্যুর পর রাজ্যের প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে পরবর্তীতে কোনো নারীকে অটোমান সাম্রাজ্যের শাসন করার উপযোগী করা যাবেনা। নারীদের এই গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো সুলতান সুলাইমান (দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট) প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন এবং কোসেমের মৃত্যুর সাথে এই পদগুলোর ও সমাপ্তি হয়েছিল। তুরহান চতুর্থ মেহমেতের রাজপ্রতিনিধি থাকলেও তিনি কখনোই রাজনৈতিকভাবে কোসেমের মতো ক্ষমতাশীল হয়ে উঠতে পারেননি।
উসমানীয় সাম্রাজ্যে নারীদের ক্ষমতায়নের যে বীজ বপন হয়েছিল কোসেমের মৃত্যুর মাধ্যমে তার ইতি ঘটে। তবে ইতিহাসে কোসেমকে যেভাবেই দেখানো হোকনা কেনো নারী হিসেবে অটোমান সাম্রাজ্যের মতো বিশাল এক সাম্রাজ্য পরিচালনা করা কোনো সাধারন নারীর পক্ষে সম্ভব না। ইতিহাসে তাকে একজন বিচেক্ষণ ও চতুর রাজনীতিবিদ হিসেবে আজীবন স্মরণ রাখবে।
অনিমেষ দাস
লেখাপড়ার সুত্রে বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র হলেও যেকোনো বিষয়ের/বস্তুর ইতিহাস বরাবরি আমাকে আকর্ষণ করে।

Related Stories

Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

error: