স্পাই বা গুপ্তচর শুনলেই আমাদের মনে নানান কৌতূহলের সৃষ্টি হয় আর এজন্যই হয়ত স্পাই ভিত্তিক সিনেমাগুলো ও সিনেমার মূল ক্যারেক্টর অনেক বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই গুপ্তরচরভিত্তিক সিনেমার মধ্যে “জেমস বন্ড” সিনেমাটি এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। বলা চলে কল্পিত চরিত্রগুলোর মধ্যে জেমস বন্ড সবচেয়ে জনপ্রিয়।
ইতিহাসের অনেক গুপ্তচরকেই জেমস বন্ড চরিত্রটির অনুপ্রেরণা বলা হয়েছিল কিন্তু তার মধ্যে পপভ ডুসকো জেমস বন্ড চরিত্রের লেখক স্যার আইয়ান ফ্লেমিংকে ব্যক্তিগত ভাবে চিনতেন এবং ডুসকো গুপ্তচরকালীন সময়ে একসাথে ক্যাসিনোতে জুয়া খেলেন।
পপভ ডুসকো
পপভ ডুসকো/সুত্রঃ Getty Images
বন্ড, জেমস বন্ড। এই চরিত্রটি কাল্পনিক স্পাই চরিত্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ও পরিচিত। পরিচালক চরিত্রটিকে একজন সিরিয়াল প্লেবয় যে বিলাসবহুল জীবন যাপন করত ও স্টাইলিশ ভাবে পর্দায় উপস্থাপন করেছিলেন। সেই সময়ে অনেক পুরুষের কাছে এই চরিত্রটি ছিল রোল মডেল। ফিকসনাল চরিত্র কখনোই বাস্তবের সাথে মিল পাওয়া যায়না সেইভাবে কিন্তু ফ্লেমিং সত্যি সত্যি তার এই বিখ্যাত চরিত্রটি একজনের সত্যিকার জীবন থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন যার পুরোটা জীবনজুড়ে ছিল আ্যডভেন্ঞারে পরিপূর্ণ ঠিক যেন সোনালী পর্দার চরিত্রের মত,যার নাম পপভ ডুসকো।

পপভ ডুসকোর শুরুর জীবন

তিনি ১৯২১ সালে সার্বিয়াতে অনেক ধনী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার ছোটবেলা কাটে বিলাসী জীবন যাপনের মাঝে। শিক্ষাজীবনের শুরু হয় ইউরোপের অনেক নামি দামি বিদ্যালয়ে এবং পরবর্তীতে ইতালীয়,ফরাসি ও জার্মান ভাষা শিখেন।
তার বাবা সারের স্বনামধন্য স্কুলে ভর্তি করলে তিনি ইংল্যান্ডে তার জীবনের কিছুটা সময় পার করেন। সিগারেট খাওয়া নিয়ে স্কুল শিক্ষকের সাথে ঝামেলায় লিপ্ত হওয়ায় খুব অল্প সময় পরেই তাকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হয়।
সার্বিয়াতে ফিরে তিনি তার হাই স্কুল শেষ করেন। তিনি বেলগ্রেড বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। আইন নিয়ে ডিগ্রি পাওয়ার পর পপভ ডক্টরেট ডিগ্রি ও জার্মানি ভাষায় উন্নতির জন্য জার্মানিতে গিয়েছিলেন। সেখানেই তার জোহান জেবসেনের সাথে বন্ধুত্ব হয়।জেবসেন ও তার মতো ধনী ও রুচিশীল পরিবার থেকে এসেছিলেন।
অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব অনেক গাঢ় হয়ে যায় কারণ তাদের রুচিতে অনেক মিল ছিল। তারা দুইজনেই স্পোর্টস কার ও মহিলাদের প্রতি আসক্ত ছিলেন এবং তাদের অর্থের অভাব না থাকায় তারা এই বিলাসিতা খুব আরামেই চালিয়ে যেতে পারতেন।ডুসকো এবং পপভ মেয়েদের ভিতর অনেক জনপ্রিয় ছিল তাদের বিলাসবহুলভাবে চলাফেরার জন্যে
তাদের দুইজনের ভিতরে আরেকটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মিল ছিল,তারা দুজনেই নাজি জার্মানি দের ব্যাপক অপছন্দ করতেন। পপভ নাজি জার্মানদের ঘোর বিরোধী ছিলেন এবং মাঝে মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাজি শিক্ষাথীদের সাথে বিতর্কে জড়িয়ে পড়তেন। এই বিতর্কে জড়িয়ে পড়ার ফলে একবার রাজ্যের পুলিশ এর চোখে পড়েন এবং ১৯৩৭ সালে যখন তিনি প্যারিস ভ্রমণের জন্য জার্মান ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তখন তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।
জেবসেন শীঘ্রই তার বাবাকে ঘটনাটি জানায়। তার বাবা ইউপোস্লাভিয়ান সরকারের সহায়তাই তাকে ৮ দিন পর ফ্রেইবার্গ কারাগার থেকে মুক্ত করে। পপভ কে তৎক্ষনাক সুইজারল্যান্ডে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেখানে যেয়ে সে জেবসেনের দেখা পায়। পপভ সে সময় জেবসেন কে বলেন সে যদি কিছু দিয়ে বা কিছু করে জেবসেনের এই ঋণ যদি শোধ করতে পারতেন তাহলে তা করতেন।

গুপ্তচর ও ডাবল এজেন্ট হয়ে ওঠা

১৯৪০ সাল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন পুরোদমে শুরু হয়ে গেছে। পপভ তখন লন্ডন এ থাকতেন এবং সেখানে তিনি এমআই ৬ গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট হয়ে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। তিনি জার্মানদের পরিকল্পনা সম্পর্কে তথ্য জোগাড় করতেন। ব্রিটিশ সরকার যুগোস্লোভিয়া দখলের পর ১৯৪১ সালে জেবসেন তাকে বেলগ্রেডের একটি হোটেলে দেখা করতে বলেন এবং তাকে আ্যবহয়েয়ারে জার্মান গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। ব্রিটিশ সরকারের কাছে তিনি ছিলেন এজেন্ট ট্রাইসাইকেল ও আ্যবহয়েয়ার তাকে কোড নাম দিয়েছিলেন এজেন্ট ইভান।
ডুসকো পপভ ডাবল এজেন্ট হয়ে কাজ শুরু করার এক বছর পর জার্মানরা অনুরোধ করে ব্রিটিশদের গোপন তথ্য তাদেরকে দিতে। জার্মানি পপভ কে তাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ মনে করতো। জার্মানি সরকার তার সুযোগ সুবিধার স্বার্থে তাকে অনেক অর্থ প্রদান করতো।
পপভ ডুসকো
সুত্রঃ Getty Images
জার্মানরা পরবর্তীতে তাকে ইউনাইটেড স্টেটস এ একটি গোপন গোয়েন্দা সংস্থা তৈরি করতে বলেছিলেন। এক সাক্ষাতকারে পপভ বলে জার্মানরা মূলত পার্ল হারবার নেভাল বেস সম্পর্কিত তথ্যে বেশি আগ্রহী ছিল। তিনি এই তথ্যটি এফবিআই এর কাছেও পৌঁছে দেয় কিন্তু এফবিআই এর পরিচালক জে এডগার হুভার এর সাথে বেক্তিগত ঝামেলা থাকায় তিনি এটি তথ্যটি গুরুত্বের সাথে নেন নি।
পপভ ইউনাইটেড স্টেটস পৌঁছানোর কয়েক মাস পরে জাপান পার্ল হারবার আ্যটাক করেছিল।
বেশিরভাগ ইতিহাসবিদ একমত যে নাজিরা জাপানের এই হামলার পরিকল্পনা সম্মন্ধে কিছুই জানত না। কিন্তু পপভ এর এক সাক্ষাৎকারে তার কথা শুনে মনে হয় জার্মান গোয়েন্দা সংস্থার ভিতরেই এমন কেউ একজন ছিল যে এই পরিকল্পনার তথ্য জাপানের কাছে ফাঁস করে। পরে অবশ্য এই নিয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
যাই হোক পার্ল হারবার এ হামলার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে গিয়েছিল। তখন প্রত্যেক ডাবল এজেন্টদের নাজিদের বিরুদ্ধে কাজে লাগানো হয়েছিল আর পপভকে ব্যবহার করা হয়েছিল নাজিদের ভুল বোঝানোর জন্য যে অবতরণ মূলত নরমানডি তে না ডিয়েপ্পে বা ক‍্যালাইসে ঘটবে। সে এবং অন্যান্য এজেন্টরাও নাজিদেরকে অনবরত ভুল তথ্য প্রদান করে যেতেন।

জেমস বন্ড গল্পের শুরু

পপভ ক্যাসিনোতে যেতে অনেক ভালোবাসতেন। ১৯৪১ সালে এক রাতে পপভ পর্তুগালের এক ক্যাসিনো তে যান যেখানে ইয়ান ফ্লেমিং আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন আর সেখান থেকেই জেমস বন্ড এর গল্প শুরু হয়েছিল।
ক্যাসিনো
ক্যাসিনো/সুত্রঃ Wikimedia Commons
সেখানে একজন লিথুনিয়ান ব্যাবসায়ী ঘোষণা দেন যে কেউ তার টেবিলে বেকারেট খেলতে পারেন এবং যে কোনো পরিমান অর্থ বাজি ধরতে পারে। লোকটির ব্যবহার ভালো ছিল না সেজন্য পপভ তাকে একটু শিক্ষা দেওয়ার জন্যই ঘোষণা শুনে সেই লোকের টেবিলে বসে এবং তার কাছে থাকা $৫০০০০ সে একবারে বাজি ধরে এবং ঘটনাক্রমে সে ওই ব্লাফটি জিতে যায়। পপভ এর এত টাকা একবারে বাজি ধরা দেখে পুও ক্যাসিনো তে থাকা মানুষ বিস্মিত হয়ে গিয়েছিল এবং সেই ব্যবসায়ীকে তার পরে আর কোনোদিন ক্যাসিনো তে দেখা যায়নি। ফ্লেমিং এই পুরো ঘটনাটি সামনে দেখেছিলেন এবং তার লিখা প্রথম উপন্যাস ক্যাসিনো রয়্যাল এ এইরকম একটি কাহিনী উপস্থাপন করেন।

গুপ্তচরের পরবর্তী জীবন

১৯৪৪ সালে যুদ্ধ শেষ হলে তিনি ফ্রান্সে চলে যান এবং সেখানে বিয়ে করেন। কিন্তু খুব জলদি তাদের ডিভোর্স হয়ে যায়।পরবর্তিতে তিনি তার তিন সন্তানের মাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসনে। ৭০ এর দশকে তিনি তার গুপ্তচর জীবন নিয়ে একটি স্মৃতিকথা প্রকাশ করেন কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই তিনি জনজীবনের চোখের আড়ালেই থাকতেন। অতিরিক্ত মদ্যপান ও ধূমপানের জন্য ১৯৮১ সালে তিনি মারা যান।
ভাবতেই অবাক লাগে একজন মানুষের জীবন কতটা আ্যডভেনণ্ঞারাস হলে জেমস বন্ড এর মত জনপ্রিয় চরিত্র ও তার থেকে অনুপ্রাণিত হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here