বিশ্বের জানা-অজানা সব বিষয় নিয়ে আমাদের সাথে লিখতে আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন।

মানুষ সুন্দরের পূজারী। কে না চায় সুন্দর হতে? তবে এই সৌন্দর্য আজীবন ধরে রাখা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। এই অসম্ভবকেই সম্ভব করতে চেয়েছিলেন হাঙ্গেরির এলিজাবেথ বাথোরি যার অপর নাম “ব্লাড কাউন্টেস” বা “কাউন্টেস ড্রাকুলা”।

এলিজাবেথ বাথোরির পরিচয়


গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস অনুযায়ী বাথোরি ১৫৮৫ থেকে ১৬১০ সালের মধ্যে ৮০ থেকে ৬৫০ জন যুবতী মহিলাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিলেন এবং রেকর্ড অনুযায়ী তিনি ইতিহাসের প্রথম নারী সিরিয়াল কিলার। ১৬১০ সালে তাকে সেজেতে নামক দুর্গে কারাবন্দি করা হয় এবং আমৃত্যু সেখানেই বন্দি অবস্থায় প্রায় চার বছর অতিবাহিত করেছিলেন। এলিজাবেথ বাথোরির ভয়াবহ কাহিনীটি জাতীয় লোককাহিনীর অংশ হয়ে উঠেছে এবং তৈরি হয়েছে অসংখ্য নাটক, বই এবং চলচ্চিত্র। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে এই গল্পগুলির পেছনের সত্যতা নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠেছে, অনেকে বলছেন এলিজাবেথ কোনো খুনি ছিলেন না বরং রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়েছিলেন তিনি।
এলিজাবেথ বাথোরির অফিসিয়াল প্রতিকৃতি। Source: commons.wikimedia.org
১৫৬০ সালের ৭ আগস্ট হাঙ্গেরির এক আভিজাত্য পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এলিজাবেথ বাথোরি। তার পরিবার ট্রান্সিলভেনিয়ার রাজত্ব করতো এবং তার চাচা স্টিফেন বাথোরি পোল্যান্ডের রাজা ছিলেন। তার শৈশব কাটে হাঙ্গেরির রাজকীয় দুর্গে। ১৫ বছর বয়সে বাথোরির ব্যারন পুত্র ফেরেন্স নাডাসডি এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তাদের বিবাহ স্বরূপ নাডাসডি, বাথোরিকে তার বাড়ি (সেজেত ক্যাসেল) উপহার স্বরূপ দিয়েছিলেন। তাদের বিয়ের মাত্র তিন বছর পরেই নাডাসডি হাঙ্গেরিয়ান সেনাদের প্রধান সেনাপতি হয়েছিলেন এবং অটোমান সাম্রাজ্যের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন। যুদ্ধকালিন সময়ে নাডাসডি মৃত্যুবরণ করলে পরিবার পরিচালনার সম্পূর্ণ ক্ষমতা আসে বাথোরির হাতে। ধারণা করা হয় ঐ সময়গুলিতেই বাথোরি নির্মমভাবে হত্যাযজ্ঞগুলো চালিয়ে গিয়েছিলেন।

“ব্লাড কাউন্টেস” নামে আখ্যায়িত হওয়া


বাথোরির হত্যাকাণ্ডের প্রথম বিবরন মিলে ১৭২৯ সালে তুরস্কের পন্ডিত লাসজলো রচিত ‘ট্রাজিকা হিস্টোরিয়া’ বইটিতে। তুরস্কের ঐ পন্ডিতের মতে বাথোরি আশেপাশের শহর থেকে যুবতী মেয়েদের অপহরণ করতেন বা ভালো বেতনে কাজের প্রলোভন দেখিয়ে দুর্গে নিয়ে আসতেন এবং পরবর্তীতে মারাত্মক মারধর, শরীরের বিভিন্ন অংশ আগুনে পুরানো অথবা দিনের পর দিন অনাহারে রাখতেন, এইরূপ নানাভাবে নৃশংস অত্যাচার করতেন। তিনি তার দাসদের বলতেন যুবতী মেয়েদের রক্ত বালতিতে সংগ্রহ করে রাখতে যাতে পরবর্তীতে তিনি তার যৌবন ধরে রাখতে সে রক্ত দিয়ে গোসল করতে পারেন। এই বইটির প্রকাশের পর থেকেই গল্পগুলি খুব দ্রুত দেশ বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। বলা হয় বাথোরি ভ্যাম্পায়ার ছিলেন, তিনি বন্দি যুবতীদের কামড় দিয়ে রক্ত পান করতেন।
ইতিহাসবিদদের মতে বাথোরি যুবতী মেয়েদের রক্ত দিয়ে গোসল করতো চিরযৌবন থাকার জন্যে। Source: pinterest
এলিজাবেথের ইতিহাসের ভয়ানক সিরিয়াল কিলার হয়ে ওঠার পিছনে অনেক রকম মতবাদ রয়েছে।
এইরকম আরেকটি মতবাদের মতে বাথোরি ছোট থেকেই ছিলেন বদমেজাজি আর তার ভিতরে ছোট থেকেই ছিল ভয়ানক রকমের হিংস্রতা আর ক্রোধ। ছোটবেলা থেকেই এলিজাবেথ নানা রকম ভয়ানক অত্যাচারের দৃশ্য দেখে অভ্যস্ত ছিল, তার মধ্যে একটি হলো জীবন্ত ঘোড়ার পেট কেটে তাতে একজন অপরাধীকে ঢুকিয়ে পেট সেলাই করে দেয়া হয় এবং যতক্ষন না পর্যন্ত অপরাধী ও ঘোড়া দুইজনেই না মারা যায় ততক্ষণ অপেক্ষা করা হয়।
ইতিহাস থেকে যানা যায় বাথোরির মতো তার স্বামী ও অত্যাচারী ছিলেন। অটোম্যান বন্দীদের উপর নির্মম অত্যাচার চালাতেন এমনকি দাসদের দুই পায়ের গোড়ালির মাঝে কাগজ রেখে আগুন ধরিয়ে দিতেন। এছাড়াও অটোম্যানের যুদ্ধে তার নৃশংসতার জন্য তার নাম দেয়া হয় “ব্ল্যাক হিরো অফ হাঙ্গেরি”।
বাথোরির নৃশংসতা তার স্বামীর মৃত্যুর পর থেকেই বেশি ভয়ানক হয়ে ওঠে বলে তার বিচারকালীন ইতিহাস থেকে জানা যায়। সে মেয়েদের নখের নিচে, মুখের চামড়ার নিচে সুঁই ফুটিয়ে রাখতো, মেয়েদেরকে ক্ষত বিক্ষত করে আঘাত প্রাপ্ত স্থান থেকে মাংস কামড়ে নিত কিংবা সাঁড়াশি দিয়ে তুলে নিতো মাংসপিন্ড।
বাথোরির রূপচর্চার সময়। Source: pinterest
বাথোরির নৃশংসতা বলে শেষ করা যাবেনা। তবে অনেকে মনে করেন কাহিনীগুলো পরবর্তীতে অতিরঞ্জিত করে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু বাথোরির বিচারকালীন সময়ে তার সিরিয়াল হত্যাকান্ড ও পাশবিকতার প্রমান হিসেবে ৩০০ জন সাক্ষী দিয়েছিলেন এবং অনেক বেঁচে যাওয়া মহিলাদের সাক্ষ্যও জোগাড় করা হয়েছিল। অনেক বেঁচে যাওয়া মহিলাদের জবানবন্দি ও নেওয়া হয়েছিল বাথোরির বিচারকাজে।
কিন্তু ইতিহাস থেকে বাথোরি যে কতজনকে খুন করেছিলেন তা সঠিক জানা যায়নি। তবে একটি জনপ্রিয় গল্প অনুসারে একজন সাক্ষী জানিয়েছিলেন যে বাথোরি একটি ডায়েরিতে ৬৫০ টি খুনের সংখ্যা লিপিবদ্ধ করেছিলেন। পরবর্তীতে এমন কোনো ডায়েরি খুঁজে পাওয়া যায়নি তাই এই সংখ্যাটি এখনো ইতিহাসে অজানা।

বাথোরির গ্রেপ্তার হওয়া ও বিচার


বাথোরির স্বামী ফেরেন্স মারা যাওয়ার আগে তার স্ত্রীর দায়িত্ব হাঙ্গেরির প্যালেটাইন জর্জি থুরজো এর কাছে দিয়ে গিয়েছিল যে কিনা পরবর্তিতে বাথোরির অপরাধের তদন্ত শুরু করেছিলেন এবং বিচারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন।
বাথোরির অত্যাচারের গুজব বা সত্যি রাজ্য জুড়ে ছড়িয়ে পড়ার পরে থুরজো ১৬১০ সালের মার্চ মাসে দুইজন গোয়েন্দা নিয়োগ করেছিলেন বাথোরির অপরাধের প্রমান সংগ্রহ করার উদ্দেশ্যে যার মধ্যে ৩০০ জনের সাক্ষীর সাক্ষ্য অন্তর্ভুক্ত থাকলেও রেকর্ড অনুযায়ী মাত্র ১৩ জনের হিসেব পাওয়া যায়। ১৬১০ সালের ডিসেম্বরে থুরজো সেজেতে দুর্গে গিয়ে বাথোরিকে গ্রেপ্তার করেছিলেন।
সেজেতে দুর্গ যেখানে বন্দি অবস্থায় রাখা হয়েছিল বাথোরিকে। Source: wikipedia
গ্রেপ্তার এর পরে থুরজো একটি দ্বিধা দণ্ডের মুখোমুখি হয় কারণ বাথোরি পরিবার ছিল হাঙ্গেরির আভিজাত্যের অংশ ফলে বাথোরির এমন অপরাধ প্রমাণিত হওয়া ও তার মৃত্যুদন্ড কার্যকর হলে হাঙ্গেরি কলঙ্কের সম্মুখীন হতো এবং একটি প্রভাবশালী বা মহৎ পরিবারকে অসম্মানিত হতে হতো। থুরজো রাজা ম্যাথিয়াসকে বুঝাতে সফল হয়েছিলেন যে বাথোরিকে বিচারের আওতায় আনাই আভিজাত্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে তাই এই মামলাটি বাতিল করে দেওয়া হয়েছিল এবং পরবর্তীতে বাথোরিকে সেজেতে দুর্গে বন্দি অবস্থায় রাখা হয়েছিল। ২৪ আগস্ট, ১৬১৪ খ্রিস্টাব্দে তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সেখানে চার বছর অতিবাহিত করেছিলেন।

রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র?


বিগত দুই দশক ধরে বিভিন্ন ঐতিহাসিকবিদ এলিজাবেথ বাথোরি যে নির্দোষ ছিলেন তার পক্ষে কিছু যুক্তি দার করাই যে যুক্তিগুলো আসলেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে বাথোরির বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর বিরুদ্ধে।
প্রথমত থুরজো হাঙ্গেরির প্যালেটাইন হওয়ার সাথে সাথে বাথোরিকে বন্দি করার পদক্ষেপ গ্রহন করেছিলেন এবং রাজ্যের বিভিন্য গণ্য মান্য ব্যক্তি সেই সময় এই পদক্ষেপটি যে পূর্ব পরিকল্পিত তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন। থুরজো এর পরিকল্পনা ছিল হাঙ্গেরির অভিজাত পরিবারগুলোকে তার আয়ত্তে নিয়ে আসা এবং সে তার এই পরিকল্পনায় রাজা ম্যাথিয়াসকে যুক্ত করেছিলেন আর বাথোরি পরিবার ছিল হাঙ্গেরির অভিজাত পরিবারগুলোর মধ্যে অন্যতম তাই খুব সহজেই থুরজো এর নজরে চলে আসে এলিজাবেথ বাথোরি। এটাও বলা হয় বাথোরির অগাধ সম্পত্তির উপর থুরজোর অনেক আগে থেকেই লোভ ছিল তার প্রমান রয়েছে।
জর্জি থুরজো। Source: wikipedia
দ্বিতীয়ত রাজা ম্যাথিয়াস এবং ইম্পেরিয়াল পরিবার অনেক টাকার ঋণে দায়বদ্ধ ছিল বাথোরি পরিবারের কাছে যা পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে শোধ করতে পারছিল না রাজা ম্যাথিয়াস এটাও একটা কারণ হতে পারে বাথোরিকে মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসানোর।
আরেকটি কারণ হিসেবে দেখা যায় বাথোরি ছিল বিধবা, আর একজন বিধবা হয়ে একটি বৃহৎ এস্টেট পরিচালনা করা ও বেশুমার সম্পত্তির মালকিন হওয়া এটা কেও মেনে নিতে পারছিলোনা। ইউরোপে সেই সময় বিধবাদের মেরে ফেলা এবং তাদের মৃত্যুকে প্রাকৃতিক মৃত্যু হিসেবে প্রমান করা খুব সাধারণ বিষয় ছিল।
এলিজাবেথের সত্যি গল্প বা আসল তথ্য জানা একপ্রকার অসম্ভব কারণ তাকে আসলে কোন বিচারের আওতায় আনা হয়েছিল না বিধায় কোনো অফিসিয়াল রেকর্ড খুঁজে পাওয়া যায়নি। বাথোরির কথিত সহযোগীদের কাছ থেকে স্বীকারোক্তির মাধ্যমে তার শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং পরে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। এলিজাবেথের ভুক্তভুগিদের তালিকাভুক্ত কোনো তালিকা কখনও পাওয়া যায়নি বা অন্য কোথাও মূল নথিও নেই যা সত্য ঘটনাগুলোকে আলোকপাত করবে। আসলে যে কি হয়েছিল কোনটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যা এইগুলো শুধুই অনুমান মাত্র।
পরিশেষে বলা যায় বাথোরি কি নির্দোষ ছিল কিনা তার কোনো সঠিক প্রমান না থাকায় তাকে পুরোপুরি অভিযোগ থেকে মুক্ত করাও সম্ভব নয়। তাই বলা যায় জনপ্রিয় লোককাহিনী ও মিডিয়ার বদৌলতে বাথোরিকে চিরজীবন “ব্লাড কাউন্টেস” ও সর্বকালের সবচেয়ে নৃশংস সিরিয়াল কিলার হিসেবেই স্মরণ করা হবে।

References:

১। https://www.ancient-origins.net/history-famous-people

২। https://www.historytoday.com/archive/months-past/death-countess-elizabeth-bathory

৩। https://www.historyhit.com/the-blood-countess-facts-about-elizabeth-bathory/

৪। https://www.britannica.com/biography/Elizabeth-Bathory

৫। https://www.history.com/this-day-in-history/bathorys-torturous-escapades-are-exposed

1 COMMENT

  1. খুবই সুন্দর করে তথ্যগুলো সাজানো হয়েছ! ধন্যবাদ🙂

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here