কোচ ছাড়া ফুটবলের কী হবে? অবশ্যই, ববি চার্লটন, পেলে, দিয়েগো ম্যারাডোনা, জিনেদিন জিদান, রোনালদো এবং অন্যান্য খেলোয়াড়রা দুর্দান্ত, তবে কোচ যে সব কৌশল নির্ধারণ করেন এবং খেলোয়াড়রদের অনুপ্রেরণা যোগান দেন তা একজন খেলোয়াড় এর জন্য অনস্বীকার্য।
কোচ  আসেন এবং যান, তবে তাদের মধ্যে  কয়েকজন মুখ্য ক্লাব বা জাতীয় দলের দায়িত্বে থাকার মত যোগ্য হয়ে উঠেন।
জোহান ক্রুইফ, পেপ গার্দিওলা, ম্যাট বুবসি, মরিনহো বিশ্ব ফুটবলের এই কয়েকটি মাস্টারমাইন্ড।
এই রকম কিছু সংখ্যক কোচ এবং তাদের কৌশল নিয়ে আজকের লেখাটা সাজানো হয়েছে।

ফ্রাঞ্জ বেকেনবাউয়ার

বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় ছিলেন এবং কোচ হিসাবেও ফ্রাঞ্জ বেকেনবাউর কিছুটা সাফল্য পেয়েছিলেন।

তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি অধিনায়ক ও কোচ হিসাবে বিশ্বকাপ জিতেছিলেন, ১৯৭৪ সালে নিজের দেশে  হয়ে ট্রফি তোলার পরে এবং ১৯৯০ সালে আবার জার্মানির কোচ হিসাবে বিশ্বকাপ জিতেছিলেন ।
বেকেনবাউরের কোচিং স্টাইল রক্ষণমূলক। তিনি কমপ্যাক্ট ফরমেশনে মাঠে দল নামাতেন। আর তিনি খেলোয়াড়দের কোন ভাবেই যাতে বিপরীত দল গোল দিতে না পারে এই নির্দেশনা দিতেন। পুরাপুরি কাওউন্টার অ্যাটাক ভিত্তিক কৌশল।
তিনি তাঁর ক্যারিশমা এবং নেতৃত্ব ফুটবল মাঠ থেকে লকার রুমে নিয়ে গিয়েছিলেন, যা তাকে ১৯৯০/১৯৯১ মৌসুমে অলিম্পিক ডি মার্সেইকে লিগ ১ শিরোপা জয় করতে সাহায্য করেছিলেন।বায়ার্ন মিউনিখের কোচ হিসাবে ১৯৯৩/১৯৯৪ সালে বুন্দেসলিগা
জয় করেন এবং পরের মৌসুমে বায়ার্ন মিউনিখের কোচ হয়ে ইউইএফএ কাপ জিতেন।

ফ্যাবিও ক্যাপেলো

ইংল্যান্ডের প্রাক্তন কোচ ফ্যাবিও ক্যাপেলো ইতালীয় প্রতিরক্ষামূলক স্টাইলের প্রতি অনুগত ছিলেন।তবে পরে আক্রমণাত্মক এবং প্রতিরক্ষামূলক এই দুই স্টাইলের মধ্যা একটি ভারসাম্য খুঁজে পান। 
তিনি ৯০ এর দশকের গোড়ার দিকে মিলানের কোচ হয়ে  তাঁর তার দক্ষতার প্রথম ঝলক আমাদের দিয়েছিলেন। যখন তিনি  টানা ৫৮  সিরি এ ম্যাচ অপরাজিত ছিলেন। এই সময়কালে  তিনি নিজেকে শক্ত কোচ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
১৯৯৬ সালে, ক্যাপেলো মিলান ছেড়ে রিয়েল মাদ্রিদে চলে গেলেন, তবে তার প্রতিরক্ষামূলক স্টাইল তাকে ক্লাবের বাইরে পাঠিয়েছিল। তাই তিনি মিলানে ফিরে গেলেন। তারপরে তিনি  রোমা, জুভেন্টাস, রিয়েল মাদ্রিদ (দ্বিতীয় স্পেল) এবং শেষ পর্যন্ত ইংলিশ ফুটবল দলের কোচ হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। 
ইংলিশ ফুটবল দলের  কোচ হিসাবে তিনি পাস এবং স্পর্শের উপর ভিত্তি করে খেলার একটি নতুন স্টাইল গড়ে তুলেছিলেন, যা মিডফিল্ডারদের তাদের সৃজনশীলতা প্রদর্শন করতে এবং বল আরও নির্ভুলভাবে বিতরণ করতে দেয় ব্যাপক ভাবে সহয়তা করে।

জোহান ক্রুইফ

যদি কেউ আমাদের দেখায় যে ফুটবল আকর্ষণীয়, মজাদার এবং আনন্দদায়ক হতে পারে তবে তা হলেন জোহান ক্রুইফ। 
টিকি-টাকা কৌশলটি দুটি মূল উপাদান দ্বারা চিহ্নিত: ছোট পাস দ্রুত পাস।এই তিকি-টাকা ক্রুইফ এর আবিষ্কার।
 ডাচম্যান বার্সেলোনাকে পুরো নতুন স্তরে নিয়ে গিয়েছিল এই কৌশল এর মাধ্যমে । এই সিস্টেমটি বর্তমানে স্পেনের জাতীয় দল এবং বার্সেলোনা ব্যবহার করে।
এই সহজ কিন্তু কার্যকারী কৌশলটি ক্রুইফ কোচ এবং খেলোয়াড় হিসাবে ব্যাবহার করেছিলেন। তার সৃষ্টি এই কৌশলের জের ধরেই স্পেন ২০১০ সালের ফুটবল ওয়ার্ল্ড কাপে জয় লাভ করে।
তিনি কোপা দেল রে, লা লিগা, সুপারকোপা ডি এস্পেনা, উয়েফা সুপার কাপ এবং উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছেন।

স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন 

২৫ বছর ধরে কোনও ক্লাবের দায়িত্বে থাকা খুব সহজ কাজ নয়, তবে স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কোচ  হিসাবে  এই কঠিন কাজটি করতে সক্ষম হয়েছেন। 
তিনি ১৯৮৬ সালে এই ক্লাবের কোচ হয়েছিলেন । ১৯৮৯ -১৯৯৯ মৌসুমে তিনি তাঁর প্রথম খেতাব অর্জন করেছিলেন।
ফার্গুসন সর্বদা এমন একজন কোচ ছিলেন যা তার খেলোয়াড়দের সমর্থন এবং বিশ্বাস করতেন। তবে শৃঙ্খলাবদ্ধতার দাবি করতেন। তিনি মাঠে এবং মাঠের বাহিরে খেলোয়াড়দের শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকার জন্য উৎসাহ দিতেন।
তিনি ওয়েইন রুনি, এরিক ক্যান্টোনা এবং রায় কেনেটো  মত স্বতন্ত্র প্রতিভাময় খেলোয়াড়দের শৃঙ্খলাবদ্ধতার মাধ্যমে ওয়ার্ল্ড বিটার খেলোয়াড়রে পরিণত করেছিলেন।
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড অনেক জেনারেশন পেরিয়ে গেছে এবং তাদের প্রত্যেকের সাথে ফার্গুসন সামঞ্জস্য করতে সক্ষম হয়েছেন। ১৯ টি লিগ শিরোপা, দুটি ইউইএফএ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এবং একটি ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ জেতার মাধ্যমে  ইংলিশ ফুটবলের ইতিহাসের সবচেয়ে সফল কোচ হয়েছেন।
তিনি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাস ও পরিসংখ্যান কর্তৃক একবিংশ শতাব্দীর সেরা কোচ নির্বাচিত হন ।

পেপ গার্দিওলা

বার্সেলোনার সবেক কোচ টিকি-টাকার কৌশলটি হৃদয়গ্রাহী করে নিয়েছেন এবং বেশ সফল হয়েছেন। পেপ গার্দিওলা  বরবরই এমন একটি দল তৈরি করেন যেখানকার খেলোয়াড়রা কৌশলটি পুরোপুরি বুঝতে পারে। 
২০০৮ সালে, যখন তিনি তার প্রথম বার্সেলোনতে  আসেন, পেপ কিছু  খেলোয়াড়দের যেমন রোনালদিনহো, স্যামুয়েল ইটো এবং ডেকো বিক্রি বা মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং লা মাসিয়ার বেশ কয়েকটি খেলোয়াড়কে অন্তর্ভুক্ত করে এমন একটি দলকে একত্রিত করেছিল।
তিনি তার অনুপ্রেরণামূলক পদ্ধতির জন্য ব্যাপক পরিচিত, যেমন একটি ভিডিও তিনি ২০০৮/২০০৯ উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনাল ম্যাচের আগে খেলোয়াড়দের দেখিয়েছিলেন, এবং দলটি জিতেছিল।
গার্দিওলা অন্য  যেকোন ম্যানেজারের চেয়ে বার্সাকে বেশি উপাধি দিয়েছেন এবং তিনি প্রমাণ করছেন যে তিনি একজন সেরা কোচ।

গুস হিডিংক

গত ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ান ক্লাব আনজি মাখচালা গুস হিডিংককে প্রধান কোচ হিসাবে নিয়োগ করেছিলেন।
তিনি তার ক্যারিয়ারে পিএসভি আইন্ডহোভেন, ভ্যালেন্সিয়া, রিয়াল মাদ্রিদ এবং চেলসির পাশাপাশি ডাচ, দক্ষিণ কোরিয়ান এবং রাশিয়ান জাতীয় দলের কোচ হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন
তবে হিডিংক যেভাবে ক্লাসিক ৪-৪-২ এই ফর্মেশনে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারদের ব্যবহার করেন তা দুর্দান্ত এবং সেই মিডফিল্ডাররা আক্রমণভাগেও অংশ নিত।
তিনি এমন একজন কোচ যা সৃজনশীলতা এবং আক্রমণাত্মক দক্ষতার দাবি রাখে। এছাড়াও তিনি কেবল হাই-প্রোফাইল প্রতিভা ব্যবহার না করে একদল খেলোয়াড়কে কীভাবে নেতৃত্ব দিতে হয় তা জানেন।
তিনি  আনেক ছোট ছোট দলকে বড় বড় মাইল অর্জন করতে সহয়তা করেছেন। তিনি ২০০৬ বিশ্বকাপে  এবং ২০০৮ ইউরোতে  তার কোচিং দক্ষতা নজির স্থাপন করেন।

মার্সেলো লিপ্পি

২০০৬  বিশ্বকাপে মার্সেলো লিপ্পি একটি সহজ দর্শন ব্যবহার করে ইতালিকে জয়ের দিকে নিয়ে গিয়েছিলেন। দর্শনটি হলঃ the team must be united
কোচিং ক্যারিয়ারের সময় লিপ্পি বিশ্বাস করেছিলেন যে একটি স্কোয়াডে অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড় থাকতে পারে, তবে  শক্ত মানসিকতা এবং দলীয় প্রচেষ্টা ছাড়া সফল হওয়া সম্ভব না । সুতরাং, খেলার ফরমেশন খেলোয়াড়দের স্কিল এর ভিত্তিতে সাজাতে হবে।
লিপ্পি বাদে অন্য কোনও কোচ বিশ্বকাপ এবং চ্যাম্পিয়ন্স লিগ উভয় শিরোপা জিতেনি।
ইতালির কোচ হওয়ার আগে তিনি পন্টেদেরা, সিয়েনা, পিস্তোইস, ক্যারারেস, সেসেনা, লুচেসি, আটলান্টা, নেপোলি, জুভেন্টাস এবং ইন্টারনজিওনালে-এর দায়িত্বে ছিলেন।

হোসে মূরিনোহ

হোসে মরিনহো ফুটবলের অন্যতম পোলিমিক কোচ, তবে তিনি রিয়াল মাদ্রিদ, চেলসি, বেনফিকা, পোর্তো, ইউনিিয়াও ডি লেইরা এবং ইন্টারনজিওনালে-এর কোচ হিসাবে তার দক্ষতা প্রমাণ করেছেন।
হোসে মূরিনোহ তার কমপ্যাক্ট স্টাইলের জন্য পরিচিত, যার ফলস্বরূপ নয় বছরের (১৫০গেম) অপরাজিত হোম রান।
নতুন লিগে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতার জন্য তিনি বিখ্যাত । উদাহরণস্বরূপ, রিয়াল মাদ্রিদের সাথে তিনি যতটা প্রতিরক্ষামূলক  ছিলেন ,ইন্টার্নাজিওনালে তার চেয়ে অনেক বেশি প্রতিরক্ষামূলক ছিলেন। রিয়াল মাদ্রিদে তিনি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এবং মেজুত ওজিলের নেতৃত্বে আক্রমণ চালানোর উপর ভিত্তি করে একটি কৌশল নির্ধারণ করেছিলেন।
তিনি একটি ক্লাবের হয়ে যত শিরোপা জেতা যাই সব জিতেছেন।

 

লুইজ ফিলিপ স্কোলারি

ব্রাজিলিয়ান ম্যানেজার লুইজ ফেলিপ স্কোলারি পর্তুগাল, ব্রাজিল, চেলসি, পালমিরাস এবং ক্রুসেইরো সহ ১০  টি দলের  কোচ হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন ।
স্কোলারির মুল কৌশল হলঃ স্বাধীনতা। এবং তিনি বিভিন্ন ফর্মেশন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন তবে ৪-৩-২-১, ৩-৪-১-২ এবং ৪-৪-৩ ফর্মেশন পছন্দ করেন।
মিডফিল্ডাররা আক্রমণাত্মক ভাবে খেলবে এই কৌশলটি নিয়ে দল গঠন  করেন।
তিনি যে সমস্ত দলে পরিচালনা করেন এবং  তার বিপক্ষের  উইঙ্গাররাও কোণঠাসা হয়ে থাকে কারণ তিনি ক্রমাগত নিজের উইঙ্গারদের স্যুইচ করার ঝোঁক দেন, এতে খেলার মধ্যে বৈচিত্র্য তৈরি হয় এবং খুব আলাদা গতির খেলার সৃষ্টি হয়।
লুইজ ফিলিপ একজন বিস্ফোরক এবং স্বভাবসুলভ কোচ, যিনি ভাল পারফরম্যান্সের জন্য প্রশংসা করেন এবং খারাপ পারফরম্যান্সের জন্য নিন্দা করেন।
তিনি ব্রাজিল এর ২০০২ সালের ওয়ার্ল্ড কাপ জয়ী দলের কোচ । 

 

ফুটবল খেলাতে যেমন খেলোয়াড়রা মুল ভুমিকা পালন করে তেমন কোচ এর ভুমিকা ও গুরুত্বপূর্ণ কারন আমারা আনেক তারকা খচিত দলকে সঠিক নির্দেশনার অভাবে মুখ থুবরিয়ে পড়তে দেখেছি, আবার আনেক সাধারন দলকে শিরোপা জিততে দেখেছি এর মুলে আছে কোচদের কৌশল।

 


References: 
  • https://theathletic.com/
  • /bleacherreport.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here