বর্তমান সময়ে পুরো বিশ্ব এক ভয়ংকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করছে। এই ভয়ংকর পরিস্থিতির সৃষ্টিকারী কোনো মানুষ বা প্রাণী নয় আবার কোনো দেশ বা জাতি নয়। এটি অতি ক্ষুদ্র একটি ভাইরাস,যা পুরো বিশ্বকে থামিয়ে দিয়েছে। এই ভাইরাসটির নাম করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯। এই ভাইরাস থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হচ্ছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা। নিয়মিত হাত ধুয়া এবং নিজের ঘর-বাড়ি পরিষ্কার রাখা। শুধু এই ভাইরাস থেকে বাঁচতে নয়,যেকোনো ধরনের রোগ থেকে বাঁচার এক মাত্র উপায় হচ্ছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা। আর কোনো রোগ থেকে বাঁচার উপায় হিসাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা জরুরি এই ধারণার প্রবক্তা হচ্ছেন এক নারী। তাঁর নাম ফ্লোরেন্স নাইটঙ্গেল। তার এই ধারনাই কিন্তু বর্তমানে করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচার ক্ষেত্রে প্রমাণিত হচ্ছে।

 

“মানুষ কেন তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠে? দিন খুব ছোট, তাই? না, আসলে দিনে তাদের নিজেদের জন্য কোনো সময় বরাদ্দ থাকে না।”
—– ‘ফ্লোরেন্স নাইটঙ্গেল ‘
নার্সিংbd71
‘ফ্লোরেন্স নাইটঙ্গেল’/Image Source: commons.wikimedia.or
‘ফ্লোরেন্স নাইটঙ্গেল’ নার্সিং সেবা দানকারী এক অনন্য মহিয়সীর নাম। যিনি আধুনিক নার্সিং এর প্রবক্তা হিসাবে পরিচিত। তিনিই প্রথম নার্সিংকে এক উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। ফ্লোরেন্স নাইটঙ্গেল তার সমস্ত জীবন মানুষের সেবায় নিয়োজিত করেছিলেন। তিনি “দ্য লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প” নামে পরিচিত ছিলেন।

‘ফ্লোরেন্স’- এর দ্য লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প হয়ে ওঠা:


১৮৫৩ সালে ক্রিমিয়ার যুদ্ধ শুরু হয়। মিত্র ব্রিটিশ এবং ফরাসি বাহিনী অটোমান অঞ্চল নিয়ন্ত্রণের জন্য রাশিয়ান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল। হাজার হাজার ব্রিটিশ সৈন্যকে কৃষ্ণ সাগরে পাঠানো হয়েছিল।যেখানে ১৮৫৪ সালের মধ্যে সৈনিকরা অসুস্থ ও আহত হয়ে পড়ে। যুদ্ধের পরে ইংল্যান্ড তাদের অসুস্থ ও আহত সৈন্যদের অবহেলিত দেখে চারদিকে হৈ চৈ ফেলে দিয়েছিল কারণ কেবল হাসপাতালের ভয়াবহ অবসন্নতার কারণে পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও যত্নের অভাবই ছিল না বরং ভীষণ অস্বাস্থ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল।
নার্সিংakattorbd
‘ফ্লোরেন্স নাইটঙ্গেল’/Image Source: commons.wikimedia.org
১৮৫৪ সালের শেষের দিকে ফ্লোরেন্স নাইটঙ্গেল, যুদ্ধের সচিব সিডনি হারবার্টের কাছ থেকে একটি চিঠি পেয়েছিল, তাকে ক্রিমিয়ার অসুস্থ ও পতিত সৈন্যদের জন্য নার্সদের একটি দল গঠন করতে বলেছিল। এই অভিযানের পুরো নিয়ন্ত্রণ পেয়ে, তিনি দ্রুত প্রায় ৩৮ জন নার্সের একটি দলকে একত্রিত করেছিলেন এবং কয়েকদিন পর তাদের সাথে ক্রিমিয়ার দিকে যাত্রা করেছিলেন।
যদিও তাদের সেখানকার ভয়াবহ পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছিল এবং কনস্টান্টিনোপালের ব্রিটিশ বেস হাসপাতাল স্কুটারিতে পৌঁছে তারা যা দেখেছে তার জন্য নাইটঙ্গেল এবং তার সহকর্মীরা কেউই প্রস্তুত ছিলেন না। হাসপাতালটি একটি বৃহৎ সেসপুলের উপরে স্থাপন করা হয়েছিল, এটি জল এবং হাসপাতাল বিল্ডিংকেই দূষিত করছিল। রোগীরা সেই অস্বাস্থ্যকর জায়গায় সারিবদ্ধভাবে শুয়ে ছিল। টাইফয়েড এবং কলেরা জাতীয় সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে আহত সেনারা যুদ্ধের চেয়ে রোগে বেশি মারা যাচ্ছিল।
হাসপাতালের এমন অবস্থা দেখে নাইটিংগেল নিজেই দ্রুত হাসপাতাল পরিষ্কারের দায়িত্ব নেন। রোগীদের পুষ্টিকর খাদ্যের ও সকলের হাত ধোয়ার ব্যবস্থা, হাসপাতালের পরিচ্ছন্নকরণ, আবর্জনা নিষ্কাশন ও বায়ুচলাচল ইত্যাদির ব্যবস্থা তিনি নিজেই করেন।
নার্সিংekattorbangladesh
ক্রিমিয়ার হাসপাতালে ‘ফ্লোরেন্স’/Image Source: commons.wikimedia.org
মৃত্যুহার নেমে এসেছিল শতকরা বিয়াল্লিশ ভাগ থেকে শতকরা দুই ভাগে। তিনি নিজেই প্রতিটি রাত জেগে সৈন্যদের যত্ন নেওয়ার জন্য ব্যয় করেছিলেন। সন্ধ্যাবেলা অন্ধকার হলওয়ে লন্ঠন জ্বালিয়ে ঘুড়ে ঘুড়ে রোগীর পর রোগীর সেবা করেন। সৈন্যরা সবাই তাঁর সেবায় মুগ্ধ হয়ে তারা তাঁকে “দি লেডি উইথ দি ল্যাম্প”বলে সম্বোধন করেছিল। অন্যরা কেবল তাকে “ক্রিমিয়ার অ্যাঞ্জেল” বলে অভিহিত করেছিল। তার কাজে হাসপাতালের মৃত্যুর হার দুই-তৃতীয়াংশ কমে এসেছিলো।
সামরিক বাহিনীর স্বাস্থ্যের মান নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন নাইটিঙ্গেল। তাঁর অনুরাগী মহারাণী ভিক্টোরিয়া-সহ সকলকে সেটি বোঝাতে কাজে লেগেছিল তাঁর অঙ্কের ব্যুৎপত্তি। সংগৃহীত জটিল ও বিপুল তথ্যকে সহজবোধ্য ভাবে পরিবেশন করেছিলেন পরিসংখ্যানের গ্রাফগত পরিভাষায়, ‘পাইচার্ট’-এ, ‘রোজ ডায়াগ্রাম’-এ। দেখিয়েছিলেন শতকরা ৯০ ভাগ অসুখই হয় স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশের অভাবের জন্য, যা নিবারণযোগ্য। তাঁর উদ্যোগে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছিল স্বাস্থ্য ব্যবস্থায়।
নার্সিংbangla71
‘ফ্লোরেন্স নাইটঙ্গেল’ কার্যরত অবস্থায়/Image Source: www.britannica.com
ফ্লোরেন্স নাইটঙ্গেলের জীবনী: ১৮২০ সালের ১২ মে ইতালির অভিজাত পরিবারে জন্ম আধুনিক নার্সিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের। তাঁর বাবা উইলিয়াম এডওয়ার্ড নাইটিঙ্গেল এবং মা ফ্রান্সিস নাইটিঙ্গেল৷নাইটিঙ্গেল দম্পতির দুই কন্যার মধ্যে ফ্লোরেন্স ছিলেন ছোট।ইতালির ফ্লোরেন্স শহরের নামানুসারে ফ্লোরেন্সের নামকরণ করা হয়।তিনি একাধারে একজন লেখক এবং পরিসংখ্যানবিদও।
ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন অনেক মেয়েই শিক্ষা কী তা ঠিক বুঝত না। সেক্ষেত্রে ফ্লোরেন্সের ভাগ্য ভাল ছিল কারণ তাঁর বাবা উইলিয়াম বিশ্বাস করতেন, মেয়েদেরও শিক্ষাগ্রহণ করা উচিত। তিনি ফ্লোরেন্স ও তার বোনকে নানা বিষয়ে শিক্ষা দিয়েছিলেন। তাদের বিজ্ঞান, গণিত, ইতিহাস ও দর্শন পড়ান হয়েছিল।
অবশ্য ছোটবেলা থেকেই কেউ অসুস্থ হলে ফ্লোরেন্স ছুটে যেতেন সেখানে সেবা করতে। ১৭ বছর বয়সে তিনি ডার্বিশায়ার থেকে লন্ডনে আসেন। সে সময় লন্ডনের হাসপাতালগুলোর অবস্থা ছিল খুবই করুণ। এর অন্যতম কারণ সে সময়ে কেউ সেবিকার কাজে এগিয়ে আসতেন না। এ পেশাকে তখন খুব ছোট করে দেখা হতো। অথচ তিনি জীবনের সেরা এমনকি সবটুকু সময় ব্যয় করেছেন মানুষের সেবায়।
মাত্র ১৭ বছর বয়সেই নাইটিঙ্গেল উপলব্ধি করছিলেন স্রষ্টা তাঁকে সেবিকা হওয়ার জন্যই পাঠিয়েছেন। এ কাজে আগ্রহ প্রকাশ করলে প্রথমে তাঁর মা-বাবা রাজি হননি এই ভেবে, একজন শিক্ষিত মেয়ে হিসেবে তার অন্য কোনও ভালো পেশায় যাওয়া উচিত। কিন্তু আশা ছাড়েননি ফ্লোরেন্স। অবশেষে বাবা-মায়ের অনুমতি নিয়ে তিনি ১৮৫১ সালে নার্সের প্রশিক্ষণ নিতে পাড়ি দেন জার্মানিতে। এরপর ১৮৫৫ সালে তিনি নার্স প্রশিক্ষণের জন্য তহবিল সংগ্রহের কাজ শুরু করেন। তাঁর এই নিরলস প্রচেষ্টার জেরে ১৮৫৯ সালে তিনি প্রায় ৪৫ হাজার পাউন্ড সংগ্রহ করে ফেলেন নাইটিঙ্গেল ফান্ডের জন্য।
পরবর্তী সময়ে তিনি ভারতবর্ষের গ্রামীণ মানুষের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর গবেষণা চালান। যা ভারতবর্ষে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পৌছে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। আবার ইংল্যান্ডের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উন্নয়নেও তিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। ১৮৫৯ সালে তিনি ‘রয়্যাল স্ট্যাটিসটিক্যাল সোসাইটির’ প্রথম সারির সদস্য নির্বাচিত হন। লন্ডনের সেন্ট থমাস হাসপাতালে নার্সিংকে সম্পূর্ণ পেশারূপে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ১৮৬০ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘নাইটিঙ্গেল ট্রেনিং স্কুল’ যার বর্তমান নাম ‘ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল স্কুল অব নার্সিং । ডা. এলিজাবেথ ব্ল্যাকওয়েলের সাথে যৌথভাবে ১৮৬৭ সালে নিউইয়র্কে চালু করেন ‘উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজ’। এ ছাড়াও তিনি বিভিন্ন সময় নার্সিংয়ের উপর বেশ কিছু বইও লেখেন।
নার্সিংbd
‘ফ্লোরেন্স’ কিছু নার্সদের সাথে/Image Source: commons.wikimedia.org
১৯১০ সালের ১৩ আগস্ট ৯০ বছর বয়সে লন্ডনে নিজ বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন যাত্রী ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল। কিন্তু তাঁর কর্মজীবনের স্বীকৃতি স্বরূপ ইস্তাম্বুলে চারটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয় তাঁর নামে। লন্ডনের ওয়াটারলু ও ডার্বিতে রয়েছে এই সেবিকার প্রতিকৃতি। লন্ডনের সেন্ট থোমাস হসপিটালে রয়েছে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল মিউজিয়াম।তাছাড়া ব্রিটিশ লাইব্রেরি সাউন্ড আর্কাইভে সংরক্ষিত রয়েছে তার কণ্ঠস্বর, যেখানে তিনি বলেছেন- যখন আমি থাকব না, সেই সময় আমার এই কণ্ঠস্বর আমার মহান কীর্তিগুলোকে মানুষের কাছে মনে করিয়ে দেবে এবং এসব কাজের জন্য উৎসাহ জোগাবে।

১৮৯০ সালের ৩০ জুলাই  চার্জ অফ দা লাইট ব্রিগ্রেডের বৃদ্ধ সদস্যদের জন্য তহবিল গঠনের সময় ফ্লোরেন্সের কিছু কথার রেকর্ড।

ফ্লোরেন্স এর প্রাপ্তিসমূহ


১৮৮৩ সালে রানী ভিক্টোরিয়া তাকে ‘রয়েল রেডক্রস’ পদকে ভূষিত করেন। প্রথম নারী হিসেবে ‘অর্ডার অব মেরিট’ খেতাব লাভ করেন ১৯০৭ সালে। ১৯০৮ সালে লাভ করেন লন্ডন নগরীর ‘অনারারি ফ্রিডম’ উপাধি। ক্রিমীয় যুদ্ধের সময় আহত সৈন্যদের সেবার মাধ্যমে নার্সিংকে তিনি অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। আর এ কারণেই তাকে ডাকা হতো ‘দ্য লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প’। যুদ্ধের পর তিনি বহু দাতব্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। নারীমুক্তির জন্যও পূর্ণমাত্রায় সোচ্চার ছিলেন।
ক্রিমীয়71
‘লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প’/Image Source: commons.wikimedia.org
নাইটিঙ্গেলের বিশ্বাস ছিল, মানবসেবার এমন কাজে নিজেকে উৎসর্গ করার জন্য ঈশ্বরের কাছ থেকে তার ডাক এসেছে। এক্ষেত্রে মা ও বোনের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও তিনি সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। বহু মনীষী তাকে ঈশ্বরের দূত হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এখন যারা এ পেশায় নতুন আসেন তারা ‘নাইটিঙ্গেল প্লেজ’ নামে একটি শপথ গ্রহণ করে তার প্রতি সম্মান জানান। ১৯৭৪ সাল থেকে তার জন্মদিন ১২ মে পালিত হয়ে আসছে ‘ইন্টারন্যাশনাল নার্সেস ডে’।যার মাধ্যমে সম্মান জানানো হয় এমন এক নারীকে যিনি তাঁর কর্মের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করেছেন- নার্সিং একটি পেশা নয় সেবামাত্র।
তাঁকে নিয়ে ‘দ্য লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প’ নামে একটি নাটক মঞ্চায়িত হয় ১৯২৯ সালে- যার নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন এডিথ ইভানস। এছাড়া তার জীবনকে ভিত্তি করে চারটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয় বিভিন্ন সময়ে।

শেষকথা


আধুনিক নার্সিং এ ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের নাম সবসময় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।যত বার নার্সিং এর কথা আসবে ততবার সবাই ফ্লোরেন্সকে স্মরণ করবে।২০২০ সালের ১২ মে ফ্লোরেন্স এর ২০০ তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠান বাতিল হলেও বর্তমানের এই করোনা মোকাবেলায় ফ্লোরেন্স এর অবদান সবসময় মনে পড়ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here