হ্যামেলিন এর বাঁশিওয়ালা: শুধুই কি গল্প নাকি বাস্তব

বিশ্বের জানা-অজানা সব বিষয় নিয়ে আমাদের সাথে লিখতে আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন।

আমাদের ছোটবেলার সাথে জড়িয়ে আছে অনেক গল্প ও কল্প কাহিনী। বড়দের মুখ থেকে বা ছোটদের গল্পের বইয়ে হ্যামিলন (জার্মান উচ্চারণ) / হ্যামেলিনের (ইংরেজি উচ্চারণ) বাঁশিওয়ালা গল্পটি আমরা হয়ত সবাই পড়েছি বা শুনেছি। এই গল্পের সবচেয়ে ট্র্যাজিক বিষয় হল পুরো গল্পে নায়ক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা বাঁশিওয়ালা গল্পের শেষে খলনায়ক হয়ে ওঠা।
উপকথার ভিত্তিতে গ্রিম-ভ্রাতৃদ্বয় এর লেখা এই রূপকথার গল্পটি শুধুই কি গল্প না বাস্তবে ইতিহাসের ঘটে যাওয়া সত্যি কোন ঘটনা যা পরে লোকমুখে নানা পরিবর্তনের মাধ্যমে হয়ে উঠেছিল এক জনপ্রিয় রূপকথার গল্প।

গল্পটি হয়ত আমাদের সবারই জানা তারপরও সংক্ষেপে গল্পটি জেনে নেওয়া যাক….

গল্পটি শুরু হয় ১২৮৪ সালের জার্মানির লোয়ার স‍্যাক্সনি রাজ্যের হ্যামেলিন শহরে বেড়ে যাওয়া ইঁদুরের উৎপাত থেকে। শহরে ইঁদুরের অত্যাচার থেকে বাঁচতে শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সর্বসম্মতিক্রমে ঘোষণা দেন, যে শহরকে ইঁদুরের প্রকোপ থেকে যে বাঁচাতে পারবে তাকে মোটা অঙ্কের টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে।
সেই ঘোষণায় সারা দিয়ে হটাৎ এক রঙ-বেরঙের পোশাক পরা রহস্যময় বাঁশিওয়ালা শহরে এসে উপস্থিত হয়। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে সে কথা দেয় বাঁশির মায়াবী সুরে শহরকে ইঁদুর মুক্ত করতে পারবে। কেও বিস্বাস না করলেও অন্য কোন উপায় না থাকায় সবাই রাজি হয়। অতঃপর বাঁশিওয়ালা বাঁশি বাজানো শুরু করলে, বাঁশির সুরের মায়ায় আকৃষ্ট হয়ে শহরের সব ইঁদুর গর্ত থেকে বের হয়ে আসে এবং তার পিছু পিছু ছুটতে থাকে। সে (বাঁশিওয়ালা) সব ইঁদুর শহর থেকে দূরে নিয়ে, ওয়েজার নদীতে ফেলে দেয়। নদীতে তলিয়ে যায় শহরের সব ইঁদুর।
সে শহরে ফিরে আসে এবং তার প্রাপ্য টাকা চাইলে শহরের মেয়র ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সবাই মুখ ফিরিয়ে নেয়। প্রতারিত বাঁশিওয়ালা তখন চলে যায় কিন্তু কিছুদিন পরে সে আবার ফিরে আসে প্রতিশোধ নিতে, দিনটি ছিল ১৮৮৪ সালের জুন মাসের ২৬ তারিখ। শহরে সেদিন সেন্ট জন-পল(ধর্মীয় উৎসব) দিবস উদযাপিত হচ্ছিল। সেইদিন তার পরনে রঙ-বেরঙের কাপড় ছিল না। সে আবার তার মায়াবী বাঁশি বাজানো শুরু করে তবে এবার সুর ছিল ভিন্ন এবং এইবার তার সুরের মায়ায় আকৃষ্ট হয়ে বেরিয়ে আসে শহরের ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা।

হ্যামেলিনেরবাঁশিওয়ালা71bd
বাঁশির সুরে বেরিয়ে আসছে ছেলে-মেয়েরা /Image Source: commons.wikimedia.org

শহরের ১৩০ জন শিশু তার সুরের মোহে তার পিছু যেতে থাকে এবং একসময় সে এক পাহাড়ের গুহায় ঢুকে যায়। এরপর আর কোনদিন দেখা মেলেনি সেই বাঁশিওয়ালার। শিশুগুলোর মধ্যে তিনজন শিশু বেঁচে গিয়েছিল, তারাই নাকি পরে ফিরে এসে এসব কথা জানায় শহরবাসীকে। তিনজনের মধ্যে একজন বধির, একজন খোঁড়া আর অন্যজন দৃষ্টিহীন। মোটামুটিভাবে এইটাই হচ্ছে মূল গল্প।
এই গল্পটি নিয়েও রয়েছে অনেক মতভেদ। গল্পের এক ভার্সনে বলা হয় বাঁশিওয়ালা শিশুদের নিয়ে শহরের বাইরে কোপেনবার্গ পর্বতের গুহায় ঢুকে গিয়েছিল। আবার আরেকটি ভার্সনে বলা হয় বাঁশিওয়ালা যখন শিশুদের নিয়ে রওনা দেয়, তখন শহরের কারোরই কিছু করার ছিল না। কারণ সবাই বাঁশির সুরে বিমোহিত ছিল। শিশুরা বাঁশিওয়ালাকে অনুসরণ করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছিল, একসময় বাঁশিওয়ালা শিশুদের নিয়ে হ্যামেলিন শহরের প্রাচীর বেয়ে একটা পাহাড়ের দিকে চলে যায় এরপর পাহাড়টি হটাৎ দুভাগ হয়ে যায় এবং সে সব শিশুদেরকে নিয়ে পাহাড়ের ভিতর আজীবনের জন্য অদৃশ্য হয়ে যায়। তবে একটি বিষয়ে সকল মতবাদই একমত পোষণ করে সেটি হচ্ছে ঘটনাটির সময়কাল।

বাস্তব অথবা শুধুই গল্প


প্রথম এই গল্পের সত্যতার প্রমান মিলে ১৩০০ সালের দিকে স্বয়ং হ্যামেলিন শহরের এক গীর্জার জানালায় চিত্রিত ছবি থেকে। এই চিত্রায়ন এর উদ্দেশ্যই ছিল নিখোঁজ শিশুদের স্মরণ করা। জানালাটি ১৬৬০ সালের দিকে ধ্বংস হয়ে গেলেও কিছু লিখিত বিবরণ বেঁচে গিয়েছিল।

হ্যামেলিনেরবাঁশিওয়ালাbd71
জানালায় চিত্রিত ছবি/Image Source: commons.wikimedia.org/

পরে ইতিহাসবিদ হ্যান্স ডবারটিন সেই ঐতিহাসিক বেঁচে যাওয়া লিখনি থেকে এই জানালাটি পুনঃনির্মাণ করেন। সেখানে দেখা যায় রঙ-বেরঙের কাপড় পরিহিত বাঁশিওয়ালা ও শিশুদের ছবি।
সবচেয়ে প্রাচীন যে তথ্যটি পাওয়া যায় লুনেবার্গ (Luneburg) এর পাণ্ডুলিপিতে,
ANNO 1284 AM DAGE JOHANNIS ET PAULI WAR DER 26. JUNIDORCH EINEN PIPER MIT ALLERLEY FARVE BEKLEDET GEWESEN CXXX KINDER VERLEDET BINNEN HAMELN GEBORENTO CALVARIE BI DEN KOPPEN VERLOREN
অর্থ:
“১২৮৪ সালের ২৬ জুন, সেন্ট জন পল দিবসে হ্যামেলিনে জন্ম নেয়া ১৩০ জন শিশু এক হরেক রঙা বংশীবাদকের সম্মোহনে পেছন পেছন হারিয়ে যায় কোপেনের পেছনের কাল্ভারিতে।”
ইতিহাসবিদদের ধারনামতে যে পথ দিয়ে শিশুদেরকে বাঁশিওয়ালা নিয়ে গিয়েছিল বর্তমানে সেই রাস্তার নাম বাঙ্গেলোসেন্ট্রাস যার অর্থ হল ‘যে রাস্তায় বাজনা বাজে না’। শহরের কারো সেখানে কোনো ধরনের গান বা নাচ করার অনুমতি নেই।
এই গল্পের সত্যতা খুঁজেছে অনেক ইতিহাসবিদ, কিন্তু কাগজ কলমে কোন প্রমাণ না পাওয়ায় অনেকেই অস্বীকার করেন এর সত্যতা নিয়ে। এখন পর্যন্ত কেউ এই গল্পের উপযুক্ত প্রমান সহ ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। তবুও জার্মানির লোয়ার স‍্যাক্সনি রাজ্যের হ্যামেলিন শহর তাদের এই কিংবদন্তিকে প্রতিনিয়তই তুলে ধরছে বিশ্ববাসীর কাছে।
৮৫১ খ্রিস্টাব্দে তৈরি এক ধর্মাশ্রমকে ঘিরে গড়ে ওঠা ছোট গ্রামই দ্বাদশ শতাব্দীতে এসে আস্তে আস্তে শহরে পরিণত হয়, প্রায় ৫৮,০০০ লোকের বাস বর্তমানে এই শহরে। শহরটি বর্তমানে পর্যটকদের জন্য একটি দর্শনীয় স্থান কারন অনেকটা এই গল্পের জনপ্রিয়তার জন্যেই। হ্যামেলিন শহরটি এই কল্পকাহিনীর বহু চিহ্ন এখনও বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। বর্তমানে হ্যামেলিনে যে পৌরসভা রয়েছে , তার নামের অর্থ হল ‘ইঁদুর ধরা লোকের বাড়ি’। এটি নির্মিত হয় ১৬০২ সালে। এর দেয়ালে বিশ্ববিখ্যাত এই কাহিনীর চিত্র খুব সুন্দর করে আঁকা রয়েছে।
এই শহরে বেড়াতে গেলেই চোখে পড়বে নানা জায়গায় বাঁশিওয়ালা ইঁদুর সহ মূর্তি। সেখানকার চা / কফির কাপ, গ্লাস, গেঞ্জি এমনকি অনেক রাস্তার মোড়ের দেয়ালে চিত্রিত থাকে বাঁশিওয়ালা গল্পের কোনো না কোনো চিহ্ন।

হ্যামেলিন 71bangladesh
বাঁশিওয়ালার মূর্তি/Image Source: commons.wikimedia.org

শহরে ২০০৯ সালে ট্যুরিস্ট ফেস্ট আয়োজন করা হয় শিশুদের হারিয়ে যাওয়ার করুন ঘটনার ৭২৫ তম বার্ষিকীতে। প্রতি বছর ২৬ জুন পালন করা হয় ‘র‍্যাট ক্যাচার দিবস’। গ্রীষ্মের প্রতি সপ্তাহেই সেই গল্পের উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন মঞ্চ নাটক অনুষ্ঠিত হয় রাস্তায় রাস্তায়।

হ্যামেলিন ekator
হ্যামেলিন শহরের একটি রেস্তোরার ফটক/Image Source: commons.wikimedia.org

বর্তমানে হ্যামেলিন শহরে এই গল্প সংক্রান্ত একটি জাদুঘর রয়েছে। ওই জাদুঘরে পঞ্চদশ শতাব্দীর লেখা বইয়ে এ রহস্যময় কাহিনীর বর্ণনা রয়েছে আর রাখা হয়েছে একটি টিনের বাঁশি। বই অনুযায়ী ফ্রাউ ভন লিউভ নামের তেরো বছরের এক বালক দাবি করে সে নিজে দেখেছিল সেই বাঁশিওয়ালাকে। তার বর্ণনা অনুযায়ী, লোকটির(বাঁশিওয়ালা) বয়স ছিল আনুমানিক ৩০ এবং দেখতে ছিল খুব সুদর্শন আর তার বাঁশিটি ছিল রুপোর তৈরি।
নিচের বাক্যগুলো টাউন হলে লিখা ছিল:
“In the year 1284 after the birth of Christ From Hameln were led away One hundred thirty children, born at this place Led away by a piper into a mountain.”

কন্সপিরেসি থিওরিগুলো


যেহেতু ‘হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালা’ এই গল্পের কোনো খাতা কলমে কোন প্রমান মেলেনি তাই এই থিওরিগুলিকে কন্সপিরেসি থিওরি বলা চলে।
একটি গবেষণায় প্রকাশ পায় গল্পের আদিরূপে ইঁদুরের কোনো অস্তিত্বই ছিল না, ১৬০০ শতকে কোন এক ব্যক্তি এই ইঁদুরের ঘটনাটি সংযুক্ত করে।যদি এই শিশুগুলোর নিখোঁজ হওয়ার সাথে ইঁদুর বা বাঁশিওয়ালার প্রতিশোধ নেওয়ার কোনো যোগসূত্র না থাকে তবে শিশুগুলো নিখোঁজ হওয়ার কারন কি ছিল? আর এইখানেই এসে যায় এই কন্সপিরেসি থিওরিগুলো।
বর্তমানে যে থিওরিটি সবচেয়ে বেশি প্রচলিত সেটি হলো, বাঁশিওয়ালা ছিল এলিয়েন। কোপেন পাহাড়ের আড়ালে রাখা মহাকাশযানে করে শিশুদের নিয়ে গিয়েছিল নিজের গ্রহে।
আবার অনেকের মতে, জার্মানির হানোফার শহরের ৩০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত হ্যামেলিন শহরের শিশুদের ১২১২ সালে নিকোলাস নামক একজন ছেলে জেরুজালেম নিয়ে যাবার কথা বলে লোভ দেখায়। জেরুজালেম হল পূর্ণভূমি। সে তাদের কাছে এক অদ্ভুত বর্ণনা দিয়েছিল যে তারা যখন ভূমধ্যসাগরে পৌঁছাবে তখন সাগর শুকিয়ে যাবে তারপর তারা হেটে পথ পাড়ি দিতে পারবে। সে অনেক ছেলে মেয়েকে নিয়ে যাত্রা শুরু করে কিন্তু পরে তাদের আর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। পরে জানা যায় আসলে নিকোলাস ছিল ছেলেধরা। সে সমস্ত শিশুদেরকে মধ্যপ্রাচ‍্যে বিক্রি করে দেয়। অনেকের মতে এটি হলো আসল ঘটনা।

হ্যামেলিন ekattur
ডার্ক থিম নিয়ে আকানো বাঁশিওয়ালার একটি ছবি/Image Source: ancient-origins.net

প্রাচীন তথ্যমতে আরেকটি ধারণা পাওয়া যায় যে, মরণব্যাধি ব্ল্যাক ডেথে শহরের সব শিশু মারা গিয়েছিল পরে এই (রূপকথার) গল্প বানাই শহরবাসী। আবার কেও কেও বলে, শিশুদের ধর্মযুদ্ধ বা ক্রুসেডে পাঠানো হয়েছিল আর ডোরাকাটা পোশাকের বাঁশিওয়ালা ছিল মৃত্যুর প্রতীক।
আরেকটি থিওরি মতে, পাইড পাইপার (বাঁশিওয়ালা) আসলে একজন শিশুকামী ছিল, তবে কিভাবে একসাথে এতগুলো ছেলে-মেয়ে নিয়ে গেল তার কোনো ব্যাখ্যা নেই।
ইতিহাসের আরেকটি ধারণা মতে, ১২৮৪ সালে হ্যামেলিন দুটি ঘটনা ঘটে। প্লেগ ছাড়াও অন্যটি হচ্ছে নাচুনে রোগ। খাদ্যের বিষক্রিয়ার ফলে এই রোগ দেখা দিয়েছিল। বিশেষকরে শহরের ছোট ছেলে-মেয়েরাই এই রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। তখন সেই রঙ-বেরঙের সেই বাঁশিওয়ালা এই সব রোগাক্রান্ত শিশুদের নিয়ে শহর থেকে উধাও হয়ে যায়।
তবে দিনের শেষে এইগুলো শুধুমাত্র একেকটি থিওরি। এত এত মতবাদের পরেও আসলে কোন কাহিনীর উপর ভিত্তি করে এই ‘হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালা’ গল্পটি নির্মিত হয়েছে সেটার মীমাংসা এখনও হয়নি।
হ্যামেলিন শহরের অনেক ঐতিহাসিক তথ্য থেকে বলাই যায় গল্পটি পুরোপুরি সত্য না হলেও কিছু একটা এরকম ঘটেছিল। কয়েক শতাব্দী ধরে গল্পটি অনেক পরিবর্তিত হয়েছে যদিও কি বা কতটা পরিবর্তিত হয়েছে সেটি এখনও অজানা।
অনিমেষ দাস
লেখাপড়ার সুত্রে বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র হলেও যেকোনো বিষয়ের/বস্তুর ইতিহাস বরাবরি আমাকে আকর্ষণ করে।

Related Stories

Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

error: