ইংরেজি লোককাহিনীর মধ্যযুগের জনপ্রিয় চরিত্র রবিনহুড এর কথা জানে না এমন লোক হয়তোবা খুঁজে পেতে কষ্টই হবে। রবিনহুড তার অনুসারীদের নিয়ে মেরি ম্যান নামে একটি দল গঠন করেন যারা ধনীদের কাছ থেকে ডাকাতি ও মালামাল লুট করে গরীবদের মাঝে বিলিয়ে দিতেন। আর তাতেই রবিনহুড পেয়ে যান গরীবের বন্ধু উপাধি। প্রিয় পাঠক রবিনহুড তো শুধুই একটি কাল্পনিক চরিত্র। কিন্তু আজকে এমন এক জনের কথা বলব যাকে বলা হয় বিংশ শতাব্দীর রবিনহুড।

হামযা বেনদেলাজ, ১৯৮৮ সালে জন্ম নেওয়া একজন আলজেরিয়ান কম্পিউটার হ্যাকার। পেশাগতভাবে তিনি ছিলেন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। হামজা বেনদেলাজ এর বিরুদ্ধে ২০১০ থেকে ২০১২ মাত্র দুই বছরের মধ্যে আমেরিকা ও ইউরোপের দুইশতাধিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান থেকে ১বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের অর্থ হ্যাকিং এর মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ আছে। কথিত আছে এই বিপুল পরিমান অর্থ হামযা বিভিন্ন সেবামূলক কাজে ব্যয় করেছেন। যার মধ্যে ফিলিস্তিনে অর্থ সাহায্য অন্যতম।

হামযা বেনদেলাজ এর হ্যাকিং জীবনের আদ্যোপান্ত :


হামযা বেনদেলাজ হ্যাকিং জগতে বিএক্স১ অথবা ড্যানিয়েল এইচ বি ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন। ইন্টারপোল এর মোস্ট ওয়ান্টেড ১০ জন হ্যাকার এর মধ্যে হামযা ছিলেন সবার প্রথমে। হামযা হ্যাকিং এর জন্য স্পাইআই নামে একটি কম্পিউটার ভাইরাস ব্যবহার করতেন। রাশিয়ার অ্যালেক্সান্ডার আন্দ্রেভিচ পানিন স্পাইআই ভাইরাসের মূল প্রোগ্রামার এবং বেনদেলাজ ছিলেন তার ঘনিষ্ঠ একজন সহযোগী।

ধারণা করা হয়, স্পাইআই নামক ভাইরাসের মূল ডেভেলপারদের মধ্যে বেনদেলাজ ছিলেন অন্যতম। স্পাইআই ছিল এমন একটি সুপরিকল্পিত ট্রোজান হর্স বা ছদ্মবেশী কম্পিউটার প্রোগ্রাম, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কম্পিউটারকে সংক্রমিত করে, সেটির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তুলে দিত হ্যাকারের হাতে। সেই সাথে হ্যাকারকে বিভিন্ন অর্থসংক্রান্ত তথ্য, যেমন অনলাইন ব্যাংকিংয়ের পরিচয়পত্র, ক্রেডিট কার্ডের গোপন নম্বর, পিন নম্বর, ইউজারনেম, পাসওয়ার্ড, ইত্যাদি ব্যবহারের পূর্ন অনুমতি প্রদান করত। ২০০৯ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত পানিন এবং হামযা স্পাইআই এর উন্নতিকরণের কাজ করেন। পরবর্তীতে সাইবার অপরাধীদের কাছে আট থেকে দশ হাজার ডলারের বিনিময়ে উন্নত মানের স্পাইআই ভাইরাস বিক্রি করা শুরু করেন। আনুমানিক স্পাইআই বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৫০ জন ক্রেতার কাছে বিক্রি করা হয়েছে।

 হ্যাকার হামযা বেনদেলাজ এর গ্রেপ্তার ও শাস্তি :


তিন বছর চেষ্টা করার পর মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা FBI এর এক গুপ্তচর স্পাইআই এর একটা কপি হামযা বেনদেলাজ এর কাছ থেকে কিনতে সমর্থ হন। ওই গুপ্তচর আট হাজার পাঁচশত ডলার দিয়ে কপিটি ক্রয় করেন। স্পাইআই এর কপিটি বিক্রি করার পর হামযা মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার কাছে চিহ্নিত হয়ে পড়েন। এর পর ২০১২ সালের শেষের দিকে হামযা ছুটি কাটাতে মালয়েশিয়া যান। এই সফরে হামযা এর সাথে ছিলেন তার মেয়ে ও স্ত্রী। ২০১৩ সালের ৮ ই জানুয়ারি মালয়েশিয়া থেকে মিশর ফেরার পথে থাইল্যান্ড এর রাজধানী ব্যাংকক এর সুবর্নভূমি বিমান বন্দরে হামযা বেনদেলাজ FBI এর তথ্যানুযায়ী থাই পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন।

গ্রেপ্তার এর সময় এবং পরবর্তীতে প্রেস ব্রিফিং এর সময় হামযা বেনদেলাজকে হাস্যোজ্জ্বল দেখা যায়। ঐ আলোকচিত্রগুলো সেসময়ে সারা পৃথিবীর সংবাদ মাধ্যমে প্রচার হয়। হামযা বেনদেলাজ এর ওই হাস্যোজ্জ্বল ছবির কারণে সমর্থকদের কাছে হ্যাপি হ্যাকার নামে পরিচিতি পান। হামযাকে ঐ একই বছরের মে মাসে তাকে থাইল্যান্ড থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করা হয়।পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের আওতায় হামযার বিচার কাজ শুরু হয়। পক্ষে ও বিপক্ষে শুনানি শুরু হয়। পরবর্তীতে হামযা এর বিরুদ্ধে সাইবার প্রতারণা এবং ব্যাংক জালিয়াতির অভিযোগে প্রায় ২৩টি অভিযোগ আনা হয়। হামযা ২০১৫ সালের ২৬ জুন তার বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ বিনা শর্তে স্বীকার করে নেন এবং আদালত হামযা বেনদেলাজকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করে।

 হামযা বেনদেলাজকে ঘিরে মৃত্যুদণ্ডের গুজব :


হামযাকে কারাগারে পাঠানোর পরেই মিডিয়া জুড়ে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে মার্কিন প্রশাসন হামযাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছে। এদিকে হামযার সমর্থকরা এই মৃত্যুদন্ড কার্যকর না করতে প্রচার প্রচারণা শুরু করে। প্রচার প্রচারণার মধ্যে হামযার এক সমর্থক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটারে এক টুইট এ হামযাকে হিরো হিসাবে আখ্যায়িত করেন এবং দাবি তোলেন যে হামযা অসহায় ফিলিস্তিনিদের জন্য ২৮ কোটি মার্কিন ডলার দান করেছেন।

এই টুইটকে ঘিরে তখন আলোচনা সমালোচনা শুরু হয় এবং টুইটটি প্রায় চার হাজার পাঁচশত বারের মত রি-টুইট হয়। এই ঘটনার মাঝেই আলজেরিয়ায় নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত হামযার মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে প্রতিবাদ করে টুইট করেন, যা তৎকালীন সময়ের মিডিয়াতে এটম বোমার মত বিস্ফোরিত হয়। অন্যদিকে হামযার সমর্থকরা একের পর এক ওয়েবসাইট হ্যাক এবং বিভিন্ন হ্যাশট্যাগ প্রচারণা তো করেই যাচ্ছিলেন।

 হামযা বেনদেলাজ কি আসলেই হ্যাকার নাকি এযুগের রবিনহুড ?


একদিকে হ্যাকিং এর মাধ্যমে অর্জিত অর্থ অসহায়দেরকে দান অন্যদিকে পুঁজিবাদীদের অর্থ কেঁড়ে নেওয়া, হামযা বেনদেলাজকে করেছে বিতর্কিত। স্পাইআই ভাইরাস তৈরি এবং বিপনন ছাড়া হ্যাকিং ও অর্থ দানের ঘটনার কোন নিভর্যোগ্য প্রমান আজও মেলেনি।

প্রিয় পাঠক আপনার দৃষ্টিতে হামযা বেনদেলাজ কি হ্যাকার নাকি এযুগের রবিনহুড? কমেন্টে অবশ্যই জানাবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here