বর্তমান যুগে যেমন নারীরা কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই পুরুষের থেকে তেমনি ইতিহাস ঘাটলেই উঠে আসে অনেক মহিয়সী নারীর কথা যারা অবদান রেখেছিল মানবজাতির সভ্যতার নির্মাণে।আলেকজন্দ্রিয়ার হাইপেশিয়া ছিলেন এমন একজন প্যাগান ধর্মানুসারী বিজ্ঞানী,জ্যোতির্বিদ,গণিতজ্ঞ এবং দার্শনিক বক্তা যিনি উঠে এসেছিলেন চতুর্থ শতাব্দীর পুরুষতান্ত্রিক সমাজ থেকে।সম্ভবত তিনিই ছিলেন গণিতে অবদান রাখা ইতিহাসের প্রথম নারী।
খ্রিষ্টান ধর্মান্ধ জনতার হাতে তার নির্মম হত্যাকান্ড হতবাক করেছিল গ্রিক-রোমান বিশ্বকে।তার হত্যা একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক ছিল,কারণ তার মৃত্যুর পর পশ্চিমা বিশ্ব গণিত,জ্যোতিবিদ্যা আর বিজ্ঞানে উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নতি করতে পারেনি দীর্ঘদিন।মূলত তার মৃত্যুই সূচনা করেছিল মানব ইতিহাসের ঘোর কালো অধ্যায়ের,যে সময়ে মুক্তবুদ্ধি,জ্ঞানচর্চা,বিজ্ঞান,শিল্প-সাধনার কোনো চর্চায় হতো না।এ সময়টাতে পৃথিবী আগাইনি একটুও।ইতিহাসবিদরা এই সময়টাকে অন্ধকার যুগ নামে আখ্যায়িত করেন।

হাইপেশিয়া কে ছিলেন


হাইপেশিয়া
দার্শনিক হাইপেশিয়া/সূত্র:commons.wikimedia.org
হাইপেশিয়া নামের অর্থ হলো সর্বশ্রেষ্ঠ বা অদ্বিতীয়।হাইপেশিয়া চতুর্থ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রিকো-রোমান নগরীতে ৩৫০-৩৭০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেন।এই সময়টাতে মেয়েদেরকে দেখা হতো শুধুমাত্র পুরুষের সম্পত্তি হিসেবে সেই সময়েও তার বাবা থিওন তার মেয়েকে একজন নিখুঁত মানুষ হিসেবে গড়তে চেয়েছিলেন।তার বাবা থিওন ছিলেন গণিতবিদ,জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং আলেকজান্দ্রিয়ার জাদুঘরের শেষ সদস্য।হাইপেশিয়া একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে তো উঠেনই সেই সাথে ছিলেন অপরূপা আর বিদুষী।স্বভাবতই সুদর্শনা আর বিদুষী হাইপেশিয়াকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন অনেকেই কিন্তু স্বাধীনচেতা হাইপেশিয়া তাদের প্রত্যেকের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন আর নিজেকে নিয়োজিত করেন গণিত ও বিজ্ঞানের নিবিড় সাধনায়।গণিত ও বিজ্ঞানের পাশাপাশি জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণার জন্য তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞান সরঞ্জাম তৈরি করেছিলেন।জ্ঞান প্রসারের লক্ষে বেশ কিছুটা সময় তিনি দেশের বাইরেও কাটান।

হাইপেশিয়ার জীবন ও তার অবদান


মাত্র ৩১ বছর বয়সেই তিনি আলেকজান্দ্রিয়ার শিক্ষা প্রসারের প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়ে উঠেছিলেন এবং সুযোগ পেয়ে যান আলেকজান্দ্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতের শিক্ষকতা করানোর।বিখ্যাত গণিতবিদ দায়োফ‍্যান্তাস রচিত এরিথমেটিক বইয়ের উপর তিনি ১৩ অধ্যায়ের একটি আলোচনা লিখেন সহজভাবে তার ছাত্রদের বুঝানোর জন্য তবে পরবর্তীতে তার এই আলোচনার অংশটুকু মূল বইটিতে সংযুক্ত করা হয়।
হাইপেশিয়া
হাইপেশিয়া ক্লাস নিচ্ছেন/সূত্র: commons.wikimedia.org
এছাড়াও তিনি এপলোনিয়াসের কৌণিক ছেদ এবং টলেমির জ্যোতির্বিদ্যার অসংখ্য কাজের উপর বেশ কিছু আলোচনা প্রকাশ করেন।তিনি শুধুমাত্র গণিতের আলোচনা ছাড়াও বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখাতেও অবদান রাখেন।তিনি একটি আ্যস্ট্রোল্যাব এবং একটি হাইড্রোস্কোপ আবিষ্কার করেছিলেন।
তিনি বিজ্ঞান আর গণিতের জটিল বিষয় ছাড়াও দর্শন নিয়ে বক্তৃতা রাখতেন।আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরির এক বিশাল কক্ষে তিনি প্রতি সন্ধ্যায় সর্বসাধারণের উদ্দেশে তিনি বক্তৃতা দিতেন।দূর দূর থেকে লোক আসতো তার এই বক্তৃতা শুনতে।সেই সময়ে মানুষ সম্মানী দিত তার বক্তৃতা সোনার জন্যে।শিক্ষক হিসেবেও তিনি অর্জন করেছিলেন শ্রেষ্ঠর্ত।তার প্রিয় ছাত্রদের মধ্যে একজন হলেন সিরিনের সাইনেসিস।যিনি পরবর্তীতে ‘টলেমাইস’ নামক অঞ্চলের বিশপ হয়েছিলেন।হাইপেশিয়ার মৃত্যুর পর তার অসংখ্য কর্মের প্রমান পাওয়া যায় সিরিনের লেখা চিঠি পত্র থেকে।এছাড়াও টলেমির ‘আলমাগসেট’ গ্রন্থের উপর কাজ করেছেন তার বাবার সাথে।
তিনি তারাদের গতিপথ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু গবেষণা করেন যা “আ্যস্ট্রোনোমিকাল ক‍্যানন” নামে একটি বইয়ে এই গবেষণার ব্যাখ্যা রয়েছে।আমরা যা জানি বা জানছি হাইপেশিয়া সম্পর্কে তা খুবই কম কারণ দুর্ভাগ্যবসত তার মূল কাজগুলো বেশিরভাগই হারিয়ে গিয়েছে।বর্তমানে আমরা তার সম্পর্কে বেশিভাগ জানতে পারি অন্য কারো লিখা বই থেকে।

ধর্মীয় কলহের উৎপত্তি ও নির্মম মৃত্যু


হাইপেশিয়া সম্পর্কে সবচেয়ে হৃদয় বিদারক ঘটনা তার মৃত্যু।তার মৃত্যুর কারণ বুঝতে হলে এই ধর্মীয় বিবাদের কারণ সম্পর্কে জানতেই হবে। হাইপেশিয়া যখন জনপ্রিয়তার উচ্চ শিখরে,তিনি তার দর্শনবিদ্যার মাধ্যমে যখন মুগ্ধ করছে সবাইকে তখন আরেকদিকে অরিস্টিস এবং সিরিলের মধ্যে শুরু হয় ধর্মীয় আক্রোশ।ধর্মকলহের ছোবল তাকে শেষ করেছিল।
মার্গারেট এলিক তার Women and Technology in Ancient Alexandria : Maria and Hypatia প্রবন্ধে বলেন ,
‘Hypatia was a scholarly pagan and a woman, an espouser for Greek scientific rationalism and an influential political figure. This proved to be a dangerous combination’
হাইপেশিয়া ছিল প্রাচীন ধর্ম প‍্যাগানিজম এর ধারক।তাই খ্রিষ্ট ধর্মালম্বীরা হাইপেশিয়ার দর্শনকে চার্চদ্রোহী মনে করতো।অরিস্টিস ছিলেন সে সময়ের নগর প্রধান এবং সিরিল যিনি ৪১২ খ্রিস্টাব্দে আলেকজান্দ্রিয়ার বিশপ বা ‘পেট্রিয়াক’ হয়েছিলেন।পেট্রিয়াক হলো খ্রিস্টান ধর্মগুরু।অরিস্টিস এর সাথে হাইপেশিয়ার বন্ধুসুলভ সম্পর্ক ছিল অনেক ইতিহাসে জানা যায় নগরের অনেক সিদ্ধান্ত অরিস্টিস হাইপেশিয়াকে জিজ্ঞাসা করে নিতেন।তবে সিরিল শুরু থেকে হাইপেশিয়াকে পছন্দ করতেন না তার মুক্তমনা বৈজ্ঞানিক চিন্তা ভাবনার জন্য।সিরিল মূলত খ্রিস্টান ধর্মকে সবার মাঝে প্রচার করার কাজে হাইপেশিয়াকে প্রধান বাঁধা মনে করতেন।তিনি ভয় পেতেন হাইপেশিয়ার প্রবল ব্যক্তিত্ব ও তীক্ষ্ণ যুক্তির কাছে খ্রিস্ট ধর্মের দার্শনিক ভিত্তি হয়তো দুর্বল হয়ে পড়বে।সিরিল প্রতি নিয়ত সবাইকে নিরুৎসাহিত করতো হাইপেশিয়ার সভায় না যাওয়ার জন্যে।

হাইপেশিয়া তার এক শিষ্যকে বাইবেল সম্পর্কে বলেছিলেন,

‘আমি খ্রীষ্টান নই। কিন্তু বাইবেলের প্রাচীন ও নবীন দুটো খন্ডই আমি পড়েছি। আব্রাহাম ইয়াকুব ইউসুফ ধর্মই বল, আর যীশু খ্রীষ্টের ধর্মই বল, অহঙ্কার না করেও আমি বলতে পারি, ও দুটি মর্মই আমি উপলব্ধি করেছি। বিশ্বাসের কথা, ঈশ্বরের প্রেমের বাণী ও-দূটিতে আছে ঢের কিন্তু দার্শনিকের দৃষ্টিতে ওসব বালকসুলভ উচ্ছ্বাস ছাড়া আর কিছু নয়। পরিণত বুদ্ধির জাতির জন্য থাকা উচিৎ যুক্তি-নির্ভর জ্ঞানভিত্তিক ধর্ম একটা, যা ছিলো গ্রীকদের, যার পুনঃপ্রতিষ্ঠার সঙ্কল্প নিয়ে আমি যথাসাধ্য কাজ করে যাচ্ছি আলেকজান্দ্রিয়ায় বসে।’
এই ধরণের স্বচ্ছ কথা তখনকার অনেক ধর্মান্ধদের ক্ষিপ্ত করে তুলেছিল।চার্লস কিংস এর উপন্যাস ‘Hypatia And Or The New Foes With An Old Face'(1853) থেকে জানা যায়,বিশপ সিরিল তার একজন প্রিয় তরুণ খ্রিষ্টান ধর্মানুরাগী ফিলামন কে হাইপেশিয়ার সভায় যাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করলে সিরিল তার সামনে হাইপেশিয়াকে তুলে ধরেন এইভাবে,
‘হাইপেশিয়া সাপের থেকেও ধূর্ত এবং সব ধরনের চালাকিতে পটু এক মহিলা। তুমি যদি ওখানে যাও তবে নিজেকে ঠাট্টার পাত্র মনে হবে আর লজ্জায় পালিয়ে আসবে।’
তারপরও ফিলামন সভায় যায় তবে তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল হাইপেশিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে সে তার বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে ভুল প্রমাণিত করবে কিন্তু হাইপেশিয়ার ব্যাক্তিত্ব আর জ্ঞানের স্পর্শে এসে ফিলামন আক্ষরিক অর্থেই সম্মোহিত হয়ে পড়েন এবং পরবর্তীতে হাইপেশিয়ার একজন একান্ত অনুরাগীতে পরিণত হয়।
হাইপেশিয়া
ফিলামন তার ভালোবাসার কথা হাইপেশিয়াকে বলার সময়/সূত্র: commons.wikimedia.org
এই ঘটনা সিরিলকে আরো ক্ষুব্ধ করে তোলে সে ভাবতে থাকে হাইপেশিয়া এইভাবে সকল খ্রিষ্ট ধর্মালম্বীদের ধর্মের পথ থেকে বিচ্যুত করবে।অরিস্টিস ও হাইপেশিয়ার বন্ধুত্বকেও সিরিল কখনোই মেনে নিতে পেরেছিলেন না।হাইপেশিয়ার প্রতি অরিস্টিস ও মানুষের অনুগামিতা তার মনে হিংসার রাজনীতি আর ধর্মের যাতাকলে সিরিলকে বিধ্বংসী করে তোলে।
হাইপেশিয়ার মৃত্
আলেকজান্দ্রিয়ার হাইপেশিয়ার মৃত্যু/সূত্র: commons.wikimedia.org
৪১৫ খ্রিস্টাব্দে মার্চের এক সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবার পথে একদল সন্ন্যাসী তাকে ঘেরাও করে এবং তাকে টানতে টানতে নিয়ে যায় চার্চ সিজারিয়ামে।প্রথমে ঝিনুক দিয়ে তার গায়ের চামড়া চেঁছে ফেলে পরবর্তীতে তাকে উলঙ্গ করে ইট ছুড়তে থাকে যতক্ষন না পর্যন্ত তার মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছিল।এখানেই শেষ নয় তার মৃত্যুর পর তার মৃতদেহ টুকরো টুকরো করে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
হাইপেশিয়ার বন্ধু নগর প্রধান পরবর্তীতে হাইপেশিয়ার এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের রিপোর্ট করেন এবং রোমকে এর তদন্ত করতে অনুরোধ করেন।তারপর তিনি নগর প্রধানের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়েছিলেন।কিন্তু যথেষ্ট সাক্ষীর অভাবে তদন্ত বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল এবং সিরিল ও সংশ্লিষ্ট অভিযুক্তরা মুক্ত হয়ে গিয়েছিল।
হাইপেশিয়ার মৃত্যুর মাধ্যমে গোটা ইউরোপে থেমে যায় বিজ্ঞান ও দর্শন চর্চা।ইউরোপে প্রবেশ করে অন্ধকার যুগে।ধর্মীয় কুপমণ্ডূকতা,কুসংস্কারের অবাধ চর্চা হয়েছে দীর্ঘ এক হাজার বছর ধরে।পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল হাইপেশিয়ার সমস্ত বই,তথ্য এবং লিখনি।
মৃত্যুর তাকে পর ভুলেই যেতে বসেছিল সবাই।ঠিক এমনই মুহূর্তে হত্যার প্রায় তের’শ বছর পর ১৭২০ সালে জন টোলান্ড, ‘Hypatia or the History of a most beautiful, most Virtuous, most Learned and in every way Accomplished lady; Who was torn to pieces by the clergy of Alexandria to gratify the Pride, Emulation and Cruelty of the Archbishop commonly but undeservedly titled St Cyril’ নামের দীর্ঘ শিরোনাম বিশিষ্ট প্রবন্ধে হাইপেশিয়াকে আবার আমাদের সামনে তুলে ধরেন।তিনি প্রবন্ধের মাধ্যমে পুরো পুরুষজাতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলেন এই বলে যে হাইপেশিয়ার মতো সুন্দরী,বিজ্ঞ এবং নিষ্পাপ দার্শনিকেকে খুনের দায়ে সমস্ত পুরুষজাতিকে লজ্জিত হওয়া উচিত।তিনি প্রবন্ধে স্পষ্ট করে সিরিল ও খ্রিষ্টীয় চার্চকেই এই হত্যাকাণ্ডের জন্য অভিযুক্ত করেন।

শেষকথা


একজন মহান ব্যক্তিত্বকে মেরে ফেললেও কখনোই তার আদর্শকে চিরতরে মাটিচাপা দেওয়া যায়না।তাইতো হাইপেশিয়ার মৃত্যুর এত গুলো বছর পরেও তাকে একজন মহান শিক্ষক ও বিজ্ঞানী হিসেবে এখনো স্বীকৃতি দেওয়া হয়।নারীবাদীরা তাকে ঘিরে রচনা করে নারীবাদী সাহিত্য।
তবে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়, পৃথিবীর কোনো ধর্মই কি এই রকম হিংসাত্মক মনোভাব পোষণ করে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here