লেখক: লুৎফুল কায়সার

বর্তমানে ক্রিসমাসের সবচেয়ে আলোচিত চরিত্রটি হল ‘স্যান্টা ক্লজ’। এই চরিত্রটি কিন্তু তখন খুব একটা আলোচিত ছিলনা যখন ক্রিসমাস একটি গুরুগম্ভীর ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছিল। আর স্যান্টা চরিত্রটি খ্রিষ্ট মিথ থেকেও আসেনি। এর অরিজিন খ্রিষ্টের জন্মের কয়েকশো বছর পরের। সান্তা ক্লজের কিংবদন্তী শুরু হয় ‘সেন্ট নিকোলাস’ নামক এক সন্ন্যাসীকে ঘিরে। ২৮০ সালের দিকে এশিয়া মাইন বা বর্তমান তুরস্কের পাতারা নামক অঞ্চলে তার জন্ম হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। সততা এবং দয়ার জন্য সবাই তাকে পছন্দ করতো। সম্পদশালী এই মানুষটি সবসময় গরীব-দুখি এবং অসহায় মানুষজনকে সাহায্য করতেন। শোনা যায়, একবার তিনি দাস হিসেবে বিক্রি হওয়া থেকে ৩টি মেয়েকে রক্ষা করেন এবং তাদের বিয়ের জন্য যৌতুক ও যাবতীয় খরচ প্রদান করেন।সেন্ট নিকোলাসের এসব দান-দক্ষিনা এবং মহানুভবতার খবর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং তিনি মানুষের রক্ষক হিসেবে পরিচিতি পান। তার মৃত্যুর দিন ৬ ডিসেম্বরকে সবাই বিয়ে করার বা কেনাকাটা করার দিন হিসেবে পালন করতো। রেনেসা পর্যন্ত ইউরোপে বেশ জনপ্রিয় ছিলেন সেন্ট নিকোলাস।সেন্ট নিকোলাস আমেরিকায় পরিচিতি পান ১৮শ শতকের শেষের দিকে। ১৭৭৩ ও ১৭৭৪ সালে পরপর দুইবার একটি পত্রিকায় এক ডাচ পরিবারের সেন্ট নিকোলাসের মৃত্যুবার্ষিকী উৎযাপন করার খবর আসে।ডাচ ভাষায় সেন্ট নিকোলাসকে ডাকা হতো সিন্টার ক্লাস (সেন্টনিকোলাসের সংক্ষিপ্ত রূপ)। এই সিন্টার ক্লাস থেকেই মূলত সান্তা ক্লজ নামটির উৎপত্তি।

লেজেন্ড বলে, স্যান্টা প্রতিটি শিশুদের বাড়িতে যান ক্রিসমাসের রাতে। তারপর তাদের জন্য গিফট রেখে দেন আর বাচ্চারা তার জন্য যে দুধ আর বিস্কুট রেখে যান তা খেয়ে নেন। কিন্তু সায়েন্স কি বলে? সায়েন্স কি বলে জানার আগে একটা ছোট্ট পরিসংখ্যান শুনে নেই। লেজেন্ড বলে, স্যান্টা সেইসব বাড়ি ভিজিট করেনা যেখানে শিশু নেই। এই হিসাবে গোটা পৃথিবীতে ২ বিলিয়ন শিশু আছে, মানে ১৮ র নিচে বয়স। এখন আরেকটা হিসাব আসে যে লেজেন্ড আর মিথ এটাই প্রমান করে স্যান্টা অখ্রীষ্টান শিশুদের বাড়িতে যায়না। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ এই ধর্মের অনুসারী ৩৩% আর সেই হিসাবে শিশু ৩৭৮ মিলিয়ন।

বিজ্ঞানীরা বলেন, স্যান্টা যদি পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে ভ্রমণ করেন তবে তিনি ২৪ ঘন্টা সময় পাচ্ছেন না। তিনি সময় পাচ্ছেন ৩১ ঘন্টা কারন টাইমজোন ডিফারেন্স। এখন এই হিসাবে স্যান্টাকে প্রতি সেকেন্ডে ৮২২ টি বাড়ি ভ্রমন করতে হবে ! আর তাকে প্রতি সেকেন্ড ৬৫০ মাইল পারি দিতে হবে। আর এরপরেও তিনি চিমনি দিয়ে নামা আর গিফট রাখার জন্য এক সেকেন্ডের এক হাজারের এক ভাগ সময় পাবেন। আর লেজেন্ড বলে যে স্যান্টা বাচ্চাদের রাখা দুধ আর বিস্কুট খেয়ে যান কিন্তু এই হিসাবে খাওয়ার সময়কে বাদ দেওয়া হয়েছে। তো এই হিসাবে বোঝাই যাচ্ছে যে সায়েন্স স্যান্টার অস্তিত্বকে একেবারেই উড়িয়ে দিচ্ছে। আর রেইন ডিয়ারের ব্যাপারটা? এমন কোন হরিণের খবর তো এখনো পাওয়া যায়নি। তাইনা?

আচ্ছা সত্যিই কি সায়েন্স স্যান্টাকে এইভাবে উড়িয়ে দিচ্ছে? পুরোপুরি নয়। ২০১৬ সালের শেষ দিকে বাচ্চাদের কথা ভেবে কিংবা স্রেফ গবেষনার খাতিরেই ইউরোপের একদল বিজ্ঞানী স্যান্টাকে কোয়ান্টম মেকানিক্সের সাহায্যে এক্সপ্লেইন করতে চেষ্টা করেন। কোয়ান্টম মেকানিক্স হল বিজ্ঞানের সেই শাখা যেটা অতিক্ষুদ্র ‘সাব অ্যাটোমিক পার্টিকেল’ গুলা নিয়ে কাজ করে। আর এই অতিক্ষুদ্র পার্টিকেলগুলা একই সময়ে একইসাথে মহাবিশ্বের দুই অথবা দুইয়ের অধিক জায়গাতে থাকতে পারে। তো এই বিজ্ঞানীদের মতে, স্যান্টাকে একজন রক্তমাংসের মানুষ না মনে করে একটা মাইক্রোস্কোপিক কোয়ান্টম অবজেক্ট বিবেচনা করলেই তো হয়। এইক্ষেত্রে তিনি একই সাথে একই সময়ে একাধিক শিশুর বাড়িতে যেতে পারেন। চিমনি বেয়ে নামতে পারেন আবার দুধ বিস্কুটও খেতে পারেন। আর যেহেতু তিনি মাইক্রোস্কোপিক কণা সেহেতু তাকে কেউ দেখতেও পাবেনা।

তবে এটা মেনে নিতে অনেকেরই আপত্তি আছে। স্যান্টাকে নিয়ে সায়েন্সের আগ্রহ আগে থেকেই ছিল এখনো থাকবে। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাকে একজন জাদুকর হিসাবেই থাকতে দেওয়া ভালো।

https://www.youtube.com/watch?v=x0Crh3eEd2g

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here