লিখেছেনঃ অনিমেষ


গোসল বা স্নান আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ।রোজ বাইরে থেকে এসে বা কোনো পরিশ্রমের কাজ করে স্নান করে আমরা নিজেদের পরিষ্কার রাখতে পছন্দ করি।আধুনিক সময়ে আমাদের সবার হয়তো নিজেস্ব বাথরুম রয়েছে এমনকি কারো কারো হয়তো অনেক উন্নতমানের রয়েছে।
পরিষ্কার থাকা অব্যশই মানুষের টিকে থাকার অস্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।অপরিস্কার থাকার কারনে শরীরে অনেক রোগ বা সমস্যা দেখা দেয় যা পুরোপুরি মৃত্যুর দিকে ধাবিত করে।ইতিহাস থেকে জানা যায় আধুনিক কালের আগে মানুষ অনেক নোংরা ও বর্বর ছিল।এর আরেকটি কারন ছিল স্বাস্থ সম্পর্কে সঠিক দিক নির্দেশনা না থাকা তাই মানুষ স্বাস্থ্য সম্পর্টা ছিল উদাসীন।শুধুমাত্র কিছু ধর্মীয় রীতিনীতি অনুযায়ী পরিষ্কার থাকাটা একটি বাঞ্চনীয় রীতি ছিল।
আজকের আমার এই লেখা কৌতূহল থেকে যে আগে মানুষ কিভাবে গোসল করতে বা কবে থেকে স্নান মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হিসেবে যুক্ত হয়েছে।
অতীতে মানুষ স্নান করার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন ছিল না কারণ তারা স্নান বিষয়টাকে শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান হিসেবে জানতো।ইতিহাসের এক পর্যায়ে মানুষ বুঝতে পারে পরিষ্কার থাকাটা মানুষের স্বাস্থ্যের উপর কতটা প্রভাব ফেলে।
প্রাচীন গ্রিকে সর্বপ্রথম স্নানাগার তৈরির ধারণার সূত্রপাত হয় এবং তারাই প্রথম এটি স্থাপন করে।প্রাচীন কালে জল ব্যবহারের সুব্যবস্থা না থাকায় স্নান করার বিষয়টিতে আগ্রহ কম ছিল।গ্রিসে সর্বপ্রথম পাইপের প্রচলন শুরু হয়,পরে রোমানরা পাইপের মাধ্যমে জল গৃহমধ্যে আনার ব্যবস্থা করে স্নানের সুবিধার জন্য।
ব্যাক্তিগত বাথরুম প্রচলনের আগে গণ স্নানের জায়গা ছিল যেখানে মানুষ ম্যাসাজ ও স্নানের জন্য ব্যবহার করত। প্রাচীনকালে বিশেষকরে রোমান সময়ে যখন পাইপের ব্যবহার শুরু হয়নি তখন মানুষের জন্য ‘আ্যকোয়া সুলিস’ এর ব্যবস্থা ছিল।এর অর্থ হলো স্নানের শহর এবং এর অবস্থান এখন ইংল্যান্ড।সেখানে প্রচুর জলের ব্যবস্থা ছিল মোটকথা সেটি ছিল একটি গণস্নানের জায়গা।শহরের উচ্চবৃত্তরা এটি ব্যবহার করত।
আ্যকোয়া সুলিস/সুত্রঃ Wikimedia / CC BY-SA 4.0
প্রাগৈতিহাসিক সময়েও বাথটাব বা জলের পাইপ ছিল না।সমুদ্র এবং নদীর জল পরিষ্কার ও স্নানের জন্য ব্যবহার হতো।৩০০০ থেকে ২০০০ বিসি এই সময়ে প্রাকৃতিক ঝরনা স্নানের জন্য ব্যবহার হতো।ঝরনাই স্নানের সময় জল সরাসরি মানুষের মাথায় এসে পড়তো এই প্রক্রিয়া থেকে আধুনিক বাথরুমের ঝরনা তৈরির ধারণা তৈরি হয়। ব্যক্তিগত ভাবে স্নান করার বিষয় তখনও প্রচলন না হওয়ায় পাবলিক স্নানে লোকেরা তখন অভ্যস্ত ছিল।১৫০০ খ্রিস্টাব্দের পুরো সময় জুড়ে এই পাবলিক স্নানাগার এর ব্যবহার ছিল।প্রাচীন মিশরীয়রা পরিষ্কার থাকার বিষয়টিকে অনেক গুরুত্ব দিয়েছিল।এটিকে তারা সামাজিক ও ধর্মীয় রীতি হিসেবে নিয়েছিল এবং তারা মনে করতো যারা নিজেকে পরিষ্কার রাখবে তারা দেবতার নিকটতম।মৃতদেহ সমাহিত করার আগেও তারা এটিকে গোসল করাতো ও বিভন্ন সুগন্ধি ব্যবহার করত যাতে মৃত ব্যক্তির বিচারের সময় শুদ্ধভাবে উপস্থাপিত হত।মিশরের লোকেরা স্নান এর এই অভ্যাসকে অনেক পবিত্র মনে করতো তাই তারা দিনে কয়েকবার স্নান করত।
সময়ের সাথে সাথে প্রাচীনকালে বেক্তিগতভাবে স্নান করার ব্যাপার টা মানুষের মাঝে প্রচলিত হয়।তবে এটি তখন শুধুমাত্র বড়লোকদের মাঝেই প্রচলিত ছিল।তাদের চাকররা স্নানের জন্য তাদের উপর জল ঢালত।৫০০ বিসি এর দিকে জিমন‍্যাসিয়াম গুলোতে পাবলিক বিশাল বাথটাব এর ব্যবস্থা করা হয়।এর কারণ ছিল ‘জিমনোস’ শব্দটি একটি গ্রিক শব্দ যার অর্থ নগ্ন।
আ্যথলেটিকরা বিভিন্ন খেলায় অংশগ্রহণ করত এবং তারা তাদের দেহ প্রদর্শন করত।খেলা শেষে তারা বাথটাবে নিজেদেরকে পরিষ্কার বা স্নান করত।
রোমান সাম্রাজ্য পতনের পর যখন অন্ধকারযুগ শুরু হয় তখন ব্যাপক বিশৃংখলার কারণে প্রচুর ঝরনা,পাবলিক স্নানাগার ও বেক্তিগত স্নানের জায়গা গুলি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।পুরো ইউরোপ জুড়ে অপরিস্কারের নতুন একটি যুগের সূচনা হয়েছিল।
সুত্রঃ medievalists.net
অনেক ইতিহাসবিদ ধারণা করে মধ্যযুগ ছিল অপরিস্কার বা নোংরামির কেন্দ্রে।পশ্চিমা দেশগুলোতে স্নানাগারগুলি থাকলেও সেগুলো ব্যবহার হত ভিন্ন ভাবে,কখনো তারা খেতে খেতে স্নান করতো বা কখনো কোনো অনুষ্ঠানে একসাথে বাথটাবে শুয়ে ভাড়া করা মিউজিসিয়ান দ্বারা গান শুনতো মনরঞ্জনের জন্য।কিছু স্নানাগার অনেক জনপ্রিয় হয় তখনকার পতিতালয় গুলোতে যেখানে লোকেরা যৌন ক্রিয়াই লিপ্ত হতে পারত।
আদিম স্নান এর বিবারন
সূত্রঃ gallowglass.org
শালেম‍্যাগনের একজন পন্ডিত ও লেখক ফ্রাঙ্কস নামে এক রাজার স্নান সম্পর্কে বিবরণে বলেন, ” রাজা স্নানের সময় শুধু মাত্র তার পুত্রদেরকেই নয় তার বন্ধু, সভ্রান্ত ব্যক্তিগণ এমনকি মাঝে মাঝে ১০০ মানুষও একসাথে স্নান করত”।
একত্রে স্নান করছেন পুরা পরিবার
সুত্রঃ Wikimedia
এশিয়াতে স্নানের সংস্কৃতিটি ভারতের বৌদ্ধ মন্দির গুলোতে খুঁজে পাওয়া যায় সেখানে মূলত পুরোহিতরা স্নান করতেন রীতি মেনে।পরে এটি চীন এবং জাপানে নারা আমলে ছড়িয়ে পড়ে,মূলত এটি বৌদ্ধ পুরোহিতরাই মেনে চলত।সেই সময়ে তারা মূলত হালকা গরম জলে স্নান করত,এই প্রক্রিয়াটিকে বলা হত “ইয়াহা” যার অর্থ “গরম জলের দোকান”।তবে এই প্রক্রিয়াটি অসুস্থ লোকেরা নিরাময়ের একটি উপায় হিসেবে পালন শুরু করলে এটি ব্যাপক প্রসার লাভ করে।
প্রাচীন স্নান কক্ষ
সুত্রঃ Wikimedia / CC BY-SA 3.0
১৩৪০ থেকে ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বুবোনিক প্লেগটি ইউরোপীয়দের মধ্যে স্নানের ব্যপারে একটা ভীতি তৈরি করে।জীবাণু সম্পর্কে তখন সঠিক কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখা না থাকায় লোকেরা ভাবতো দেহের খোলা ছিদ্র দিয়ে জীবাণু তাদের শরীরে প্রবেশ করতে পারবে এবং শরীর ময়লা রাখলে খোলা ছিদ্রগুলো বন্ধ হয়ে যাবে যার ফলে কোনো জীবাণু তাদের শরীরে প্রবেশ করতে পারবে না।
মধ্যযুগেও স্নানের অভ‍্যাস অনেক লোকের মধ্যেই ছিল তবে সেটি নির্ভর করত ধন,তাদের সামাজিক খ্যাতি ও ব্যক্তিগত ইচ্ছার উপরে। বলা হতো মধ্যযুগে লোকেরা বছরে চারবার স্নান করত- একবার ইস্টারে,একবার জুনের শেষে,একবার সেপ্টেম্বরের শেষে এবং একবার ক্রিসমাসে।তবে অন্যরা আরও ঘন ঘন স্নান করতেন।১৩৫১ সালে কিং এডওয়ার্ড তৃতীয় তার ওয়েস্টমিনস্টার প্রাসাদে বেক্তিগত বাথটাবে জল সরবরাহের জন্য গরম ও ঠান্ডা জলের জন্য ট্যাপ কিনেছিলেন।
পশ্চিমা বিশ্ব বুবোনিক প্লেগের জন্য স্নান থেকে বিরত থাকলেও পূর্বের দেশ ও ধর্মগুলো স্নানের বিষয় ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকার বিষয়টি বজায় রেখেছিল।
১৮ তম শতাব্দীতেও স্নান ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি যে উন্নত স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় সেটা লোকেরা তখনও জানত না এমনকি ডাক্তাররাও সার্জারি করার আগে হাত ধুত না।১৮০০ সালের শেষের দিকে জীবাণু বিষয়ে ইগনাজ সেমেলওয়েসের অনুসন্ধানগুলি ডাক্তারদের দ্বারা গৃহীত হলে তারা পরিষ্কারের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে নেওয়া শুরু করেছিলেন। ১৭৬৭ সালে প্রথম আধুনিক ঝরনা ইংল্যান্ডের উইলিয়াম ফেথাম আবিষ্কার করেছিলেন।
১৮০০ এর দশকে পাবলিক স্নানাগারগুলি আবার খোলা হয়েছিল।প্রথম পাবলিক স্নানাগার ১৮২৯ সালে ইংল্যান্ডের লিভারপুলে খোলা হয়েছিল। ১৮৬১ সালের দিকে স্যানিটেশন এবং ভালো স্বাস্থবিধি দ্বারা যে অনেক রোগ প্রতিরোধ করা যায় এই ধারণাটি সবার মাঝে বিস্তার লাভ করে।একই সালে ইউএস এর স্যানিটারি কমিশন একটি ত্রান সংস্থা তৈরি করেছিল এবং তারা রোগীকে স্বাস্থ সেবা ও তাদের পোশাক এবং ঘর পরিষ্কার করে দিত ফলে স্যানিটেশন এর যে ধারণা তার নতুন সূচনা হয়।তারা শুধু মাত্র পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার ফলেই অনেক রুগী সুস্থ হয়ে ওঠে।সম্ভবত এই যুগেই আমেরিকানরা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা,প্রতিদিন স্নান,শ্যাম্পু,সাবান এইসবের ব্যবহার শুরু করেছিল। ১৯০০ সালের শুরুর দিকে আমেরিকানরা স্নানটাকে দৈনন্দিন জীবনের অংশ হিসেবে নিয়েছিল।
একবিংশ শতাব্দীতে স্নান বা গোসল করা মানুষের দিনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ।বর্তমানে আধুনিক বাসাগুলোতে প্রায় প্রতিটা রুম এর সাথে বাথরুম থাকে।বর্তমানে পৃথিবীর সব স্থানেই স্নানকে একটি বেক্তিগত বিষয় হিসেবে নিলেও বিশ্বের কিছু স্থানে এখনও গ্রুপ স্নান চালু রয়েছে, এর মধ্যে রয়েছে তুরস্ক।তাদের এটিকে “হামামস” বলা হয়।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here