দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন পুরোদমে চলছে। বিশ্ব জুড়ে একটা অস্থির পরিস্থিতি। এমন ই এক সকালে সমুদ্রে মাছ ধরছিল কিছু জেলে। ওই দিন মাছও ধরা পড়ছিল অনেক। হঠাৎ নৌকার পাশে ঘুরতে দেখা গেল একটা স্পার্ম তিমিকে। মালয়েশিয়ার উপকূলে দীর্ঘদিন ধরে মাছ ধরা দক্ষ জেলেদের কাছে এ দৃশ্য নতুন নয়। কিন্তু আজ যে অন্য কিছু ঘটতে চলেছে তা কেউ গুণাক্ষরেও টের পায় নি। হঠাৎ একটা ধাক্কায় জেলে নৌকাটা কেঁপে উঠলো। তারপর সব শান্ত। তারপর কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক ধাক্কায় নৌকা উল্টে গেল। শুধু দেখা গেল কয়েকটা বড় বড় শুঁড়ের মত কর্ষিকা নৌকাটাকে সমুদ্রের অতলে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। ঘটনার আকস্মিকতায় প্রাণ হারান নৌকার অধিকাংশ জেলে।

সেদিন বেঁচে যাওয়া জেলেরা দৈত্যটিকে ‘ক্রাকেনকে’ নামে উল্লেখ করেছিলেন। গল্পের সেই ক্রাকেনকে বাস্তবে ছিল জায়ান্ট স্কুইড বা আরকিটেউথিস। সেফালোপোডা গোত্রের প্রাণী স্কুইড। বিশ্বের বেশিরভাগ সমুদ্র এরা দাপিয়ে বেড়ায়।

পৃথিবীর যত রহস্যময় প্রাণী আছে তার মাঝে স্কুইড অন্যতম। আকৃতিতে এরা ঠিক যেন একটা জ্বলমান বিশালাকার রকেট। সেই সাথে বিভিন্ন রং নিক্ষেপ করে প্রতিপক্ষকে অন্ধ করে পালিয়ে যাওয়ার জাদুকরী ক্ষমতা এই দানবাকৃতির প্রাণীকে করেছে আরো রহস্যময়। এই একই প্রজাতির আরো একটি প্রাণী হচ্ছে অক্টোপাস। তবে স্কুইডের আছে অক্টোপাসের চেয়ে দু’টি বেশি অর্থাৎ ১০টি হাত বা কর্ষিকা৷ রূপকথার সব দানবীয় ভয়ংকর প্রাণীদের মতো স্কুইডদের একটি চোখ ও বুদ্ধিদীপ্ত মস্তিস্ক রয়েছে। একটি শক্ত খোলসের বাইরে থাকা হাতগুলোর মধ্যে আটটি ছোট ও দু’টি লম্বা৷ লম্বা হাত দিয়ে তারা শিকার ধরে আর ছোট হাত দিয়ে শিকার মুখে দেয়৷ অসংখ্য চোষক থেকে স্কুইড এর হাত বা কর্ষিকা থাকে যা দিয়ে শিকারকে আঁকড়ে ধরে দাঁত দিয়ে ফুটো করে শিকারকে পেটে ভরে দেয় দানবীয় সব স্কুইডরা। মানুষকেও হত্যা করতে সক্ষম জায়ান্ট স্কুইডরাই সমুদ্রের সবচেয়ে বড় অমেরুদন্ডী প্রাণী। বড়বড় স্পার্ম তিমি, যা ২০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে, এরাই জায়ান্ট স্কুইডদের প্রধান খাবার।

জাপানের ইউজো অ্যাকুরিয়ামের অধ্যক্ষ মিতসুহিরো ফুয়া প্রায় ২৫০ প্রজাতির স্কুইড এর কথা উল্লেখ করেছেন, যার মধ্যে কিছু প্রজাতির স্কুইড সমুদ্রের অনেক গভীরে থাকে আর কিছু প্রজাতি থাকে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে কিছুটা নীচে৷ সমুদ্রের শুঁড়ওয়ালা শামুক হিসাবে বহুল পরিচিত স্কুইডরাই হল গভীর সমুদ্রের জায়ান্ট বা দানবীয় স্কুইড। জলের উপরিভাগে এদের সচরাচর দেখা না গেলেও মাঝে মধ্যে মাছ ধরার জালে আটকা পড়ে এরা।

স্কুইড এর উপর বই প্রকাশ করছেন এমন একজন ড্যারেন নেইশ। তিনি তার একটি নতুন বইয়ে লিখেছেন, জায়ান্ট স্কুইডের পুরো শরীরের পরিমাপ করা কঠিন। কারণ, যখন পানি থেকে ওঠানো হয়, তখন এটির নরম টিস্যু ইলাস্টিকের মতো প্রসারিত বা সংকুচিত হতে থাকে অথবা খোলস বা শক্ত আবরণের মধ্যে এরা লুকিয়ে পড়তে পারে মুহূর্তের মধ্যেই। তারপরও জায়ান্ট স্কুইডের শরীরের বড় অংশ যেটি সংকুচিত বা প্রসারিত হয়, ওই অংশের দৈর্ঘ্যের সঙ্গে মাথা ও কর্ষিকার দৈর্ঘ্য যোগ করে স্কুইডের সামগ্রিক দৈর্ঘ্য মাপা হয়।

স্কুইডকে সর্বপ্রথম ইউরোপে দেখা গেলেও পৃথিবীর মানুষের কাছে সর্বপ্রথম ভালভাবে এদেরকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে জাপান। সপ্তদশ শতকে প্রথম জায়ান্ট স্কুইডদের দেখা মেলে কিন্তু ২০০৪ সালে প্রথম এদের অফিসিয়াল ছবি প্রকাশিত হয়। কিন্তু শেষ তুলির আঁচড় দেয় জাপান ২০১৪ সালে। জায়ান্ট স্কুইডদের জীবন ও বাসস্থান নিয়ে প্রথম ভিডিওটি প্রকাশ করে তারা। যুক্তরাজ্যের স্কটল্যান্ড সেন্ট অ্যাণ্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী ড. ক্রিস প্যাক্সটন বলেন, ‘১৬৩৯ সালে যখন প্রথম জায়ান্ট স্কুইড আবিষ্কৃত হয়, তখন সেটিকে সবচেয়ে বড় মাপের বলে মনে করা হতো। কিন্তু পরে এর চেয়েও বড় আকারের জায়ান্ট স্কুইড দেখা গেছে’। তিনি আরো জানান, ‘এ পর্যন্ত সব মিলিয়ে প্রায় ৪৬০টি দানব স্কুইডের নমুনা মাপা হয়েছে। সাধারণভাবে ৫.৮৩ থেকে ২৭.৫৩ মিটার দৈর্ঘ্যে সংকুচিত-প্রসারিত হতে পারে এ প্রাণীটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মালদ্বীপে ধরা পড়া স্কুইডটি বিস্ময়করভাবে ৫৩ মিটার দীর্ঘ ছিল। আর এর শক্ত খোলসের দীর্ঘতম নির্ভরযোগ্যভাবে মাপা দৈর্ঘ্য ছিল ২.৭৯ মিটার’। অন্যদিকে এখন পর্যন্ত জানা জায়ান্ট স্কুইডদের মধ্যে ১৮৭৯ সালের মে মাসে পাওয়া নিউজিল্যান্ডের কুক প্রণালীর জায়ান্ট স্কুইডটি এখন পর্যন্ত প্রাণীটির বৃহত্তম মৃত নমুনা। এ স্কুইডটির মোট দৈর্ঘ্য ছিল ১৪.২৮ মিটার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here