লুৎফুল কায়সার

রূপকথার স্বপ্নময় ভূবন কতই না রঙিন! আমাদের শিশুকালকে মাতিয়ে রাখার জন্য এগুলোই যথেষ্ট ছিল। ছোটবেলাতে রূপকথা শোনেনি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কিন্তু প্রায় অসম্ভব। কিছু অতি আবেগী শিশু তো রূপকথাগুলোকে সত্য বলে বিশ্বাস করে পরে মনোকষ্টেও ভুগেছে।

রূপকথার একটা বিশেষ গোত্র হলো ইউরোপিয়ান ফেয়ারীটেলস। এগুলো মূলত ইউরোপের রূপকথা। ইউরোপীয়রা প্রায় গোটা পৃথিবী জুড়েই নিজেদের প্রভাব আর উপনিবেশ বিস্তাব করেছিল আর তখনই তাদের রূপকথাগুলো গোটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে যায়। রূপকথার সবচাইতে জনপ্রিয় জনরা এটিই।

‘সিন্ডারেলা’, ‘তন্দ্রাবতী’(স্লিপিং বিউটি), স্নো হোয়াইট, হানসেল গ্রেটেল, ব্যাঙ রাজকুমার এই রূপকথাগুলো গোটা পৃথিবীতে প্রায় কিংবদন্তীর মতো জনপ্রিয়। এখনো হাজার হাজার মা তাদের বাচ্চাকে ঘুম পাড়ানোর জন্য এইসব গল্প পড়ে শোনান।

কিন্তু আপনি যে রূপকথাগুলো পড়ছেন, সেগুলো আসলেই কি এমন? আসলেই কি গল্পগুলো শুরুতে এমন ছিল?

উত্তর হলো, “না।” এই গল্পগুলোই যুগের সাথে প্রচুর পরিবর্তন করা হয়েছে। আর কিছু কিছু গল্পের মূল সংস্করন রীতিমত শিউরে ওঠার মতো! এগুলো এতটাই ভয়াবহ ছিল যে এগুলোকে পরিবর্তন করতে হয়েছে। কিছু গল্পে তো নারী ও শিশুর অবমাননার ঘটনাও রয়েছে!

তেমনই কিছু গল্পের মূল সংস্করন নিয়ে লেখব। এই লেখাটি আপনার ছোটবেলার স্মৃতিকে অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্থ করবে। তাই ওই স্মৃতিগুলো যদি আপনার কাছে খুব বেশী মূল্যবান হয় তবে আপনি দয়া করে এই লেখাটি এড়িয়ে যান।

‘সিন্ডারেলা’ নামটি রূপকথার জগতে একটি কিংবদন্তীর মতো। এর চাইতে বিখ্যাত রূপকথা আর নেই, সম্ভবত আসবেও না। ইউরোপের কোন দেশে এই রূপকথাটির জন্ম হয়েছে তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে, তবে বেশীভাগের মতেই এই গল্পের জন্মস্থান ফ্রান্স।

দুঃখী মেয়ে সিন্ডারেলার দুঃখ আমাদেরকে কাঁদায়, তার নিঃসঙ্গ জীবনে তার সঙ্গী হয় তার পোষা প্রাণীগুলো এক একজন ‘পরী’। এই পরীর কারসাজিতেই রাজকুমারের সাথে নাচার সুযোগ পায় সিন্ডারেলা। তার প্রেমে পড়ে যান রাজকুমার। এরপর তার ফেলে যাওয়া একটি জুতার দিয়েই খুঁজে বের করা হয় তাকে। সিন্ডারেলা দুই সৎ বোনও জুতাটি পায়ে পরার চেষ্টা করে, কিন্ত তাদের পায়ে জুতাটি লাগে না। অবশেষে সিন্ডারেলাকে সবার সামনে আনা হয় এবং জুতাটি তার পায়ে লেগে যায়! এরপরেই সিন্ডারেলার সাথে রাজপুত্রের বিয়ে।

কিন্তু মুল সংস্করনে কিন্তু এমনটা ছিল না!

মূল সংস্করনে যা দেখা যায় সেটি হল সিন্ডারেলার প্রথম সৎ বোন জুতাটি পড়ার চেষ্টা করে কিন্তু তার একটি আঙ্গুল কিছুতেই জুতাতে ঢুকছিল না। তখন তার মা মানে সিন্ডারেলার সৎ মা তাকে বলেন, “তোমার ওই আঙ্গুলটা কেটে ফেলি! তুমি রাজপুত্রের বউ হলে তোমাকে আর হাঁটতেই তো হবে না, তখন আর কে ওটা খেয়াল করবে?” এই বলে তিনি তার আঙ্গুল কেটে দেন। এরপর তার পায়ে জুতা লেগে যায়। রাজপুত্র তাকে নিয়ে রওনাও হয়ে যান তবে মাঝ রাস্তাতে তিনি মেয়েটির পা থেকে বের হওয়া রক্তের ধারা দেখতে পান এবং তিনি তাকে নিয়ে ফিরে আসেন।

এরপর সিন্ডারেলার দ্বিতীয় সৎ বোন জুতাটি পরতে চেষ্টা করে। তার গোড়ালি কিছুতেই ঢুকছিল না, তখন তার মা তাকেও বলেন, “তোমার গোড়ালি কেটে ফেলি! তুমি রাজপুত্রের বউ হলে তোমাকে আর হাঁটতেই তো হবে না, তখন আর কে ওটা খেয়াল করবে?” এরপর তার গোড়ালি কেটে ফেলা হয় এবং যথারীতি জুতো পরিয়ে তাকে নিয়েও রওনা দেন রাজপুত্র। কিন্তু রাস্তাতে একইভাবে রক্ত দেখে তিনি ফিরে আসেন।

এরপর জুতাটি সিন্ডারেলা পরে। কাটাকুটির ব্যাপারগুলো বাচ্চাদের সহ্য হবে না বলে পরে গ্রীম ভাইয়েরা তাদের সংস্করনে এগুলো বাদ দেন।তারা আরো একটা জিনিস বাদ দেন। আচ্ছা, সিন্ডারেলা সৎ মা আর বোনদের কি হয়েছিল? আমরা পড়েছি যে সিন্ডারেলা আর রাজপুত্র তাদের ক্ষমা করে দিয়েছিল।

কিন্তু আসল গল্পটিতে তা হয়েছিল না। আসল গল্পে দেখা যায় যে রাজপুত্র লোহার জুতা তৈরী করান এবং সেগুলোকে আগুনে গরম করে সিন্ডারেলা সৎ মা আর বোনদের পরিয়ে দেন। তাদেরকে ওই অবস্থাতেই নাচতে বাধ্য করা হয় এবং নাচতে নাচতেই তাদের মৃত্যু হয়!গল্পের নায়কের এমন নিষ্ঠুর ব্যাবহার বাচ্চাদের মনে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে এই আশংকাতে পরে এই ব্যাপারটা বাদ দেওয়া হয়!

তন্দ্রাবতী বা স্লিপিং বিউটি, এই রূপকথাটিও বেশ জনপ্রিয়। নিঃসন্তান রাজা-রানীর বহুদিন পর এক অপরূপ সুন্দরী কন্যা সন্তান হয় কিন্তু দুষ্টু পরীর কারসাজিতে একশো বছরের জন্য ঘুমিয়ে পড়ে গোটা রাজ্য। পরে এক সাহসী রাজকুমার আসে, এবং সে চুমু খেয়ে ঘুম ভাঙ্গায় তন্দ্রাবতীর।

কিন্তু মূল গল্পটি কিন্তু এমন ছিল না। সম্ভবত এই গল্পটিকেই সবচাইতে বেশী বদলানো হয়েছে।

মূল গল্পটিতে, তন্দ্রাবতীর একটা নাম দিয়েছিলেন তার মা-বাবা মানে রাজা-রানী, নামটি ছিল ‘অরোরা’। কিন্তু পরে চার্চের ভয়ে ব্যাপারটি পরিবর্তন করা হয়। কারণ অরোরা ছিলেন রোমান সূর্যোদয়ের দেবী যার চোখের পানি শিশির হয়ে যায়। আর ছোট্ট বাচ্চাদের ভিতর পৌত্তলিকতা ছড়ানোর অভিযোগে গল্পটি তারা নিষিদ্ধ করতেই পারতেন। তাই মূল নাম চাপা দিয়ে তন্দ্রাবতী বা স্লিপিং বিউটিই রেখে দেওয়া হয়।

আর  পড়েছি যে দুষ্ট পরী তন্দ্রাবতীকে ছল করে এনে তার হাতে চরকার সূচ ঢুকায়। কিন্তু মূল গল্পে, সে নিজ হাতে সেটি তন্দ্রাবতীর হাতে গেঁথে দেয়। ব্যাপারটা বাচ্চাদের জন্য একটু বেশীই নির্মম হয়ে যায়, তাই এটিকেও বদলে ফেলা হয়।

এইবার আমরা যাব গল্পটির অন্ধকারতম প্রান্তে।

তন্দ্রাবতীকে উদ্ধার করতে কোন রাজপুত্র আসে না! বরং আসেন একজন রাজা। যিনি আগে থেকেই বিবাহিত ছিলেন। এটিকেও পরিবর্তন করে রাজাকে রাজপুত্র বানান হয়।

আর সবচেয়ে আজব ব্যাপার হলো, রাজা তন্দ্রাবতীকে চুমু খেয়ে ঘুম ভাঙ্গান না বরং তিনি তাকে ঘুমের ভিতরেই ধর্ষন করেন! দশমাস পর তন্দ্রাবতীর বাচ্চা হয় আর সেই বাচ্চা তার মায়ের হাত থেকে চরকার সূচটি কামড়ে তুলে ফেলে আর তার ঘুম ভাঙ্গে! রাজার আগের স্ত্রী অনেক চেষ্টা করে তন্দ্রাবতী আর বাচ্চাকে হত্যা করার কিন্তু কিছুতেই সফল হয় না। শেষে রাজার সাথে তন্দ্রাবতীর বিয়ে হয়!

‘দ্য লিটল রেড রাইডিং হুড’ এই গল্পটি আমাদের দেশে ‘মিষ্টি লাল মেয়ে’ নামেই বেশী পরিচিত।

গল্পটি ছোটদের বেশ প্রিয়। নিজের অসুস্থ দাদীকে দেখতে যায় মিষ্টি লাল মেয়ে আর রাস্তার মধ্যে তাকে খেয়ে ফেলার অনেক চেষ্টা করেও বিফল হয় নেকড়ে।

কিন্তু মূল সংস্করনটিতে মেয়েটিকে খেয়েই ফেলে নেকড়ে! এই গল্পটি লেখা হয়েছিল ছোট বাচ্চাদের এবং বিশেষ করে মেয়েদের ভয় দেখানোর জন্য। সেসময় মেয়েদের বাইরে যাওয়া একদমই পছন্দ করতো না চার্চ, আর তাদের উৎসাহেই গল্পটি লেখা হয়েছিল।হানসেল আর গ্রেটেলের সবাই শুনেছেন আশা করি। হানসেল আর গ্রেটেলকে মিথ্যা বলে বনে রেখে আসে তাদের মা আর সেখানে এক ডাইনীর পাল্লাতে পড়ে তারা। অবশেষে ডাইনীকে ধোঁকা দিয়ে উনুনের মধ্যে ফেলে দিয়ে পালিয়ে আসে তারা।

কিন্তু মূল গল্পটিতে আসলে দেখানো হয় যে ডাইনীকে ঘুমের মধ্যে চাকু দিয়ে জবাই করে হত্যা করে হানসেল আর গ্রেটেল আর তারপর পালিয়ে আসে তারা! এই ব্যাপারটা পরে বদলে ফেলা হয়।

‘রুমপেলটিকস্টিলস্কিল’ গল্পটি তুমুল জনপ্রিয়! এই গল্পে গরীব কৃষকের মেয়ে ‘লিলি’কে খড় থেকে সোনা বানানোর জন্য আটকে রাখেন রাজা আর এই সময়ে লিলিকে সাহায্য করে অদ্ভুত এক বেটে বামুন যার নাম হলো রুমপেলটিকস্টিলস্কিল।

প্রথম দিন সাহায্যের বিনিময়ে সে লিলির আংটি নেয়, পরের দিন ওড়না এবং তারপরের দিন তারা জামার একটা অংশ!

চতুর্থ দিন লিলির আর দেওয়ার মতো কিছুই ছিল না। তাই বামুন বলে তাকে বলে যায় যে রাজার সাথে বিয়ের পর লিলির প্রথম সন্তানকে সে নিতে আসবে।

কিন্তু মূল গল্পে এমনটা ছিল না। সেখানে দেখানো হয় যে চতুর্থ দিন সোনার সুতো বানিয়ে দেওয়া বিনিময়ে লিলির সাথে যৌনক্রিয়ায় লিপ্ত হয় বামুন এবং তাকে জানায় যে পাঁচবছর পর সে নিজের ছেলেকে নিতে আসবে।লিলি যে ছেলের জন্ম দিয়েছিল তার পিতা আসলে রাজা ছিলেন না, তার পিতা ছিল রুমপেলটিকস্টিলস্কিল!বেশ কয়েকটি বিখ্যাত ফেরারীটেলের অন্ধকার অতীতের কথা তো বলা হলো। কিন্তু এমনও একটি গল্প রয়েছে যেটিতে সম্পাদিত সংস্করন ইউরোপ আমেরিকাতে পড়ানো হয় তবে আমাদের উপমহাদেশে মূল গল্পটাই পড়ানো হয়।

সেই গল্পটি হলো ‘ব্যাঙ রাজকুমার’ বা ‘দ্য ফ্রগ প্রিন্স’। তুমুল জনপ্রিয় এই গল্পটির মূল সংস্করনে রাজকন্যা ব্যাঙটিকে চুমু খায় না, বরং তাকে হাতের মুঠোয় নিয়ে দেয়ালে ছুড়ে মারে! আর এর ফলেই সে মানুষ হয়ে যায়!ব্যাঙকে দেয়ালে ছুড়ে মারার ব্যাপারটা ছোট বাচ্চাদেরকে পশু নির্যাতনে উৎসাহিত করবে এই ভয়ে পরে এটিকে বদলে ফেলা হয় এবং দেখানো হয় যে রাজকন্যা ব্যাঙটিকে চুমু খাচ্ছে এবং তারপর সে মানুষ হয়ে যাচ্ছে!কিন্তু এইখানে আবার একটা সমস্যা বেঁধে গেল। আমাদের উপমহাদেশে চুমু ব্যাপারটা নিয়ে প্রবলেম আছে, বিশেষ করে ছোট বাচ্চাদের গল্পে। তাই আমাদের উপমহাদেশের জন্য মূল গল্পটিই রেখে দেয় হলো! আর এটাই আমাদের বাচ্চারা পড়ে।

এরকম আরো অনেক ফেয়ারীটেল রয়েছে যেগুলোর মূল সংস্করন গায়ে কাটা দেওয়ার মতো। সেগুলো নিয়ে পরে কোনদিন আলোচনা হবে।

2 COMMENTS

    • সামনে আরো আসছে পড়তে চাইলে চোখ রাখুন।ধন্যবাদ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here