শাস্তি বলতে বোঝায় কোন অপরাধের মাত্রা হিসাব করে কর্তৃপক্ষ দ্বারা আরোপিত হয়ে অপরাধীর ক্ষতি করা। এই ক্ষতি হতে পারে জীবনাবসান অথবা শারীরিক কোন ক্ষতি। এই আইনসিদ্ধ ক্ষতি যেটি আমরা শাস্তি নামে চিনি সেটি চলে আসছে মানব ইতিহাসের সেই শুরু থেকে। যে নীতিটি প্রায়ই শাস্তির ক্ষেত্রে অনুসরন করা হয় তা হল অপরাধের মাত্রার সাথে শাস্তির মাত্রাকে সমান করা। অর্থাৎ কাউকে ঠকারনোর জন্য মৃত্যুদন্ড দেওয়া যাবে না। কারন কাউকে ঠকানোর অপরাধের শাস্তি কখনও মৃত্যুদন্ডের মত কঠিন হতে পারে না, খুব বেশী হলে জেল বা জরিমানা হতে পারে। অন্যদিকে শাস্তি হতে হবে মানবিক অর্থাৎ মৃত্যুদন্ড মানে যে তাকে খুব কষ্ট দিয়ে মেরে ফেলতে হবে তা নয়। আধুনিক সমাজে মৃত্যুদন্ডও খুব মানবিকভাবে জনগনের চোখের আড়ালে প্রদান করা হয়।

সব সময় মৃত্যুদন্ড কিন্তু এমন ছিল না। বিশেষ করে মধ্যযুগে মৃত্যুদন্ড ছিল খুব ভয়ংকর, কারণ তখনকার সমাজ ব্যবস্থায় মনে করা হত যত বেশি কষ্ট দিয়ে জনগনের সামনে মানুষকে মারা যাবে ততবেশি জনগন আইনের অনুশাসন মেনে চলবে। এরকম ১০ টি ভয়ংকর মৃত্যুদন্ড প্রদানের কৌশল সম্পর্কে আজকের এই আর্টিকেল।

১। ক্রুশবিদ্ধকরণ:


crusification, cross, মৃত্যুদন্ড, capital punishment, ক্রুশবিদ্ধকরণ, ক্রুশ
ক্রুশবিদ্ধকরণ মৃত্যুদন্ড (ছবি সূত্র: www.wikiart.org)

যীশুখ্রিষ্টকে ক্রুশবিদ্ধ করার কথা তো সকলেই জানেন। সেই একই পদ্ধতি এটি। এই পদ্ধতিতে মৃত্যুদন্ড দেওয়ার জন্য একটি ক্রশ বা যোগচিহ্ন আকৃতির কাঠামোতে অপরাধীর হাত-পা বেধে বা পেরেক দিয়ে আটকে দেওয়া হত। তারপরে ক্রসটি উপরে তোলা হত এবং অপরাধী সকলের কাছে প্রদর্শিত হত। কখনও কখনও মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার দ্বায়িত্বে থাকা এজেন্ট বড় লাঠি দিয়ে অপরাধীর পা ভেঙে ফেলত। কখনও কখনও আইনের এই এজেন্টরা ক্রস থেকে ঝুলতে থাকা অপরাধীদের ছুরিকাঘাত করত, এগুলো সবই করা হত জনগনের সামনে। হয়ত ভাবছেন কি মারাত্ম! আধুনিক সময়ে এটা সম্ভবই না। ভুল! জাপানিরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার পদ্ধতি হিসাবে ক্রুশবিদ্ধকরণ ব্যবহার করেছিল এবং সোভিয়েতরা পূর্ব ফ্রন্টে জার্মান নাগরিকদের ক্রুশবিদ্ধ করেছিল বলে একটা খবর এখন রয়ে গেছে। ক্রুশবিদ্ধকরণ এর ইতিহাস কিন্তু এখনও শেষ হয়নি। ইসলামিক স্টেট বা আইসিস শত্রুদেরও ক্রুশে দিয়েছে। শুধু আইসিস নয় ক্রুশবিদ্ধকরণ পদ্ধতি বার্মিজ সরকার স্বাধীনতাপন্থী বিদ্রোহীদের এবং ইউক্রেনীয় সরকার রাশিয়াপন্থী বিদ্রোহীদের উপরও ব্যবহার করেছে।

২। ইঁদুর পদ্ধতি মৃত্যুদন্ড:


rat, rat punishment, ইঁদুর, ইঁদুর পদ্ধতি, capital punishment, মৃত্যুদন্ড
ইঁদুর পদ্ধতি মৃত্যুদন্ড (ছবি সূত্র: www.thunderclam.wordpress.com)

ভাবছেন এটা আবার কোন পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে ইদুর মূল কাজটি করে থাকে বলে একে ইদুর পদ্ধতি বলে। এই পদ্ধতিতে একটি মাটির বা ধাতুর তৈরী পাত্র নেওয়া হয়। তারপর পাত্রটির মধ্যে কয়েকটি ইদুর ঢুকিয়ে পাত্রটি অপরাধীর বুক বা পেটের উপর উল্টোদিক করে স্থাপন করা হয়। তারপর ঐ পাত্রের উপর আগুন বা জ্বলন্ত কয়লা রেখে দেওয়া হয়। এতে করে তাপ থেকে ইদুরগুলো বাঁচার জন্য অপরাধীর বুক বা পেট ছিড়ে ভেতরের দিকে ঢুকে যায়। যাতে করে অপরাধী তীব্র যন্ত্রনায় চিৎকার করতে করতে আস্তে আস্তে মৃত্যুবরণ করে। অভিযোগ আছে যে ল্যাটিন আমেরিকার সামরিক সরকার এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলি ১৯৮০ এর দশকে ইঁদুরের এই পদ্ধতি নির্যাতন হিসাবে ব্যবহার করত। ১৯৮০ এর দশকে আর্জেন্টিনাতে ইহুদি বন্দীদের জোর করে তাদের মলদ্বারে অনাহারি ইঁদুর ভরে দিয়ে নির্যাতন করা হত বলে শোনা যায়।

৩। সিসিলিয়ান ষাড় বা ব্রাজেন বুল:


cicilian, bull, brajen bull, ষাড়, সিসিলিয়ান ষাড়, capital punishment
সিসিলিয়ান ষাড় বা ব্রাজেন বুল মৃত্যুদন্ড (ছবি সূত্র: www.pinterest.com & www.howitworksdaily.com)

এই পদ্ধতিতে আসলে ব্রোঞ্জ বা ব্রাজেন এর তৈরী ষাড় ব্যবহার করা হত। অর্থাৎ ষাড় এর মত দেখতে ভিতরে ফাপা একটি ব্রোঞ্জ নির্মিত ষাড়ের অবয়ব তৈরী করা হত। আর এই ষাড়ের পিঠের দিক দিয়ে একটা ঢোকার দরজা রাখা ছিল। যে অপরাধী তাকে ঐ ষাড়ের পিঠের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিত। এরপর ব্রোঞ্জ এর ষাড়ের কাঠামোর নিচে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হত। চিন্তা করুন ভিতরে আটকানো অপরাধীকে কতটা কষ্ট দিত এই আগুন। অপরাধী যত চিৎকার করত ততো বেশী ষাড়ের ডাকের মত শব্দ বের হত কারন বিশেষভাবে এ্যাকুইস্টিক ইঞ্জিনিয়ারিং প্রয়োগ করা হত ষাড়টি তৈরীতে। এভাবেই তীব্র তাপে অপরাধী আস্তে আস্তে মারা যেত। রোমানরা এই নির্যাতনের যন্ত্রটি কিছু খ্রিস্টানকে হত্যা করার জন্য ব্যবহার করেছিল বলে উল্লেখ করা হয়, বিশেষত সেন্ট ইউস্ট্যাসিকে। প্রায় দুই শতাব্দী পরেও যন্ত্রটি ব্যবহারে হয়েছিল বলে দাবি করা হয়, যখন আরেক খ্রিস্টান, টারসাস পেলাগিয়াকে সম্রাট ডায়োাক্লেটিয়ান দ্বারা খ্রিস্টপূর্ব ২৮৭ সালে এই ষাড়ের মাধ্যমে মেরে ফেলা হয়।

৪। ছাল ছাড়ানো মৃত্যুদন্ড:


flying, skinning, skin, ছাল , ছাল ছাড়ানো, capital punishment
ছাল ছাড়ানো মৃত্যুদন্ড (ছবি সূত্র: www.wga.hu)

এই ছাল বা চামড়া ছাড়ানো পদ্ধতি শুধু যে মৃত্যুদন্ড দিতে ব্যবহার করা হত তা নয়, ছোট খাট শাস্তিতেও ব্যবহার করা হত। অপরাধের মাত্রার উপর বিচার করে অপরাধীর দেহের কতটুকু চামড়া অপসারণ করা হবে তা হিসাব করা হত। মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত ব্যক্তির পুরো শরীরের চামড়া তুলে ফেলা হত জনসমক্ষে। ত্রয়োদশ শতকের শুরুর দিকে ইংল্যান্ডের রাজা, বিভিন্ন চার্চ এবং চীনে এই ছাল ছাড়ানো শাস্তি প্রয়োগ করা হত।

৫। ব্রেকিং হুইল বা ফরাসী চাকা:


capital punishment, wheel, french wheel, bone, bone crushing, ফরাসী চাকা, চাকা
ব্রেকিং হুইল বা ফরাসী চাকা মৃত্যুদন্ড (ছবি সূত্র: www.wonderslist.com)

ব্রেকিং হুইল বা ফরাসী চাকা বা ক্যাথরিন হুইল নামে পরিচিত এই মৃত্যুদন্ড কার্যকর পদ্ধতিটিতে অপরাধীকে একটি চাকাযুক্ত কাঠের চক্রের সাথে আটকে দেওয়া হত। তারপর চাকাটি ঘুরালে অপরাধীর পিঠ বরাবর প্রচন্ড চাপের সৃষ্টি হত যাতে পায়ের হাড় থেকে শুরু করে একে একে শরীরের সমস্ত হাড় ভেঙে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হত। এই পদ্ধতির উৎস অজানা, তবে এটি মধ্যযুগে পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যে (যা বর্তমানে জার্মানি) উদ্ভাবিত এবং ব্যবহার হত বলে মনে করা হয়। কালো যাদুবিদ্যা যারা চর্চা করত তাদেরকে এই শাস্তি দেওয়া হত বলে মনে করা হয়।

৬। ইম্পেলমেন্ট বা বিদ্ধ করা:


ইম্পেলমেন্ট, বিদ্ধ, বিদ্ধ করা, impalement, brutal, capital punishment
ইম্পেলমেন্ট বা বিদ্ধ করা মৃত্যুদন্ড (ছবি সূত্র: www.historyrundown.com)

মৃত্যুদন্ড কার্যকরের এই পদ্ধতি মূলত পশ্চিম ও মধ্য ইউরোপের দেশগুলোতে দেখা যেত। জার্মানী, অস্ট্রিয়া, ইতালি, বুলগেরিয়া, রাশিয়া, হাঙ্গেরী ইত্যাদি দেশগুলোই এই শাস্তির কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে পরিগনিত হত। এই পদ্ধতিতে অপরাধীকে এমনভাবে একটি তীক্ষè লাঠি বা ধাতব কোন লম্বা বস্তুর উপর বসিয়ে দেওয়া হত যেন ঐ লাঠিটি অপরাধীর মলদ্বার বা যোনিপথে ঢুকে থাকে। এরপর শরীরের ওজন এবং মধ্যাকর্ষনজনিত টানের জন্য ক্রমশ লাঠিটি অপরাধীর দেহের মধ্য দিয়ে যেয়ে মুখ দিয়ে বেরিয়ে যেত এবং অপরাধীর মৃত্যু হত।

৭। করাত কল মৃত্যুদন্ড:


করাত, করাত কল, saw. sawing, brutal, capital punishment
করাত কল মৃত্যুদন্ড (ছবি সূত্র: www.historyrundown.com)

এই পদ্ধতিতে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয়। এই পদ্ধতিতে অপরাধীকে উল্টো করে ঝুলিয়ে দুইপায়ের ফাকা অর্থাৎ মলদ্বার দিয়ে ধারালো করাত চালনা করা হত। করাত দিয়ে যতক্ষন না অপরাধীর দেহ দুইভাবে ভাগ হত ততক্ষন কাটা হত। আর পুরো সময় ধরে অপরাধী চিৎকার করত। মাথা নিচের দিকে থাকার ফলে রক্তের প্রবাহ মাথায় খুব ভালভাবে থাকত যার ফলে অপরাধী জ্ঞান হারাতো না, যার ফলাফল স্বরূপ মৃত্যুর আগে এক ভয়ংকর কষ্ট ভোগ করত। মিশরীয়রা এই পদ্ধতি শুরু করেছিল যেটি ১৮২০-৩০ সাল পর্যন্ত ইউরোপের বিভিন্ন জায়গায় প্রচলিত ছিল।

৮। ফুটন্ত তরল পদার্থ মৃত্যুদন্ড:


ফুটন্ত, তরল, মৃত্যুদন্ড, boiling, water, oil
ফুটন্ত তরল পদার্থে মৃত্যুদন্ড (ছবি সূত্র: www.en.wikipedia.org)

এই পদ্ধতিতে কোন প্রকার রক্তপাত হত না, যার জন্য এই পদ্ধতি তেমন একটা জনপ্রিয়তা পায়নি। মূলত এশিয়া এবং ইউরোপের কিছু কিছু যায়গায় এই ফুটন্ত তরল পদ্ধতির প্রয়োগ করা হত। এই পদ্ধতিতে অপরাধীকে ফুটন্ত পানি বা তেল এর মধ্যে নিক্ষেপ করে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করাই ছিল নিয়ম।

৯। দ্যা র‌্যাক মৃত্যুদন্ড:


দ্যা র‌্যাক, মৃত্যুদন্ড, rack, brutal, capital punishment
দ্যা র‌্যাক মৃত্যুদন্ড (ছবি সূত্র: www.commons.wikimedia.org)

এই পদ্ধতিতে অপরাধীকে একটি আয়তাকার ফ্রেমের তৈরী যন্ত্রে শোয়ান হত। এরপর চার হাত পা লম্বা-লম্বি করে বেধে ফেলে পুলি ও লিভারের সাহায্যে আস্তে আস্তে টান প্রয়োগ চলত। ধীরে ধীরে হাত পায়ের টান এতটাই বেড়ে যেত যে এক এক করে হাত-পা ছিড়ে শরীরর থেকে আলাদা হয়ে যেত। এভাবে তীব্র কষ্টের মাধ্যমে অপরাধীর জীবনাবসান ঘটত। অবাক করার মত বিষয় হল এই অমানবিক পদ্ধতিটি আঠারশ শতকের আগে পর্যন্ত রাশিয়া এবং গ্রেট ব্রিটেনে প্রয়োগ করা হত।

১০। পোড়ানো:


পোড়ানো, মৃত্যুদন্ড, burning, capital punishment
পোড়ানো মৃত্যুদন্ড (ছবি সূত্র: www.anibundel.com)

মধ্যযুগে এই পদ্ধতিটি খুবই প্রচলিত ছিল। এমনকি ১৯৫০-৬০ সালের সময়ে আফ্রিকাতে বড় কোন মব বা বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রনের জন্য মানুষের গায়ে আগুন দিয়ে পোড়ান হত। যদিও মধ্যযুগে এটি ছিল ভিন্ন ধরনের। মধ্যযুগে এই পদ্ধতিতে অপরাধীকে একটি উচু কাঠের ফ্রেমে বেধে নিচে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হত। এতে করে আস্তে আস্তে অপরাধীর গায়ে আগুন ধরে পুড়ে মারা যেত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here