যখন একটা সংক্রামক রোগ বিশাল একটি জনগোষ্ঠির মধ্যে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে তখন তাকে মহামারী বা এপিডেমিক বলে। আর যখন এই মহামারী নির্দিষ্ট একটা জনগোষ্ঠি বা দেশকে ছাড়িয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে তখন তাকে প্যানডেমিক বলে। মানব ইতিহাস ঘাটলে মহামারী খুব একটা নতুন নয়। যুগে যুগে মহামারীতে মারা গেছে অনেক মানুষ। কখনও কখনও মহামারী এতটাই প্রকট আকার ধারণ করেছিল যে পুরো একটা সভ্যতারই সমাপ্তি ঘটেছিল। ইতিহাস ঘাটলে প্রায় অর্ধশতাধিক মহামারীর কথা জানা যাায়। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ১০টি বিধ্বংসী মহামারী নিয়ে আজকের এই প্রবন্ধ।


১। প্রাগৈতিহাসিক মহামারী: সার্কা (সময়কাল ৩০০০ খ্রিস্টপূর্ব)

চীনে কঙ্কালভর্তি একটি ৫,০০০ বছরের পুরনো বাড়ি আবিষ্কার একটি যা মারাত্মক একটি মহামারীর প্রমাণ (ছবি: চীনা আর্কিওলজি বিভাগের সৌজন্যে)

আজ থেকে প্রায় ৫০০০ বছর আগে উত্তর- পূর্ব চীনের এক প্রাগৈতিহাসিক গ্রাম থেকে এই মহামারীর উদ্ভব হয়েছিল। এত দ্রæত এই মহামারীর বিস্তার ঘটেছিল যে তখনকার সময়ে লাশ দাফনের কোন সময়ই ছিল না। গ্রামের সব লাশগুলিকে একসাথে একটি ঘরের মধ্যে রেখে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। ঐ ঘরের মধ্যে সব বয়সের লোককে একসাথে পোড়ানো হয়েছিল। বর্তমানে ঐ গ্রাম এখন চীনের অন্যতম সেরা একটি প্রাগৈতিহাসিক দর্শনীয় প্রতœতাত্তি¡ক যায়গা। বর্তমান সময়ে যেটা ”হামিন মঙ্গা” নামে পরিচিত। ঐ মহামারীর পর আর কখনও হামিন মঙ্গাতে লোকালয় গড়ে ওঠেনি। উত্তর- পূর্ব চীনের আর একটি প্রতœতাত্তি¡ক জায়গা হলো মিয়াওজিগৌ। এই মিয়াওজিগৌ তেও হামিন মঙ্গার সমসাময়িক সময়কার গণ সমাধি পাওয়া গেছে। যেটা একটা মহামারীর সংকটকেই প্রমাণ করে যেটা চীনের একটা পুরো অঞ্চলের লোকালয়কে শেষ করে দিয়েছিল।


২। দ্য প্লেগ অব এথেন্স: (সময়কাল ৪৩০ খ্রিস্টপূর্ব)

পার্থেননের অবশিষ্টাংশ, অ্যাথেন্সের এক্রপোলিসের একটি বিল্ডিং। শহরটি খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৪৩০ এ একটি পাঁচ বছরের মহামারিতে আক্রান্ত হয়েছিল (ছবি: শাটারস্টক সৌজন্যে)

তখন গ্রিক ও স্পার্টানদের মধ্যে যুদ্ধ চলছে। গ্রিকদের তখন বিপর্যস্ত অবস্থা। একের পর এক যুদ্ধে স্পার্টানদের কাছে হেরে যাচ্ছিল গ্রিকরা। এমনই সময়ে শুরু হয় মহামারী। যে মহামারী প্রায় পাঁচ বছর পর্যন্ত চলেছিল। যদিও মৃতের সংখ্যা নিয়ে আছে বিশাল মতভেদ তারপরও মনে করা হয় যে প্রায় ১০,০০,০০০ (দশ লক্ষ) লোক এই মহামারীতে মারা যায়। এমনকি এই মহামারী আসলেই কি প্লেগ এর কারনে হয়েছিল কিনা তা নিয়েও ইতিহাসবিদগন একমত হতে পারেন নি। টাইফয়েড, টাইফাস জ্বর, গুটি বসন্ত বা অ্যানথ্রাক্স এর মত রোগের কারনে এই মহামারী হতে পারে বলেও অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন। তবে এথেন্সের প্রাচীন এই মহামারী সর্ম্পকে আমরা যা কিছু জানি তা সবই আসলে গ্রিক ইতিহাসবিদ খুসিডাইডস এর রচিত যা ১৯১৪ সালে রিচার্ড ক্রোলি কর্তৃক অনুদিত এবং লন্ডন ডেন্ট থেকে প্রকাশিত গ্রন্থ হিস্ট্রি অব দ্য পেলোপনেসিয়ান ওয়্যার এর থেকে পাওয়া। খুসিডাইডস এই প্লেগ মহামারী নিজের চোখে দেখেছিলেন। খুসিডাইডস লিখেছিছেন যে, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী লোকজন হঠাৎ করেই প্রচন্ড জ্বরে আক্রান্ত হত এবং সেইসাথে চোখ লাল হয়ে যেত, গলা বা আভ্যন্তরীন অঙ্গে প্রদাহ হত এবং অবশেষে খিচুনী হয়ে মারা যেত।


৩। অ্যান্টোনাইন প্লেগ: (সময়কাল ১৬৫- ১৮০ খ্রিস্টাব্দ)

রোমান সৈন্যরা সম্ভবত অ্যান্টোনাইন প্লেগ এর সাথে সাথে গুটিবসস্তও সাথে করে নিয়ে এসেছিল (ছবি: শাটারস্টক সৌজন্যে)

ম্যানচেস্টার মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের রোমান ইতিহাসের সিনিয়র প্রভাষক এপ্রিল পুডসের মতে অ্যান্টোনাইন প্লেগ আসলে ছিল গুটি বসন্ত যা রোমান সেনাবাহিনীকেই নষ্ট করে দিয়েছিল এবং পুরো রোমের প্রায় ৫০,০০,০০০ (পঞ্চাশ লক্ষ) মানুষ এই মহামারীতে মারা যায়। অন্যদিকে অনেক ইতিহাসবিদ বিশ্বাস করেন যে পার্থিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধের পর রোমান সেনাবাহিনী যখন রোমে ফিরেছিল তখন এই মহামারী তাদের সাথে চলে এসেছিল। যে মহামারী পুরো রোম সাম্রাজ্যের সমাপ্তির সূচনা করেছিল। ১৮০ খ্রীষ্টাব্দে রোম যখন সারা পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল তখনই এই মহামারীতে পুরো রোমান সাম্রাজ্য জুড়ে অস্থিরতা শুরু হয়। একদিকে মহামারী অন্যদিকে বর্বর গোষ্ঠীগুলো দ্বারা আক্রমন এবং গৃহযুদ্ধের ফলে রোমান সাম্রাজ্য খুব দ্রুত ধ্বংস হয়ে যায়। এখানে বলে রাখা ভাল যে, প্লেগ সংগঠিত হওয়ার পরে খ্রিষ্টধর্ম ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।


৪। সাইপ্রিয়ানের প্লেগ: (সময়কাল ২৫০-২৭১ খ্রিস্টাব্দ)

মিশরের থিবস শহরে পাওয়া মানুষের কংকাল যেগুলো মহামারীর কারনে অগ্নিসংযোগের শিকার হয়েছিল (ছবি: N.Cijan/Associazione Culturale per lo Studio dell’Egitto e del Sudan ONLUS সৌজন্যে)

কার্থেজ (বর্তমানে তিউনিসিয়ার একটি শহর) এর এক বিশপ, সেন্ট সাইপ্রিয়ান নামে পরিচিত যিনি এই মহামারীটিকে পৃথিবীর শেষ হিসাবে বর্ননা করেছিলেন। সাইপ্রিয়ান অনুমান করেছিলেন যে রোমে কেবল একদিনে প্রায় ৫০০০ মানুষ মারা গিয়েছিল। ২০১৪ সালে, আর্কিওলজিস্টরা লুক্সরে একটি সমাধিস্থল খুজে পান যেখানে ঐ সময়ে প্লেগ এ আক্রান্তদের সমাধিস্থ করা হয়েছিল। ঐ সমাধিক্ষেত্রের সবগুলো দেহই পুরু চুনের স্তুর দিয়ে ঢাকা ছিল। কারন ঐতিহাসিকভাবে চুন একটি জীনানুনাশক হিসাবে ব্যবহৃত পদার্থ। ঐ সমাধিক্ষেত্রের পাশে আর্কিওলজিস্টরা চুন তৈরীতে ব্যবহৃত তিনটি জায়গা এবং প্লেগ আক্রান্ত অনেক লোকের আগুনে পোড়া দেহাবশেষ পাওয়া গিয়েছিল। ধারনা করা হয় যে এত মানুষ একসাথে মারা গিয়েছিল যে, তাদের দেহগুলোকে চুন দিয়ে আস্তরন করে সমাধিস্ত করার মত সময় ছিল না। ফলে আগুন দ্বারা পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। যদিও অনেক মানুষের মৃত্যুর কারণ ছিল এই মহামারী তারপরও বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত নন যে আসলে কোন রোগটি এই মহামারী সৃষ্টি করেছিল। কারন সাইপ্রিয়ানের রচিত ল্যাটিন ভাষার গ্রস্থ দ্যা ডি মরটালিটেটি এর ফিলিপ শ্যাফের ইংরেজী অনুবাদ দ্যা ফাদার অব থার্ড সেন্চুরি যেটি খ্রিষ্টান ক্লাসিকস্ ইথেরিয়াল লাইব্রেরী থেকে ১১৮৫ সালে পাওয়া গিয়েছিল, সেই গ্রন্থে সাইপ্রিয়ান লিখেছেন যে, মানুষগুলোর অনবরত পায়খানা হত এবং তরল নির্গত হত সেই সাথে হাড় থেকে মুখগহব্বর পর্যন্ত আগুনের মত জ্বলুনি শুরু হত। তারপর অবশেষে তারা মারা যেত।


৫। দ্যা প্লেগ অব জাস্টিনিয়ান: (সময়কাল ৫৪১-৫৪২ খ্রিস্টাব্দ)

মানচিত্রে দেখানো এই বিশাল অংশে ছড়িয়ে পড়েছিল প্লেগ অব জাস্টিনিয়ান (ছবি: infograph.venngage.com সৌজন্যে)

বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যটি বুবোনিক প্লেগ দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল যেটি পরবর্তীতে পুরো সাম্রাজ্যের ধ্বংসের কারন হয়ে দাড়ায়। ধারনা করা হয় যে তখনকার সময়ে বিশ্ব জনসংখ্যার ১০% পর্যন্ত মানুষ এই মহামারীতে মারা গিয়েছিল। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অন্যতম শক্তিশালী এবং প্রভাবশালী সম্রাট জাস্টিনিয়ান, যার নামানুসারে এই মহামারীর নামকরন করা হয়েছে, তিনি রোমান সাম্রাজ্যের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার জন্য যেসব অভিযান চালিয়েছিলেন, সেগুলোর জন্য ইতিহাস তিনি অবিস্মরনীয় হয়ে থাববেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল সম্রাট জাস্টিনিয়ানের নাম যতটা না তার অভিযানের জন্য স্মরণ করা হয় তার চেয়ে বেশী স্মরণ করা হয় তার শাসনামলে ঘটে যাওয়া ঐ ভয়াবহ মহামারীর জন্য। ৫৪০ খ্রিস্টাব্দের দিকে মিশরে এক ভয়ানক প্লেগের উৎপত্তি ঘটে। তারপর মিশরের এই রোগ বৃহৎ পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করেছিল ইদুর। সেইসময়ে মিশর ছিল সমগ্র ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের খাদ্য যোগানদার। ফলে এখানকার যেকোন রোগ সহজেই চারদিকে ছড়িয়ে গিয়েছিল। দূর্ভাগ্যজনকভাবে মহামারীর প্রথম আক্রমনটা ছিল বাইজেন্টাইন রাজধানী কনস্টান্টিপলে (বর্তমান ইস্তাম্বুল)। কিছু কিছু ইতিহাসবিদের মতে এই মহামারীতে প্রতিদিন গড়ে ৫০০০ মানুষ মারা যেত। সম্রাট জাস্টিনিয়ানও এই মহামারীতে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন কিন্তু ভাগ্যক্রমে তিনি সেযাত্রায় বেঁচে গিয়েছিলেন। তবে দুঃখজনকভাবে এই মহামারী আঘাত হানার পরে সম্রাট জাস্টিনিয়ান ধীরে ধীরে তার সাম্রাজ্য হারাতে থাকেন।


৬। দ্য ব্ল্যাক ডেথ: (সময়কাল ১৩৪৬-১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দ)

লিবার ক্রোনারিয়াম থেকে প্রাপ্ত দ্য ব্ল্যাক ডেথ কেন্দ্রিক চিত্রকর্ম যেটির নাম 1. CCLXIIII; Skeletons are rising from the dead for the dance of death. (ছবি: আন্তন কবার্গার, ১৪৯৩/ পাবলিক ডোমেইন সৌজন্যে)

ধারনা করা হয় দ্য ব্ল্যাক ডেথ এশিয়া থেকে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং এর প্রভাবে যে মহামারী হয়েছিল এরকম মহামারী পৃথিবীর ইতিহাসে আ ঘটেনি। কৃষ্ণ সাগরের উপকূলবর্তী অঞ্চলে এই মহামারী ছড়িয়ে পড়েছিল বলে একে ব্ল্যাক ডেথ বলা হয়। ধারনা করা হয় এই মহামারী ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস ব্যাকটেরিয়ার কারণে ঘটেছিল। যা এখনকার সময়ে বিলুপ্ত।
ব্ল্যাক ডেথে আসলে কি কারণে মহামারী সংগঠিত হয়েছিল সে সম্পর্কে ইতিহাসবিদদের মধ্যে আছে মত বিভেদ। একদল মনে করেন যে গ্রন্থি প্রদাহ জনিত প্লেগ এর কারনে এই মহামারী হয়েছিল অন্যদিকে আরেকদল মনে যে এই ভয়ানক মহামারী হয়েছিল ইবোলা ভাইরাসের কারনে। ১৩৪৭- ১৩৫১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ছিল এই মহামারীরর সবচেয়ে বিধ্বংসী সময়। এই মহামারীতে ইউরোপের প্রায় তিন ভাগের দুই ভাগ মানুষ মারা গিয়েছিল। মহামারীটি ইউরোপের জীবনযাত্রার গতি অনেকখানি বদলে দিয়েছিল। তখনকার সময়ে মহামারীরর জন্য কাজের জন্য শ্রমিক পাওয়া যেত না। যে সব শ্রমিক বেঁচে ছিল তাদের মজুরী ছিল অনেক বেশী। আর এই শ্রমিক সল্পতার জন্য ইউরোপের প্রযুক্তিগত উন্নতির গোড়াপত্তন হয়। তবে এই অভিশপ্ত মহামারীর প্রভার টিকে ছিল প্রায় ২০০ বছরের মত। এই দীর্ঘ সময়ে ব্ল্যাক ডেথের কারনে প্রায় ১০ কোটি মানুষ প্রান হারিয়েছিল বলে মনে করা হয়।


৭। গ্রেট প্লেগ অব লন্ডন: (সময়কাল ১৬৬৫- ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দ)

১৬৬৬ লন্ডনের গ্রেট ফায়ার এর একটি মডেল পুনর্র্নিমান করে সেই সময়ের আগুনের ভয়াবহতা নিরীক্ষন করা হয় (ছবি: শাটারস্টক সৌজন্যে)

ব্ল্যাক ডেথের পর বড় আকারের মহামারী যেটি লন্ডনে সংগঠিত হয় যার কারনে লন্ডনে একটি বড় পরিবর্তন ঘটে। এই মহামারীর সময়ে লন্ডনের নেতৃত্বে ছিলেন দ্বিতীয় রাজা চার্লস। ১৬৬৫ সালের এপ্রিল মাসে এই মহামারী শুরু হয় এবং গরম থাকার কারনে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। প্লেগ এর জন্য দায়ী স্যান্ড ফ্লাই বা বিশেষ এক ধরনের মাছি। এই মহামারীতে লন্ডনের প্রায় ১৫% বা ১,০০,০০০ (এক লক্ষ) লোক মারা গিয়েছিল। দুঃজনক হলেও সত্য যে এই মহামারী চলাকালে ১৬৬৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে লন্ডনে আগুন লেগে যায়, যা ইতিহাসে গ্রেট ফায়ার অব লন্ডন নামে পরিচিত। এ আগুন এত ভয়ংকর রূপ নিয়েছিল যে চারদিন পর্যন্ত টানা জ্বলেছিল এবং লন্ডন শহরের বড় একটি অংশ ধ্বংস করে ফেলেছিল।


৮। স্প্যানিশ ফ্লু: (সময়কাল ১৯১৮-১৯২০ খ্রিস্টাব্দ)

ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারী চলাকালীন জরুরি হাসপাতাল, ক্যানসাস ক্যাম্প ফানস্টন। (ছবি: ঐতিহাসিক ওটিস আর্কাইভ, জাতীয় স্বাস্থ্য ও মেডিসিন যাদুঘর)

স্প্যানিশ ফ্লু নাম সত্তেও কিন্তু এই মহামারীর উদ্ভব স্পেনে হয়নি। প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের সময় স্পেন ছিল নিরপেক্ষ দেশ। তাই স্পেন এর পত্রিকাগুলোতে সেন্সরসিপ এর মাধ্যমে খবর বাদ দেওয়া হত না। ফলে এই ফ্লু সম্পর্কে বিশদ খবর স্পেন এর পত্রিকাগুলো ছাপাত। এতে করে মানুষ এই মহামারীকে স্প্যানিশ ফ্লু নামে ডাকতে থাকে। আসলে এটি ছিল একটি ফ্লু প্যানডেমিক বা ফ্লু মহামারী। এই মহামারী দক্ষিন সমুদ্র থেকে শুরু করে উত্তর মেরু পর্যন্ত আনুমানিক ৫০০ মিলিয়ন লোককে আক্রান্ত করেছিল। যার মধ্যে প্রায় ১০০ মিলিয়ন লোকই মারা গিয়েছিল। কিছু আদিবাসী সম্প্রদায় তো বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। মূলতঃ প্রথম বিশ্ব যুদ্ধ চলাকালীন পুষ্টিহীনতার জন্য এই ফ্লু এত প্রাণঘাতী হয়েছিল।


৯। এশিয়ান এভিয়ান ফ্লু: (সময়কাল ১৯৫৭- ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দ)

মুরগিগুলো এভিয়ান ফ্লুতে আক্রান্ত কিনা তা পরীক্ষা করা হচ্ছে। ১৯৫০ এর দশকের শেষদিকে এভিয়ান ফ্লুতে প্রায় এক মিলিয়ন মানুষ মারা গিয়েছিল। (ছবি: শাটারস্টক সৌজন্যে)

স্প্যানিশ ফ্লু এর পর এশিয়ান এভিয়ান ফ্লু ছিল ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারীর আর একটি আক্রমন। এই মহামারীটি মূলতঃ এভিস বা পাখি জাতীয় প্রাণী দ্বারা ছড়াত। সর্বপ্রথম চীন থেকে এই মহামারীটির উদ্ভব হয়। ধারনা করা হয় প্রায় ১০,০০,০০০ (দশ লক্ষ) মানুষ এই মহামারীটির দরুন প্রাণবায়ু ত্যাগ করেছিল। এই মহামারীটি খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল। ১৯৫৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে সিঙ্গাপুরে এশিয়ান এভিয়ান ফ্লু মহামারী তান্ডব চালায়। তারপর এই বছর এপ্রিল মাসে হংকং এ তান্ডব চালিয়েছিল মহামারীটি। তারপর সোজা আমেরিকার উপকূলীয় অঞ্চলে তান্ড চালায় এই মহামারী। বিশ্বব্যাপী প্রায় ১.১ মিলিয়ন আর শুধু আমেরিকায় প্রায় দেড় লক্ষাধিক প্রাণহানী ঘটায় এই এভিয়ান ফ্লু।


১০। H1N1 সোয়াইন ফ্লু: (সময়কাল ২০০৯-২০১০ খ্রিস্টাব্দ)

ক্যালিফোর্নিয়ার এন্টিওকের সুটার ডেল্টা মেডিকেল সেন্টারে জরুরি কক্ষের বাইরে স্থাপন করা একটি ট্রিজেট তাবু ধরে একজন নার্সের হাটার দৃশ্য যখন কিনা সবাই সোয়াইন ফ্লুতে আক্রান্ত প্রচুর রোগীকে সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন (ছবি: জাস্টিন সুলিভান/ গেটি ইমেজ)

শুকর থেকে এই মহামারী রোগটি ছড়িয়েছে বলে একে সোয়াইন ফ্লু নামে ডাকা হয়। অন্যদিকে বৈজ্ঞানিকভাবে H1N1 ভাইরাস স্ট্রেন দ্বারা এই রোগ হয়ে থাকে। এই মহামারীর কারনে সারা বিশ্বে প্রায় ছয় লক্ষাধিক মানুষ মারা গিয়েছিল। অন্য ফ্লু থেকে এই সোয়াইন ফ্লু ছিল ব্যতিক্রম। অন্য ফ্লু গুলোতে বয়স্কলোকরা বেশি মারা গিয়েছিল। কিন্ত এই ফ্লু মহামারীতে ৮০% মারা যাওয়া মানুষের বয়স ছিল ৬৫ বছরের নিচে। ধারনা করা হয় বয়স্কদের আগে থেকেই এই ফ্লু প্রতিরোধী ক্ষমতা ছিল যেটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অর্জিত হয়েছিল। পরবর্তীতে অবশ্য এই ফ্লু এর ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়েছিল। যেটির কারনে আজ এই মহামারী রোগটি এখন সামান্য বাৎসরিক ফ্লু মাত্র।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here