লিখেছেনঃ অনিমেষ


রোমকে ঘিরে রহস্যের পাতা বুনেছে হাজারো রহস্যের মায়াজাল। প্রাচীন রোমে অসংখ্য মানুষ ছিল প্যাগান ধর্মানুসারী আর তাদের ছিল হাজারো অদ্ভুত প্রথা তার মধ্যে একটি ছিল দেবী ভেস্টা এর ভেস্টাল ভার্জিনদের দ্বারা পূঁজা।
দেবী ভেস্টার মন্দির/সূত্র: commons.wikimedia.org

ভেস্টা কিসের দেবী ছিলেন


রোমান পুরান অনুসারে কুমারী ভেস্টা ছিলেন পরিবারের সুখ-সমৃদ্ধি ও উনুনের দেবী। দেবী ভেস্টা দানব টাইটানস এবং রিয়ার প্রথম কন্যা সন্তান। তার ভাই জুপিটার(বৃহস্পতি) পরবর্তীতে দেবতাদের প্রধান হয়েছিলেন। অপরূপ সুন্দর হওয়ায় বহু পুরুষ দেবতারা দেবী ভেস্টার প্রতি আকর্ষিত ছিলেন। আ্যপোলো এবং নেপচুন উভয়ই তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন কিন্তু তিনি উভয় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং তার ভাই জুপিটারের(বৃহস্পতি) কাছে বর(প্রার্থনা) চেয়েছিলেন যেন তাকে চির কুমারী হিসেবে থাকার অনুমতি দেন।
দেবী ভেস্টা/সূত্র: commons.wikimedia.org
ভেস্টা বরপ্রাপ্ত(প্রার্থনা মঞ্জুর) হয়েছিল এবং পরবর্তীতে তিনি ঘরবাড়ি, পরিবারের শান্তি ও উনুনের দেবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। সেই সময় দেবী ভেস্টকে রোমের প্রতিটি বাড়িতেই পূঁজা করা হত। খ্রিস্ট ধর্ম চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত ভেস্টাই ছিল তাদের প্রধান দেবী। জুন মাসের ৭-১৫ তারিখ পর্যন্ত দেবীর ভক্তরা পায়ে হেটে তার মন্দির রোমান ফোরামে যেতেন পূঁজা করার জন্যে।

ভেস্টাল ভার্জিন(কুমারী) কি এবং কারা


সম্রাট অগাস্টাস তার আত্নজীবনি ‘দ্য ডিডস অব দ্য ডিভাইন অগাস্টাস’ এ বলেন সেই সময় রোমে ৪ টি ক্ষমতাশীল যাজক সম্প্রদায় ছিল- পন্টিফিসিস, অগারস, কুইণ্ডেসিমিভরি, সেপ্টেমিভ্রি। কিন্তু এছাড়াও সেই সময় একটি রোমান ধর্মীয় কলেজ ছিল যেখানে পুরুষদের প্রবেশ ছিল নিষিদ্ধ। এই কলেজটি ছিল ভেস্টালস(কুমারী) দের, যারা ভেস্টাল ভার্জিন(কুমারী) নামে পরিচিত। এই কলেজের দায়িত্বে ছিল কেবলমাত্র মহিলারা।
ভেস্টাল কলেজ/সুত্রঃ commons.wikimedia.org
ভেস্টাল ভার্জিনরা হলো দেবী ভেস্টার পূজারী এবং তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল দেবী ভেস্টার মন্দির রোমান ফোরাম এর ভিতরে পবিত্র জ্বলন্ত অগ্নি রক্ষনাবেক্ষন করা।
রোমান লেখকদের মতে ভেস্টালসদের কলেজ রোমের দ্বিতীয় রাজা নুমা পম্পিলিয়াস প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যিনি ৭১৫ থেকে ৬৭৩ বি.সি পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন। দেবী ভেস্টার উপাসনা ভেস্টাল ভার্জিনদের(কুমারী) দ্বারা পরিচালিত হত। এই অগ্নি দেবী ভেস্টার কাছে ছিল অনেক পবিত্র। নুমার রাজত্বকালে মাত্র দুইজন ভেস্টাল ভার্জিন(কুমারী) ছিল গেগনিয়া ও ভারেনিয়া।
ভেস্টাল ভার্জিন(কুমারী) /সুত্রঃ commons.wikimedia.org
নুমা দেবতাদের অসীম ক্ষমতায় বিস্বাস রাখতেন। তিনি বিস্বাস করতেন ভেস্টার মন্দিরের পবিত্র আগুন যতদিন জ্বলবে রোম ততদিন অক্ষয় থাকবে তাই এই ভেস্টাল ভার্জিনদের(কুমারী) তিনি সুরক্ষার প্রতীক মনে করতেন। নুমা এই আগুন রক্ষাকারীদের কুমারীত্ব বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন কারণ এই আগুন পরিচর্যাকারীদের হতে হতো শুদ্ধ, নিখুঁত ও পবিত্র।
রাজা টুলিয়াসের রাজত্বকালে চারজন ভেস্টাল ভার্জিন(কুমারী) ছিল। কিছুদিন পরে আর দুইজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল ফলে তাদের সংখ্যা দাঁড়ায় ছয়জন এবং পরবর্তীতে এই প্রথার বিলুপ্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত ছয়জন করেই ভেস্টাল ভার্জিন(কুমারী) নিয়োগ দেওয়া হত।
ভেস্টাল ভার্জিনস(কুমারীগণ)/সুত্রঃ commons.wikimedia.org
ভেস্টাল ভার্জিনদের চাকরির সময়কাল ছিল ৩০ বছর। প্যাট্রিশিয়ান পরিবারের ৬ থেকে ১০ বছরের কন্যা শিশুদের ভেস্টাল ভার্জিন(কুমারী) হিসেবে নেওয়া হত। প্রথম দশ বছর তাদের পূঁজার নিয়ম নীতি ও তাদের দায়িত্ব শিখানো হত। পরের দশ বছর তারা পুরোপুরি ভেস্টাল ভার্জিন(কুমারী) হিসেবে নিয়োজিত থাকতো। চাকরির শেষ দশ বছর তারা নবাগতদের প্রশিক্ষণে নিয়োজিত থাকতো। এই সময়কালে তাদের কোনো প্রকার সম্পর্কে লিপ্ত হওয়ার অনুমতি ছিল না। চাকরির ৩০ বছর শেষ হলে তাদেরকে তাদের দায়িত্ব থেকে মুক্তি দেওয়া হত এবং অনুমতি পেত ব্যাক্তিগত জীবনে যা ইচ্ছা করার।
সেই সময় পুরুষের জন্য কোনো প্রাক্তন ভেস্টাল ভার্জিনকে(কুমারী) বিয়ে করা অনেক সৌভাগ্যের মনে করা হত। তবে ভেস্টাল ভার্জিনদের(কুমারী) দৃষ্টিকোণ থেকে বিবাহকে দুর্ভাগ্য বলেই মনে করা হত এইজন্য তারা অনেকেই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতেন না।

তাদের দায়িত্ব ও সুযোগসুবিধা


পবিত্র আগুন সংরক্ষণ করাই ভেস্টাল ভার্জিনদের প্রধান দায়িত্ব হলেও তাদের অন্যান্য কাজও ছিল। তার মধ্যে একটি হলো মোলার সালসা নামক এক প্রকার লবনাক্ত ময়দা প্রস্তুত করা যা ভক্তরা ব্যবহার করত বলিদান দেওয়ার সময়।
দেবী ভেস্টার প্রতি উৎসর্গ/সুত্রঃ commons.wikimedia.org
এছাড়াও তারা উইলের রক্ষক ছিলেন এবং অসংখ্য অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন। জুনে ভেস্টালিয়া উৎসব উদযাপন করা হত এবং মন্দিরের প্রধান অংশ খুলে দেওয়া হতো সাধারণ মহিলাদের উদ্দেশ্যে। সাধারণত সব সময় মন্দিরের প্রধান অংশে ঢুকার অনুমতি শুধুমাত্র ভেস্টাল ভার্জিনদেরই থাকত। অনুষ্ঠান শেষে মন্দির পরিষ্কার করাও তাদের কাজের অংশ ছিল।
ভেস্টাল ভার্জিনদের পূজা/সুত্রঃ commons.wikimedia.org
রোমান লেখক প্লুটার্ক বলেন,
‘তারা অনেক পবিত্র রহস্যের রক্ষক ছিল যা তারা খারাপ শক্তির হাত থেকে রক্ষা করতো।’
ভেস্টাল ভার্জিনরা অনেক সুযোগ সুবিধা ভোগ করতো তারা পুরুষ প্রধান সমাজে থেকেও তাদের কোনো পুরুষের অধীনে থাকতে হতো না। তারা নিজের সম্পত্তীর দেখাশোনা তারা নিজেই করতেন এবং রাষ্টের আইনি সহযোগিতার জন্য তাদের কোর্টে যাওয়ার অনুমতিও ছিল। সেই সময় নারী হিসেবে তাদের গাড়ি চালানোর অনুমতি ছিল এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাদের জন্য সংরক্ষিত থাকতো প্রথম সারির আসন।

ভেস্টাল ভার্জিন প্রথা ভঙ্গের শাস্তি ও এই প্রথার বিলুপ্তি


ভেস্টাল ভার্জিনদের যতই ক্ষমতা ও সুযোগ সুবিধা দেওয়া হোক আসলে তারা বাস করতো পুরুষতান্ত্রিক সমাজেই, এটি তাদের শাস্তির বিবরণ জানলেই বুঝা যায়। তাদের নাম শুনলেই বুঝা যায় কুমারীত্ব ছিল তাদের পরিচয়ের প্রধান অংশ। রোমে সেই সময় বিবাহ বহির্ভুত যৌন মিলন কমাতে যারা এতে লিপ্ত হত তাদের ধন সম্পদ কেরে নেওয়া হত। ভেস্টাল ভার্জিনদের ক্ষেত্রে ছিল এই আইন আলাদা ছিল কারণ এটি তাদের জন্য সবচেয়ে বড় অপরাধ। তাদেরকে মূলত রাষ্ট্রের সম্পদ বলে বিবেচনা করা হত এবং তাদের যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হওয়া ছিল বিস্বাসঘাতকতার মত।
যৌন অপরাধের আসল শাস্তি ছিল অপরাধীকে বেত্রাঘাত বা পাথর ছুঁড়ে মেরে মেরে হত্যা করা তবে রোমের পঞ্চম রাজা তারকিনিয়াস প্রিসকাস এক নির্মম শাস্তির প্রচলন করেন কারণ কোন ভেস্টাল ভার্জিনকে রক্তপাত করে মারা নিওম বহির্ভুত ছিল। মার্সিয়া নামে একজন ভেস্টাল ভার্জিন ছিলেন তিনি যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত হন এইজন্য তাকে ১১৪ বি.সি তে একটি অন্ধকূপে জীবন্ত অবস্থায় পুঁতে দেওয়া হয় যেন সে অনাহারে মারা যায় এবং মৃতুটি প্রাকৃতিক ভাবে হয়।
ভেস্টাল কর্নেলিয়া অন্ধকূপে বন্দি অবস্থায়/সুত্রঃ commons.wikimedia.org
সেই সময় রোম যেকোনো সমস্যাই পড়লে সেটার কারণ হিসেবে সবাই মানত যে ভেস্টাল ভার্জিনদের দ্বারা কোনো ভুল হয়েছে বা তারা মন্দিরের পবিত্র আগুন সংরক্ষণ করতে না পারা। রোমের সামরিক বাহিনী যখন যুদ্ধে পরাজিত হয় তখন সবাই ভেস্টাল ভার্জিনদের দোষারোপ করেছিলেন, অনেকে ভেবেছিলেন ভেস্টাল ভার্জিনরা তাদের কুমারীত্ব হারানোর ফলে দেবী ভেস্টা অসন্তোষ হয়েছে তাই তারা যুদ্ধে হেরেছেন। এইসব কারণে অনেক ভেস্টাল ভার্জিনদের পেতে হয়েছে নির্মম শাস্তি।
তবে অদ্ভুত এই প্রথা খ্রিস্টান ধর্ম আসার পর থেকে বিলুপ্ত হওয়া শুরু হয়েছিল। থিওডোসিয়াস এর রাজত্বকালে কোয়েলিয়া কনকর্ডিয়া নামে একজন সর্বশেষ ভেস্টাল এর নাম জানা যায়। থিওডোসিয়াস ছিলেন খ্রিস্টান ধর্ম প্রচারক। ৩৯৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি ভেস্টালস দের কলেজ বন্ধ করে দেন এবং মন্দিরের ভিতর প্রজ্জলিত সেই পবিত্র আগুন ও নিভিয়ে দেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here