লেখক: সাদমান ইসলাম (তমি)

এই লেখাটি সম্পূর্ণ আমার ব্যক্তিগত অভিমত, এইখানে দ্বিমত থাকাটাই স্বাভাবিক।

প্রথমত বলি, গল্প নির্ভর বা কাহিনী সিনেমা বলতে আমরা কি বুঝি, আমার মতে, যে সব সিনেমার কাহিনী অনেক শক্তিশালী হয়, সিনেমার চরিত্রগুলা কাল্পনিক হলেও বাস্তবে তাদের সাথে দর্শকরা সম্মন্ধ স্থাপন করতে পারে এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বার্তা থাকে। অন্য ভাষায়, যেইসব সিনেমা দর্শকদের কাছে একটা শক্তিশালী বার্তা দেয় কিন্তু সাথে সাথে সম্পূর্ন “সিনেমেটিক এক্সপেরিয়েন্স” ও দেয় সেইগুলাকে আমরা গল্পনির্ভর সিনেমা বলতে পারি।

এখন আসি বলিউড এর কথায়, বলিউড এর যাত্রা শুরু হয় ১৯৩০ সালে বোম্বাইতে (এখন মুম্বাই) আস্তে আস্তে বৃহদাকার সাম্রাজ্যতে পরিণত হয় বলিউড। সেই শুরু থেকে বলিউড অসাধারণ কিছু সিনেমা দর্শকদের উপহার দিয়েছে যেমন পাকিঝা, কাগাজ কা ফুল, পেয়াসা, গাইড ইত্যাদি কিন্তু এগুলো বলিউডের অনেক পুরাতন ইতিহাস। আমি কথা বলবো ২০০০ সালের পর থেকে অর্থাৎ নতুন মিলেনিয়ামে বলিউডের সিনেমার বিপ্লব নিয়ে, এই সময়ে বলিউডে এমন কিছু সিনেমা আসে যেগুলো বলিউডের সচারাচার সিনেমার ধারায় একটা বড় পরিবর্তন এনেছিল। উদাহরণ হিসাবে ২০০০ সালে মুক্তি পাওয়া কমেডি-ড্রামা ঘরানার হেরাফেরি সিনেমার কথাকে বিবেচনা করতে পারেন। কমেডি সিনেমা মনে হলেও এই সিনেমার গল্পের মূল ছড়িয়ে আছে চিন্তারও অনেক গভীরে। আসলে এই সিনেমাতে দেখান হয়েছে যে মানুষ যখন কোন কিছু নিয়ে মরিয়া হয়ে যায় তখন সে এমন অনেক কিছুই করে যা সে অন্য সময় কখনই করতো না, আর মানুষের এ মরিয়া প্রবৃত্তি বা ডেসপারেটনেস- কেই এই সিনেমায় কমেডির মাধ্যমে খুবই নিপুনভানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। শুধু কিন্ত কমেডি সিনেমাই না ২০০১ সালে মুক্তি পাওয়া আমির খানের দুইটা সুপার হিট সিনেমার কথা তো নিশ্চই মনে আছে। হ্যাঁ ঠিকই অনুমান করেছেন একটি হলো লাগান এবং অন্যটা দিল চাহাতা হেলাগান কিন্তু ছিল পরিয়ডিক স্পোর্টস ড্রামা, যা বলিউড এর ইতিহাসে একদম নতুন সংযোজন ছিল।

আর দিল চাহতা হে সিনেমা তো বন্ধুত্ব আর জটিল প্রেমের এক অসাধারণ মিশ্রন, জটিল প্রেম বলতে আবার লুতুপুতু প্রেম কিন্তু না। এই সিনেমায় জটিল প্রেম বলতে একটু অন্য ধরনের অসম প্রেমের গল্প দেখানো হয়েছে। অসম প্রেম বলছি তার কারন সিনেমাটা তিন বন্ধুর জীবন কাহিনী নিয়ে, যার মধ্যে এক বন্ধু প্রেম করে তার থেকে বড় মাঝবয়সী এক নারীর সাথে, যা বয়সের দিক দিয়ে অসম প্রেম এর অনন্য উদাহরন যেটা বলিউডে আনকোরাই বলা যায়। শুধু তাই না দ্বিতীয় বন্ধু প্রেম করে এমন একজন মেয়ের সাথে যার আগেই এনগেজমেন্ট হয়ে গেছে, এখানেও সেই অসম প্রেম আর বাকি আরেক যে বন্ধু সে তো প্রথম দেখায় নিজেই রিজেক্ট করেছে এমন একটা মেয়ের প্রতি পরবর্তীতে সে নিজেই আস্তে আস্তে দূর্বল হয়ে শেষমেষ প্রেমেই পড়ে যায়। এমন সব অভিনব প্রেমের সমীকরণ বড় পর্দায় দেখানোর জন্য ফারহান আখতারকে স্যালুট আর বলিউড তো চিরঋণী হয়েই থাকবে।

এখন কথা বলব আর এক জিনিয়াস পরিচালকের প্রসংগে যার নাম রাজ কুমার হিরানি, ইনি আমাদের ২০০৩ সালে উপহার দেন মুন্না ভাই MBBS সিনেমা। দর্শক যা যায় তার সবই আছে এই সিনেমাতে। কমেডি, ড্রামা, ইমোশন, সবই আছে। শুধু তাই না পরিপূর্ণ এই সিনেমার মাধ্যমে হিরানি শক্তিশালী বার্তাও দিয়েছেন দর্শকদের আর তা হলো মোটিভেশন এর পজেটিভ ফলাফল। যেকোন মানুষকে হাসতে হাসতে মোটিভেট করার জন্য যথেষ্ট এই সিনেমা। আর এই জন্যই শুরুতেই আমি রাজকুমার হিরানিকে জিনিয়াস বলে সম্বোধন করেছি। এই সময়ে আরো কিছু আন্ডাররেটেড সিনেমা মুক্তি পায় যেমন- হাসিল, জখম, চামেলি, যুবা ইত্যাদি। প্রতিটি সিনেমা ব্যবসাসফল না হলেও সমালোচকদের দৃষ্টি কেড়েছে। আরেকটা সিনেমার কথা না বললেই নয়, ২০০৩ সালে মুক্তি পাওয়অ গঙ্গাজল। অনেক শক্তিশালী একটি গল্প সাথে আছে অজয় দেবগনের অসাধারণ অভিনয়। এই সিনেমা ভারতের ছোট শহরের রাজনীতি আর পরিবেশ সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ একটা ধারণা দেয়।

২০০৩ সালের অনেক কথাই তো বললাম এখন ২০০৬ সালে মুক্তি পাওয়া দুইটা সিনেমার কথা শুনুন তাহলে, ওমকারা এবং রং দে বাসন্তি। দুইটা সিনামরই প্লট আর গল্প আলাদা হলেও সিনেমা দুইটির উপস্থাপনা একই রকম, অস্থির সিনেমাটোগ্রাফি এবং নির্ভূল প্রযোজনা। এই দুইটা সিনেমা বলিউড এর ভাবমূর্তি পরিবর্তন করতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। এর মাঝে আরো কিছু আন্ডাররেটেড সিনেমা মুক্তি পায় যেমন ভেজা ফ্রাই, খোসলা কা ঘোসলা, জনি গাদ্দার ইত্যাদি। এখন বলিউড এর এমন অন্যতম দুইটা সিনেমার কথা আলোচনা করব যা কিনা একই সাথে সমালোচিত এবং প্রশংসিত। ২০০৪ সালে মুক্তি পাওয়া ব্ল্যাক ফ্রাইডে আর ২০০৯ সালে মুক্তি পাওয়া দেব ডি। দুইটা সিনেমার গল্পই অনেক বোল্ড, আর দেব ডি সে তো অনেক বিখ্যাত। উপন্যাস “দেবদাস” এর ভিন্ন এক রুপ, বলতে গেলে “Modern Adaptation”। এই দুইটা সিনেমাও বলিউড এ নতুন ঘরনার সিনেমার জোয়ার নিয়ে এসেছিল। নতুন ঘরনা যখন বলেই ফেললাম তখন দিল্লি বেললি (২০১১) কথা না বললে হয় না, সম্পূর্ণ নতুন ঘরনা (বলিউড এর জন্য)। ব্ল্যাক কমেডি সিনেমা হলো এইটি। আরো কিছু সিনেমা আছে যেইগুলা বলিউড এর ধারা চেঞ্জ করতে ভূমিকা রেখেছিল যেমন- লাভ সেক্স ও ধোকা, উরান, লাঞ্চবক্স ইত্যাদি। এইতো মোটামুটি বলিউড এর গল্প নির্ভর সিনেমা, তবে এইগুলা কে শুধু গল্পনির্ভর বললে ভুল হবে, এই সিনেমাগুলা বলিউড এর গতানুগতিক ধারা পরিবর্তন করতে রেখেছে বিশেষ ভূমিকা।

তবে, এই খানে শেষ না, আরো আছে। “Content is king now”-কেন এই Term টা বলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে এখন ব্যবহার হচ্ছে? এই কথাটার মূল কারণ হচ্ছে অতীতে শক্তিশালী গল্পনির্ভর বা চিত্রনাট্য বিশিষ্ট সিনেমা সমালোচক আর দর্শকদের প্রশংসা কুড়ালেও তেমন ব্যবস সফল হয় নি কিন্তু এখন এই ধারার পরিবর্তন হচ্ছে। অতীতে বড় সুপারস্টার ছাড়া ব্যবসা সফল সিনেমা হাতে গুনা কিন্তু এখন আর তা না। অতীতে গতানুগতিক ধারার বাহিরে সিনেমা নির্মাণ করলে তা ব্যবসা সফল হওয়ার হার ছিল খুবই কম, ওই জন্য নির্মাতারা সাহস পেত না নতুন কিছু চেষ্টা করার কিন্তু এখন আর তেমন নেই। সেই জন্যই দিন দিন গল্প নির্ভর ও সামাজিক বার্তা মূলক সিনেমার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই Term টার সবচেয়ে বড় উদাহরণ আমি দুই জন অভিনেতা আর অভিনেত্রীকে দিয়ে দিতে চাই , একজন হলো আয়ুষ্মান খুরানা এবং আরেকজন হলেন কঙ্গনা রানাওয়াত। মূলত এই দুইজনের কথা বলছি কারণ তারা দুইজন অনেক ভিন্ন ভিন্ন প্রজেক্ট ট্রাই করেছেন যার সিংহভাগই ব্যবসা সফল, যেমন- আয়ুষ্মান এর ভিকি ডোনার, শুভ মঙ্গল সাবধান কিংবা সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত শুভ মঙ্গল জাদা সাবধান, এবং কঙ্গনার কুইন আর তনু ওয়েডস মানু রিটার্নস

আমি যেই মুভিগুলার কথা উল্লেখ করলাম প্রতিটি ব্যবসা সফল এবং সমালোচক আর দর্শকদের প্রশংসা তো আছেই। অতীতে ব্যবসা সফলতা + সমালোচকদের প্রশংসা এই দুইটা জিনিস একসাথে পাওয়া যেত না বললেই চলে। বর্তমানে আরো কিছু অভিনেতা বলিউড এর ধারা পরিবর্তন করতে অগ্রনী ভূমিকা পালন করছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলো- অক্ষয়কুমার, রাজকুমার রাও, ভিকি কৌশল, রণভীর সিং প্রমুখ। মূল কথা হলো এই ধারা পরিবর্তন করাতে সবাই এগিয়ে আসছেন তার মূল কারণ হচ্ছে দর্শকদের রুচির পরিবর্তন, দর্শকরা নতুন কিছু দেখতে চাচ্ছেন ওই জন্য সব পরিচালক, নির্মাতা আর অভিনেতা অভিনেত্রীরাও এগিয়ে আসছেন।

পরিশেষে বলতে চাই, ভবিষ্যতে এই ধারা অনেক পরিবর্তন হবে, আরো অনেক বোল্ড কাহিনী বলি আর জটিল চিত্রনাট্য বলি, এই সব সিনেমার কদর বাড়বে, আরো সাহসী চরিত্রে অভিনয় করবে অভিনেতা আর অভিনেত্রীরা। কারণ মূলে আছি আমি আপনি মানে দর্শকরা। এবং আমার মতে নিকট ভবিষ্যতে আরেকটি Term সৃষ্টি হবে আর সেটি হবে “ Only Content is Real”।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here