বর্তমানে বিশ্বজুড়ে চলছে করোনা ভাইরাসের মহামারী। এই ভাইরাস থেকে বাদ পরছেন না কেউই। প্রাথমিকভাবে কেবল বয়স্ক, ডায়বেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এ ভোগা ব্যক্তিরাই সবচেয়ে বেশি করোনা ঝুঁকিতে আছে বলে ধারণা করা হলেও, সময়ের সাথে সাথে দেখা যাচ্ছে শিশুরাও এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এমতাবস্থায় সবাই প্রায় ঘাবড়ে রয়েছেন। কিন্ত শিশুরা এই ভাইরাসের ব্যাপারে কম জানে বিধায়, তাদের তুলনামূলক বেশি ভয় পেতে দেখা যাচ্ছে এবং সংক্রমনের ঝুকিও বেড়ে যাচ্ছে। আজকের এই লেখার মাধ্যমে করোনা পরিস্থিতিতে শিশুদেরকে কিভাবে খেয়াল রাখতে হবে তার একটি ধারনা গাইডলাইন দেওয়ার চেষ্টা করেছি।

করোনা মহামারীর জন্য বাচ্চাদের স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাড়ির সকলের সাথে তাদেরকেও গৃহবন্দী হয়ে থাকতে হচ্ছে। সেইসাথে সংক্রমনের ভয়ে বন্ধুদের সাথে মেলামেশাও এখন বন্ধ। একারণেই শিশুরা চারপাশের পরিস্থিতি নিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারে। এজন্য এসময় বাড়ির বয়স্কদের উচিৎ হবে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারে আলাদা খেয়াল রাখা। যেহেতু সাধারনত শিশুরা রাগ, কান্না, চিৎকার, কথা কম বলার মত বিভিন্ন আবেগগুলোকে ব্যবহার করে তাদের মনের ভয় প্রকাশ করে তাই এসব ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হবে যাতে ভয়ের কারণে শিশুর মানসিক বৃদ্ধি যেন বাধাগ্রস্থ না হয়। যাইহোক এরকম একটা পরিস্থিতিতে শিশুদের সাথে কেমন ব্যবহার করা উচিৎ এবং কীভাবে তাদের মনোবল চাঙ্গা রাখা যায় সেই বিষয়ে কিছু তথ্য জেনে নেয়া যাক।

১. বর্তমান সময়ে চলমান করোনা মহামারী নিয়ে তথ্য না লুকিয়ে সরাসরি শিশুদের সাথে এ বিষয়ে আলাপ করা :


আমরা সবাই জানি যে শিশুরা সর্বদা কৌতুহলি হয়। তাই তারা কিন্ত ইতিমধ্যে খেয়াল করেছে যে, তাদের আশেপাশের প্রায় সব মানুষ মাস্ক পরে বাইরে বের হচ্ছে এবং রাস্তাঘাট প্রায় জন্যশুন্য হয়ে গেছে। অন্যদিকে তাদের স্কুলও বন্ধ হয়ে গেছে। আবার সেই সাথে বাসা থেকে বের না হওয়ার জন্য বারবার বারন করা হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই এগুলো শিশুদের মনে নানা কৌতূহলী প্রশ্নের সৃষ্টি করবে এবং তারা বড়দের এই ব্যাপারে বারবার প্রশ্ন করতে থাকে। তখন কোনোভাবেই তাদের থেকে করোনা ভাইরাসের কথা না লুকিয়ে তাদের সঠিক তথ্যটি জানাতে হবে। ভাইরাসে আক্রান্ত হলে কি সমস্যা হবে সে ব্যাপারে তাদেরকে জানাতে হবে। কারণ, শিশুদের কাছ থেকে চলমান পরিস্থিতির তথ্য লুকানো হলে তারা আরও বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়বে। এই ব্যাপারে চাইল্ড মাইন্ড ইনস্টিটিউটের শিশু মনোবিজ্ঞানী ড. জেনিন ডোমিঙ্গেস বলেন, “শিশুদের কাছে আপনিই বার্তাবাহক এবং আপনিই ঠিক করতে পারেন তাদের কাছে কোন বার্তাটি পৌঁছাবেন।”

২. শিশুদের দরকারের চেয়ে বেশি তথ্য না দেওয়া :


শিশুদেরকে বর্তমান পরিস্থিতির ব্যাপারে যেমন সঠিক ধারণা দেয়া প্রয়োজন, তেমনি এটাও খেয়াল রাখতে হবে কোন তথ্যটি তাদের জন্য উপযুক্ত এবং কোনটি অনুপযুক্ত। শিশুদের করোনা ভাইরাস থেকে কিভাবে দূরে থাকা যায় এবং এর জন্য কি কি করতে হবে এই বিষয়ে জানাতে হবে। কিন্তু এমন কিছু জানানো যাবে না যাতে তারা আরও বেশী ভয় পায় বা বিভ্রান্ত হয়ে যায়, যেমন প্রতিনিয়ত করোনাতে আক্রান্ত হওয়া এবং মৃত্যুর তথ্য।

৩. শিশুদের কথা বলার সুযোগ দেওয়া :


যেহেতু সাধারনত শিশুরা ভয় পেলে কথা বলা বন্ধ করে দেয় কিংবা কমিয়ে দেয়। তাই বড়দের নিজ থেকে শিশুদের কথা বলার সুযোগ করে দিতে হবে। করোনা ভাইরাসের ব্যাপারে তারা কী ভাবছে বা তাদের ধারণা কেমন এগুলো তাদের জিজ্ঞাসা করতে হবে। যদি তাদের ধারণায় ভুল থাকে তাহলে তা অবশ্যই ঠিক করে দিতে হবে। যার ফলে শিশুরা অনেকটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে। আসলে মূল উদ্দেশ্য থাকবে সতর্ক করার পাশাপাশি শিশুদের মনের ভয় দূর করা এবং তারা যাতে চিন্তামুক্ত থাকে সেই ব্যবস্থা করা।
৪. আগে বড়দের উদ্বেগ সামাল দেওয়া:
স্বাভাবিকভাবেই চারপাশের পরিস্থিতি নিয়ে আমরা বড়রাও উদ্বিগ্ন হয়ে আছি। যেহেতু চারদিকে করোনা সংক্রমন এবং মৃত্যুর মিছিল দেখে বড়রা সহজে বাসা থেকে বের হচ্ছেন না সেইসাথে বড়দের মনোভাব অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশুদের মনকেও প্রভাবিত করে ফেলে তাইএরকম পরিস্থিতিতে আগে বড়দের নিজেদেরকে সামলাতে হবে। পরিস্থিতির সাথে নিজেদেরকে আগে মানিয়ে নিতে হবে। মনে রাখতে হবে উদ্বিগ্ন অবস্থায় কখনও শিশুদের সাথে কথা বলা উচিৎ হবে না।

৫. শিশুদের করোনা ভাইরাসের ব্যাপারে আশ্বস্ত করা :


যেহেতু বাংলাদেশে এখন মৌসুম পরিবর্তন জনিত রোগ যেমন জ্বর, কাশি ইত্যাদির সময় তাই এগুলো যে কারও হতে পারে। কিন্তু করোনা ভাইরাসের লক্ষণ সাধারণ জ্বর বা কাশির মতো হওয়ায় শিশুরা এসব রোগে অল্পতেই ভয় পেয়ে যেতে পারে। এসময় তাদের এই ব্যাপারে আশ্বস্ত করা খুবই জরুরি যাতে তারা অল্পতেই ভেঙে না পড়ে। করোনা ভাইরাস কখন আক্রমণ করতে পারে এবং এই ভাইরাস প্রতিরোধে করণীয় কী এই বিষয়ে আপনার শিশুকে অবহিত করতে হবে। ছোটরা সাধারণত বড়দের দেখেই শেখে তাই আগে নিজে সচেতন হতে হবে এবং নিয়মিত নিজেকে পরিষ্কার রাখতে হবে, তাহলে ছোটরাও আপনার দেখাদেখি নিজেদের পরিষ্কার রাখবে।

৬. করোনা সংক্রমন এড়াতে শিশুদের তাদের করনীয় সম্পর্কে সচেতন করা :


আগেই বলেছি শিশুরা সবচেয়ে বেশি শিখে বড়দের অনুকরণ করে। এক্ষেত্রে আপনার নিজের সচেতনতাই শিশুদের সচেতন করতে সাহায্য করবে। শিশুরা বাইরে থেকে আসলে তাদের হাত ধুতে বলা, ঘন ঘন মুখে হাত দিতে মানা করা, নিয়মিতভাবে কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড ধরে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া এগুলোর ব্যাপারে তাদের সচেতন করতে হবে। এসব নিয়ম যদি বড়রা নিজে মেনে চলে, তাহলে শিশুরা বড়দের দেখাদেখি নিজেরা সচেতন হবে। মাস্ক পরার ব্যাপারেও শিশুদের সচেতন করতে হবে। সুস্থ মানুষের মাস্ক পরার প্রয়োজন না হলেও, যারা ঠান্ডা ও কাশিতে ভুগছেন, তাদের অবশ্যই মাস্ক পরতে হবে। এক্ষেত্রে শিশুরা ঠান্ডা ও কাশিতে ভুগলে, তাদেরও মাস্ক পরতে উৎসাহিত করতে হবে। এতে তারা করোনার সংক্রমণ থেকে নিজেদের ও অন্যদেরও রক্ষা করতে পারবে।

৭. পরিবর্তিত নতুন রুটিনে খাপ খাওয়ানো :


করোনা ভাইরাসের প্রকোপের কারণে সবকিছু প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং বাসা থেকে বের হওয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা থাকায় আমাদের প্রতিদিনের রুটিনে এসেছে একটি বড় পরিবর্তন। যেহেতু অনির্দিষ্টকালের জন্য সবাইকে গৃহবন্দী থাকতে হচ্ছে, তাই এই সময়ে আমাদের নতুন একটি রুটিনের মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে। তাই সময়মতো খাওয়া, গোসল করা, ঘুমানো এগুলো খুবই জরুরি। কারণ এগুলোর হেরফের হলে আমাদের স্বাস্থ্য ভেঙে পড়বে এবং অসুখে পড়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। আর এই মহামারীর সময় কেউই চায় না নতুন কোনো রোগে আক্রানত হতে। তাই এই সময় রুটিনের ব্যাপারে বিশেষ করে শিশুদের প্রতি বিশেষ নজর রাখা রাখতে হবে।

এই মহামারীর সময় আপনার ও আপনার পরিবারের নিরাপত্তার খাতিরে বেশি বাইরে যাওয়া আসা থেকে বিরত থাকতে হবে। পরিবারকে সময় দিন, শিশুদের সাথে বেশি বেশি সময় দিন, তাদের সাথে গল্প করুন, নিজের খেয়াল রাখুন এবং অন্যদেরও নিরাপদ রাখুন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here