লেখক: নাভিদ আলম (প্রীতম)

জাপানের রাজধানী টোকিও থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে শিজুকা আর ইয়ামানশি প্রদেশের সীমান্তে হনশু দ্বীপে অবস্থিত মাউন্ট ফুজি। জাপানিজদের কাছে মাউন্ট ফুজি শুধু একটি পর্বত নয়, অন্যতম জাতীয় ঐতিহ্যের প্রতীকও। জাপানিজরা এই পর্বতশৃঙ্গকে অত্যন্ত পবিত্র স্থান বলে মনে করেন। এ পর্বতশৃঙ্গ বিশ্বের ৩৫ তম এশিয়ার ৪র্থ তম এবং জাপানের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ। যার উচ্চতা ১২,৩৮৯ ফিট বা ৩,৭৭৬.২৪ মিটার। এটি একটি ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরিও বটে। মাউন্ট ফুজি একটি সক্রিয় লাভা গঠিত আগ্নেয়গিরি। ১৭০৭-০৮ সালে এখানে শেষবারের মত অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা ঘটে। এ পর্বতশৃঙ্গের জ্বালামুখটি বছরের কয়েক মাস বরফাচ্ছাদিত থাকে। যেটা পৃথিবীর অনান্য আগ্নেয়গিরি থেকে বিরল বৈশিষ্ট্যমন্ডিত করেছে এই পর্বতশৃঙ্গকে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা যদি কখনো মাউন্ট ফুজির প্রবল অগ্ন্যুৎপাত ঘটে তাতে টোকিও শহরটি ছাইয়ের নিচে চাপা পড়ে যেতে পারে। যেটা জাপানিদের কাছে এক চিন্তার কারন হয়ে উঠতে পারে। জাপানের ১১তম ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট এই ভয়ঙ্কর সুন্দর মাউন্ট ফুজি আরো এক ভয়ঙ্কর সত্ত্বাকে বুকে ধারন করে রেখেছে সেটা ‘অওকিগাহারা জঙ্গল’(Aokigahara Forest)। যেটা মাউন্ট ফুজির উত্তর পাদদেশ জুড়ে বিস্তৃত, ঘন গাছ-গাছালিতে আচ্ছাদিত। নিঝুম এই বনের আরেক নাম ‘সুইসাইড ফরেস্ট’। যেটা এর আসল নামের থেকে বেশি প্রচলিত। অভিশপ্ত এই বন মানুষকে আত্মহত্যা করার জন্য প্ররোচিত করে এমনটাই বিশ্বাস করে স্থানীয়রা। এই প্ররচনার স্বীকার হয়ে কত শত মানুষ মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছে এই বনে এসে তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই জাপান সরকারের কাছে। তবে সেই সংখ্যা সহস্রের ঘরে হবে এটা সহজেই অনুমেয় স্থানীয়দের কাছে। ৩৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের নৈসর্গিক এই বন থেকে প্রতিবছর গড়ে প্রায় একশ জন মানুষের মৃতদেহ উদ্ধার করে জাপান পুলিশ ও স্থানীয়রা। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, আত্মহণনকারী ২৪৭ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছিলো শুধুমাত্র ২০১০ সালেই। আত্মহত্যা প্রবণ জাপানিদের কাছে এই বন আত্মহত্যার জন্য উত্তম স্থান বলে বিবেচিত হওয়ার প্রধান কারন এর নির্জনতা-নিস্তব্ধতা।অর্থনৈতিক মন্দা এবং বেকারত্বের কারণে হতাশাগ্রস্থ হয়ে অনেকেই জীবন শেষ করে ফেলেন এ বনের গাছের সাথে ফাঁস দিয়ে, কেউবা বিষ খেয়ে নতুবা মাত্রারিক্ত ড্রাগ নিয়ে। এজন্য স্থানীয়রা ব্যপক ভয় করেন এই সুইসাইড ফরেস্টকে। স্থানীয়রা কেউ আসতেই চান না মাউন্ট ফুজির এই অংশটায়। সচারাচর সাধারণ মানুষও এ বনকে প্রচন্ড ভয়ের চোখে দেখেন। সচারাচর যেখানে দিনের বেলায় লোক যাতায়াত থাকে না এই বনে ও পাশ্ববর্তী রাস্তায়, সেখানে রাত্রিতে এ বন থমথমে ভৌতিক রূপ ধারণ করে। লোকমুখে এই বনকে নিয়ে অসংখ্য কেচ্ছা-কাহীনি ভৌতিক গল্প ছড়িয়ে আছে আবার অনেক জাপানি মনে করেন এ বনে ভূত, ডাইনি, আত্মা-প্রেতাত্মার মত অশারিরিক সত্তা বাস করে। জাপানি উপাখ্যানেও এর ভৌতিক দিকটা স্থান পেয়েছে বার বার। ভৌতিক চলচিত্রে স্থান করে নিয়েছে বহুবার। যার সর্বশেষ উদাহরন ‘দ্য ফরেস্ট’ নামক হলিউড মুভিটি। যেখানে অওকিগাহারার আত্মহত্যার বিষয়টি উঠে এসেছে। জমজ বোনকে অওকিগাহারার জঙ্গলে খুঁজতে গিয়ে এক নারীর নিখোঁজ হওয়ার কাহিনীকে ঘিরে মুভিটি নির্মিত হয়েছিল। ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর মার্কিন ইউটিউবার পল লোগানের, ইউটিউবে আপলোড করা অওকিগাহারা জঙ্গলে আত্মহত্যা করা এক ব্যক্তির ঝুলন্ত মৃতদেহের একটি ভিডিও দেখানোর পর তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসমূহে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন পল। এ বনটি নিয়ে এরকম বহু ঘটানার সত্যতা ইন্টারনেটের রকমারি ভান্ডারে রয়েছে। একটু খুজলেই পাওয়া যাবে, আর কেউ সরাসরি অভিঙ্গতা নিতে চাইলে তাকে চলে যেতে হবে মাউন্ট ফুজির অওকিগাহারা জঙ্গলে বা বিশ্বের অন্যতম সুইসাইড ফরেস্ট।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here