লিখেছেন: অনিমেষ


ইতিহাসে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পুরুষচরিত্র ড্রাগ লর্ড হিসেবে জায়গা করে নিলেও এই নারী চরিত্র ও কোনো অংশে পিছিয়ে নেই পুরুষদের থেকে।তার অপরাধজীবন বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নামে আখ্যায়িত করা হয়েছিল।কোকেনের গডমাদার, দ্যা গডমাদার ও ব্ল্যাক উইডো নামেও পরিচিতি লাভ করেছিলেন।
গ্রিসেল্ডা ব্লাঙ্কো। পুরো নাম গ্রিসেল্ডা ব্লাঙ্কো রেস্ট্রেপো, একজন খুনী এবং কুখ্যাত ড্রাগ পাচারকারী।জন্ম ১৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৩।। যদিও তার জন্মসূত্র নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি থাকলেও কয়েকটি সূত্র থেকে নিশ্চিত করা যায় তার জন্মস্থান কলম্বিয়ার সান্তা মাটা।তার ছোটবেলা কেটেছিল অনেক দারিদ্রতার মাঝে। তার মা মূলত মদ্যপ ছিলেন এবং তার মায়ের অনেক বয়ফ্রেন্ডের কাছ থেকে শিশুনির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন তিনি।৩ বছর বয়সে তার মা ও ব্লাঙ্কো মেডেলিনে চলে গিয়েছিলেন।কোকেন বাণিজ্যের জন্য এই শহরকে সেই সময়ে সর্বাধিক বিপজ্জনক শহর বলা হত।
নারী ড্রাগ লর্ড
গ্রিসেল্ডা ব্লাস্কো ও দুই সন্তান
খুব কম বয়সেই অপরাধ জগতে তার হাতে খড়ি হয়েছিল।তার বয়স যখন ১১, সে একটি ধনী পরিবারের ছেলেকে অপহরণ করতে সাহায্য করেছিলেন পরবর্তীতে সে ছেলের পরিবার মুক্তিপণ দিতে অস্বীকার করলে ব্লাঙ্কো সেই ছেলেকে গুলি করে হত্যা করে।পরাক্রমে সে ছিনতাই এবং বেশ্যাবৃত্তিতে জড়িয়ে পড়ে।কিশোর বয়সেই ব্লাঙ্কো এক অপরাধীকে বিয়ে করেছিলেন এবং এই দম্পতির তিন সন্তান ছিল। কিছু সময় পরে তাদের ডিভোর্স হয়ে যায় এবং জানা গিয়েছিল ব্লাঙ্কো তার স্বামীকে পরবর্তীতে খুন করেছিলেন। এরপর ব্লাঙ্কো খুব শীঘ্রই কলম্বিয়ার কুখ্যাত মেডেলিন কার্টেলের সাথে যুক্ত হয়ে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ করে নিউ ইয়র্ক, মিয়ামি এবং দক্ষিন ক্যালিফোর্নিয়ায় কলম্বিয়ান কোকেন পাচার করতে সাহায্য করতেন। সেই সময়ে ব্লাঙ্কোর অভিনব কৌশলের জন্য কার্টেলের সদস্যরা সীমান্তের ওপারে প্রচুর পরিমানে কোকেন পাচার করতে সক্ষম হয়েছিল। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কলম্বিয়াই ৩০০ এরও বেশি খুন করেছিলেন বলেও ধারণা করা হয়। তাকে সবসময় বিলাসবহুল জীবন মুগ্ধ করত সম্ভবত তার শৈশবকালের দারিদ্রতার জন্য, তার ড্রাগ ব্যবসা তাকে শেষ পর্যন্ত সেই জীবনধারা উপভোগ করতে দিয়েছিল।

কোকেনের গডমাদার হয়ে ওঠা


তার ডাকনামগুলিতে তাকে পুরোপুরি মানায় কারণ গ্রিসেল্ডা ব্লাঙ্কো ছিল নির্ভিক এবং নির্মম। তিনি দ্বিতীয়বার বিবাহ করেন আলবার্তো ব্রাভোর সাথে এবং তার মাধ্যমেই পুরোপুরি কোকেন ব্যবসায় যুক্ত হয় ব্লাঙ্কো। আমেরিকার নিউ ইয়র্ক শহরকে তাদের বেস বানায় তারা এবং আমেরিকাতে ড্রাগ আনতে শুরু করে।ব্লাঙ্কোর নতুন নতুন কৌশল তাদেরকে একটি অত্যন্ত লাভজনক অপারেশনে সফল হতে সাহায্য করেছিল। ৭০ ও ৮০ এর দশকের ভয়ংকর মিয়ামি মাদক যুদ্ধেও এই দম্পতি ছিল কেন্দ্রীয় চরিত্রে। এই দশকগুলিতে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কলম্বিয়াই অনেক শত্রু করেছিলেন এবং এই শত্রুদের নির্মূলের জন্য তিনি প্রচুর উপায় বের করেছিলেন।তার মধ্যে একটি হলো চলন্ত মোটরবাইক থেকে গুলি,বলা হয়ে থাকে এই কৌশল তিনি প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন। ব্লাঙ্কো যা করেছে সব সময় তাই তাকে সফলতার শীর্ষে পৌঁছিয়েছিল। কেউ কেউ তো বলতো যে মাদকের সাথে জড়িত যেকোনো লোকের চেয়ে ব্লাঙ্কো ছিল অনেক বেশি ভয়ংকর। ৭০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে ব্লাঙ্কো ও তার স্বামী বানশি নামে একটি ড্রাগ স্ট্রিং অপারেশনে ফেঁসে যায়।কিন্তু তাকে গ্রেপ্তার করার আগেই সে কলম্বিয়াই পালিয়ে গিয়েছিল।সেই বছর সে তার দ্বিতীয় স্বামীকেও খুন করে অর্থ চুরির সন্দেহে এবং ব্ল্যাক উইডো নামে পরিচিতি লাভ করেন।তিনি পরে তার তৃতীয় স্বামীকেও হত্যা করে বলে জানা যায়।
নারী ড্রাগ লর্ড
স্বামীর সঙ্গে গ্রিসেল্ডা ব্লাস্কো
৭০ দশকের শেষের দিকে ব্লাঙ্কো মিয়ামিতে চলে গিয়েছিলেন এবং সেখানেই তিনি কোকেনের গডমাদার হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তিনি সেখানে বিস্তার লাভের জন্য নৃশংস এক হত্যাকান্ড চালান যা ওই শহরটিকে এক সহিংসতার অন্ধকারে ডুবিয়ে দিয়েছিল। ওই হত্যাকান্ড কোকেন কাউবয় যুদ্ধ নামে পরিচিতি লাভ করেছিল। তিনি এই ধরণের হত্যাকান্ড ও বুদ্ধিমত্তার দরুন বিশ্বের অন্যতম ধনী মাদক পাচারকারী হয়ে উঠেছিলেন। সেই সময়ের এক প্রতিবেদন অনুসারে তিনি প্রতি মাসে প্রায় ৩ টনেরও বেশি কোকেন যুক্তরাষ্ট্রে পাচার করতেন যার মূল্য ছিল প্রায় ৮০ মিলিয়ন ডলার।মিয়ামি-ডেড পুলিশ বিভাগ ও ডিইএ মাদকবিরোধী বিভাগ চলমান সহিংসতা ঠেকাতে সেন্ট্রাল ট্যাক্টিকাল ইউনিট বা সেন্টট‍্যাক তৈরি করেছিলেন।

গ্রেপ্তার এবং সাজা


১৯৮৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্রিসেল্ডা ব্লাঙ্কোকে ডিইএ এজেন্টরা তার বাড়িতে গ্রেপ্তার করেছিল এবং মাদকের অভিযোগে তাকে নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।১৯৮৫ সালে দোষী প্রমাণিত হলে তিনি সর্বোচ্চ ১৫ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন যদিও তিনি কারাগারে বন্দি অবস্থাতেও তার বিশাল সাম্রাজ্য চালিয়ে গেছেন বলে জানা গিয়েছিল।পরবর্তীতে তাকে খুনের দায়ে অভিযুক্ত করা হলেও সেগুলো কখনোই প্রমাণিত হয়নি।পরে ২০০৪ সালে সে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসলে তাকে কলম্বিয়ায় নির্বাসিত করা হয়েছিল।

পরবর্তী জীবন


গ্রিসেল্ডা ব্লাঙ্কোর তিনটি বিবাহ থেকে চারটি সন্তান ছিল যার মধ্যে তিনজন হত্যা হয় কলম্বিয়ায় নির্বাসিত হওয়ার পর।
মজার বিষয় হল গ্রিসেল্ডা ব্লাঙ্কো পরবর্তী জীবনে খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন।২০১২ সালের সেপ্টম্বরে তিনি এক কসাইয়ের দোকান থেকে বের হলে এক মোটরসাইকেল চালক তাকে গুলি করে হত্যা করে। এটি শুনতে অবাক লাগলেও এইভাবে হত্যার কৌশল তিনিই প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন। মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিল ৬৯ বছর।বলা হয়ে থাকে ব্লাঙ্কো মৃত্যুর সময় চুপচাপ জীবনযাপন করছিলেন এবং অপরাধ জীবন ছেড়ে দিয়েছিলেন।

গুজব বা সত্য


গ্রিসেল্ডা ব্লাঙ্কো অনেক মানুষের সাথে অত্যন্ত জঘন্য কাজ করেছিলেন।তিনি পুরুষ এবং মহিলা উভয়ের সাথেই জোরপূর্বক যৌন মিলনে বাধ্য করতেন।তার দ্বারা নিহত ব্যক্তিদের সংখ্যা ৩০০ এরও বেশি বলে ধারণা করা হলেও তাদের মধ্যে কেবলমাত্র তিন জনের জন্যই তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল।
নারী ড্রাগ লর্ড
যৌবনে অস্ত্র হাতে গ্রিসেল্ডা ব্লাস্কো
তার বিরুদ্ধে যেসব হত্যার অভিযোগ উঠেছিল তার মধ্যে একটি হল দুই বছরের একটি শিশুর।আসলে বলা হতো তিনি যেকোনো কারণেই মানুষ হত্যা করতেন।একটি গুজব রটেছিল যে ব্লাঙ্কো উভকামী ছিলেন এবং যৌনকর্মীদের সাথে তার সম্পর্ক ছিল।তিনি কেবল বাচ্চাদের মাদক চোরাচালান কাজে বাধ্য করতেন না প্রবীণ নাগরিকদেরকেও সে মাদক চোরাচালান এ বাধ্য করতেন ৷
২০০৬ সালে কোকেন কাউবয় নামে একটি ডকুমেন্টারি সিনেমা তৈরি হয় যেটা সম্পূর্ণ তার জীবন কাহিনী নিয়ে। তার ঠিক দুই বছর পর কোকেন কাউবয় মুভিটির সিক্যুয়াল বের হয়। 2017 সালে কোকেন গডমাদার নামে আরেকটি মুভি তৈরি হয়েছিল।এই মুভিগুলোই ব্লাঙ্কোকে পৃথিবীর সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল তার নৃশংস ও অমানবিক কার্যকলাপের সাথে।
গ্রিসেল্ডা ব্লাঙ্কো ইতিহাসের অন্যতম কুখ্যাত নারীচরিত্রের একজন।তিনি ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ নারী হিসেবেও বিবেচিত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here