গল্পঃ শুভ জন্মদিন

লেখাঃ তানভীর তূর্য

চাঁদের রূপালি আলোয় ভেসে যাচ্ছে শহরের অলিগলি। বিষণ্ণতায় আচ্ছন্ন মানুষগুলোর মনে হবে এ আলোয় ভিজলে হয়তো জমে থাকা যন্ত্রণাগুলো দূরীভূত হয়ে যাবে একটু একটু করে। সোবহান সাহেবের প্রচণ্ড ইচ্ছে করছে স্ত্রী আর মেয়েকে সাথে নিয়ে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ হাতে জোছনা দেখতে। কিন্তু তিনি স্ত্রীকে ডাকার সাহস পাচ্ছেন না। ডাকতে গেলেই সালমা বেগম যে চেঁচিয়ে উঠবেন এটা তিনি প্রায় নিশ্চিত। তারপরেও মনে ক্ষীণ আশা নিয়ে তিনি সালমা বেগমকে ডাকতে গেলেন।

সালমা বেগম উদভ্রান্তের মতো খাটে হেলান দিয়ে বসে আছেন। মনে হাজারো চিন্তার বাণ ডেকে যাচ্ছে। সে বাণে তিনি ক্রমশই তলিয়ে যাচ্ছেন। সোবহান সাহেব ঘরে ঢুকে সালমা বেগমকে এভাবে বসে থাকতে দেখে বেশ হকচকিয়ে গেলেন। তিনি সালমা বেগমের মাথায় হাত রেখে বললেন, “তুমি কি অসুস্থ, সালমা? শরীর খারাপ লাগছে?”

সালমা বেগম মাথা থেকে সোবহান সাহেবের হাত সরিয়ে দিয়ে বললেন, “আমি সম্পূর্ণ সুস্থ এবং আমার শরীরও ঠিক আছে কিন্তু আমার মন প্রচণ্ড অসুস্থ। মনের অসুখে দিশেহারা হয়ে পড়ছি। পারবে ঠিক করতে?”

সোবহান সাহেব এরকম উত্তর মোটেই আশা করেননি। তিনি আমতা আমতা করে বললেন, “বাইরে খুব জোছনা উঠেছে। ছাদে গিয়ে বসবে চলো। দেখবে ভালো লাগছে।”

সালমা বেগম গলা চড়িয়ে বললেন, “মেয়েটা আমার দিনের পর দিন একটু একটু করে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে আর তোমার জোছনা দেখার ভীমরতি ধরেছে। একটুও লজ্জা লাগছে না!”

সোবহান সাহেব কোনো কথা না বলে নিঃশব্দে ঘর থেকে বের হয়ে এলেন। ইদানীং সালমা বেগম একটুতেই মেজাজ দেখাচ্ছেন। মেয়ের চিন্তায় চিন্তায় হয়তো তার ভেতরে এরকম অস্বাভাবিকতা বাস করতে শুরু করেছে।

সোবহান সাহেব মনে মনে অনুতপ্ত হলেন। সত্যিই তো, মেয়েটার আজ এই অবস্থা আর জোছনা দেখার কথা মনে এলো কীভাবে? এর জন্য তিনি আফসোস করতে লাগলেন। এরকম ছেলেমানুষি করা মোটেই উচিত হয়নি। আসলে বহুদিনের অভ্যাস বলে কথা।

.জোছনা রাতগুলো মিলির অসম্ভব প্রিয় ছিল। জোছনা রাতে চাঁদ তার আলোকরশ্মি যেমনই ছড়াতে শুরু করতো অমনি মিলি হইচই শুরু করে দিতো। নিজ হাতে চা বানিয়ে বলতো, “বাবা এসো তো, চা খেতে খেতে জোছনায় ভিজবো। চায়ের সাথে টা পাবে না কিন্তু, চাঁদের আলো মিশিয়ে খেয়ে নাও। দেখবে চায়ের স্বাদ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। হা হা হা।”

একসময় মিলির বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর হয়তো সে অভ্যাসে কিছুটা ছেদ পড়েছিল কিন্তু যখনই মিলি আসতো তখনই আবার জোছনা দেখার উৎসব চলতো।

সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়তেই একরাশ দমকা বিষাদে সোবহান সাহেব বিষাদগ্রস্থ হয়ে পড়লেন। প্রচণ্ড মন খারাপ নিয়ে তিনি মিলির ঘরের দিকে এগুলেন।

মিলির ঘর সম্পূর্ণ অন্ধকার। জানালাগুলোও বন্ধ। আলো প্রবেশের সব পথ যেন ইচ্ছে করেই রোধ করা হয়েছে। মিলি গুটিসুটি হয়ে শুয়ে আছে। কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। ঘুমিয়ে আছে নাকি জেগে আছে বুঝার উপায় নেই।

সোবহান সাহেব দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। মিলিকে ডাকবেন নাকি ডাকবেন না এই নিয়ে দ্বিধায় পড়ে গেছেন। তিনি খেয়াল করলেন ঘরের মধ্যে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা যেন মাতম করছে। কিন্তু এই নিস্তব্ধতার মাঝেও একটা শব্দ প্রকট হয়ে তার কানের পর্দায় হাতুড়ি পেটাতে লাগলো। সে শব্দ বেদনার। সে শব্দ বিচ্ছেদের।

সোবহান সাহেব বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারলেন না। বুকের ভেতর এক অচেনা যন্ত্রণা বাড়তে লাগলো। তিনি চলে যাবেন অমনি মিলি বলে উঠলো, “কিছু বলবে বাবা? চলে যাচ্ছো যে, ভেতরে এসো।”

সোবহান সাহেব অপ্রস্তুত হয়ে বললেন, “তুই জেগে আছিস? আমি ভাবছি ঘুমিয়ে পড়েছিস হয়তো। এমনি কী করছিস তাই দেখতে এসেছিলাম।”

মিলি বলল, “মিথ্যা বলছো কেন, বাবা? আমাকে নিয়ে জোছনা দেখবে বলে এসেছিলে, তাই না?”

সোবহান সাহেব লজ্জায় পড়ে গেলেন। তিনি কিছু না বলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন।

মিলি শীতল স্বরে বলল, “যাকে আগামী দিনগুলো গভীর অন্ধকারকে সঙ্গী করে কাটাতে হবে তার কি জোছনা দেখা সাজে বাবা? ক্ষমা করো, তোমার জোছনা দেখার সঙ্গী হতে পারছি না বলে।”

কোনো প্রশ্নের উত্তরই আজ সোবহান সাহেবের কাছে নেই। তিনি শুধু বললেন, “অন্ধকারকে সঙ্গী মনে করে সবকিছু থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া মানে হেরে যাওয়া, মা। হেরে যাস না। লড়াই কর।”

সোবহান সাহেব বাইরে এসে আকাশের দিকে তাকালেন। জোছনা দেখার উদ্দেশ্যে নয় হয়তো সৃষ্টিকর্তার কাছে একটু সান্ত্বনা খুঁজে পেতে।

নিয়তি বিদ্রুপ করার জন্য মিলিকেই কেন বেছে নিলো সোবহান সাহেব এখনও তা বুঝে উঠতে পারেন না। মিলি তার আর সালমা বেগমের বড় আদরের মেয়ে। ছোট্ট থেকে বুকের সবটুকু মায়া মমতা আর ভালোবাসা দিয়েই ওকে বড় করেছেন। লেখাপড়া শিখিয়েছেন। ভালো ঘর ভালো ছেলে দেখে কত ধুমধাম করে বিয়েও দিয়েছিলেন। কিন্তু সুখ নামের অচিন পাখিটা মিলির জীবনে ধরা দিতে চায়নি। বিয়ের কয়েক মাস যেতে না যেতেই ছেলেটা অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লো। চাঁদের টুকরো মেয়েটাকে কত অশান্তি আর মানসিক অত্যাচার যে সহ্য করতে হয়েছে তার হিসেব কষতে বসলে চোখের বাঁধ থামানো মুশকিল। একদিন ডিভোর্সের কাগজ হাতে ধরিয়ে দিয়ে বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিলো।

যেদিন মিলি সম্পর্কের সকল বাঁধন ছিন্ন করে এসে দরজায় দাঁড়ালো সেই দিনটির কথা সোবহান সাহেব কোনোদিন ভুলতে পারবেন না। মিলির সেই মলিন মুখ দেখে তিনি চমকে উঠেছিলেন। চোখের নিচে দিনের পর দিন কালি জমে জমে চেহারার ঔজ্জ্বল্যতা হারিয়েছে। চোখে জলের বদলে বেদনায় টইটুম্বুর। শরীরও শুকিয়ে জীবন্ত কঙ্কাল। তার আদরের মিলিকে চিনতে বড় কষ্ট হয়।

মিলি সোবহান সাহেবকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমি কি খুব খারাপ, বাবা? সবকিছু যে শেষ হয়ে গেল। মা বলে, ছেলেরা দেয় ঘর আর মেয়েরা দেয় সংসার। আমার ঘরটাই যে নড়বড়ে। তাই আমি আমার সংসার আগলে রাখতে পারলাম না, বাবা।”

সোবহান সাহেব উত্তরে কিছুই বলতে পারেন নি। শুধু মিলিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে থাকলেন ঠিক যেমন করে ছোটবেলায় জড়িয়ে রাখতেন।

এরপর থেকে মিলি নিজের ভেতর গুঁটিয়ে যেতে থাকলো। আজ কয়েক মাস যাবৎ কারও সাথে ভালো করে কথা বলে না। বেশিরভাগ সময় ঘরেই দরজা বন্ধ করে একা একা থাকে। আগের সেই প্রাণোচ্ছল মিলি যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। মেয়ের চিন্তায় চিন্তায় সালমা বেগমও কেমন যেন হয়ে গেছেন। সোবহান সাহেব শুধু মনে মনে সব ঠিক হয়ে যাওয়ার প্রার্থনা করেন।

.কিছুদিন পর সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে সোবহান সাহেব প্রচণ্ড অবাক হলেন। আজ ঠিক কতদিন পর মিলি এত সকালে উঠেছে তিনি মনে করতে পারলেন না। আরও অবাক হলেন এই দেখে যে সে নতুন একটা শাড়ি পরেছে, হালকা করে সেজেছে। মুখটাও হাসি হাসি। অনেকদিন পর মিলিকে বেশ প্রাণবন্ত দেখাচ্ছে। দেখে বড় ভালো লাগছে সোবহান সাহেবের। কোথাও যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে মিলি। কিন্তু কোথায় যাচ্ছে সোবহান সাহেব বুঝতে পারলেন না। তিনি এগিয়ে গিয়ে বললেন, “আমি তো চোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না রে মা! তোকে এতদিন পর এভাবে দেখব ভাবতেই কী যে ভালো লাগছে! কোথাও যাওয়া হচ্ছে বুঝি?”

মিলি মৃদু হেসে বলল, “বাবা, চিন্তা করে দেখলাম আমি যেভাবে সবকিছু থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে বাঁচতে চেয়েছিলাম সেভাবে বেঁচে থাকা মানে সত্যি সত্যিই হেরে যাওয়া। আমি হেরে যাওয়া জীবনের গল্প লিখতে চাই না। তুমি আমাকে লড়াই করতে শিখিয়েছো। আমি লড়াই করেই জয়ের আনন্দে ভাসতে চাই। অনেকগুলো দিন শুধু শুধু নষ্ট করে ফেললাম। আর না। আজ একটা বাচ্চাদের স্কুলে জয়েন করতে যাচ্ছি। আমি মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাই বাবা।”

সোবহান সাহেব মিলির হাত ধরে বললেন, “শুভ জন্মদিন, মা।”

মিলি অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে বলল, “আজ তো আমার জন্মদিন না বাবা। তুমি সেটা ভালো করেই জানো।”

সোবহান সাহেব মিলির মাথায় হাত রেখে বললেন, “মা রে, সবসময় আমাদের শারীরিক জন্মই হয় না, মাঝে মাঝে আমাদের চেতনারও জন্ম হয়। আজ তোর নতুন চেতনার জন্ম হয়েছে। তাই তোকে শুভেচ্ছা জানিয়ে আবারও বলছি, শুভ জন্মদিন।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here