গল্পঃ নিঃসঙ্গতার চাদর

লেখাঃ তানভীর তূর্য

জানালার পাশেই কৃষ্ণচূড়া গাছটায় কয়েকটা কাক বিকট স্বরে ডেকে যাচ্ছে। সকাল সকাল শফিকের ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। সে মনে করেছিল আজ ছুটির দিন অফিসে যাওয়ার তাড়া নেই তাই একটু আরাম করে ঘুমাবে। কিন্তু তা আর হলো না। রান্নাঘর থেকে খুটখাট আওয়াজ আসছে। তারমানে মিলি নাশতা বানানো শুরু করে দিয়েছে। টুকুন বাবু গুনগুন করে পাশের ঘরে কোন একটা কবিতা মুখস্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। শুনতে বেশ ভালোই লাগছে। ছেলেটা যখন গুনগুন করে পড়ে তখন মাঝে মাঝে শফিকও বহু বছর আগের কোনো এক কাকডাকা ভোরে অথবা কোনো এক গোধূলি রঙ  মাখা সন্ধ্যায় কোনো একটা বইয়ের পাতায় হারিয়ে যায়। মা পাশে বসে সেলাই মেশিনে সেলাই করতো আর বার বার বলতো, “টুটুল সোনা জোরে জোরে পড়। জোরে জোরে না পড়লে পড়া মুখস্ত হয় না বাবা। তুই যখন পড়িস শুনতে বড্ড ভালো লাগে।”

শফিক তখন মায়ের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে নিয়ে মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে পড়তো।

এখন কেউ আর তাকে আদর করে টুটুল সোনা বলে ডাকে না। শহুরে পোশাকি নাম শফিক আহমেদের আড়ালে আজ হারিয়ে গেছে সেই টুটুল।  তারপরেও শত ব্যস্ততার আড়ালে টুটুল কখনও কখনও শফিকের স্মৃতিতে খুব কাছে চলে আসে। শফিক তাকে ধরতে চেষ্টা করে কিন্তু খুব সহজে ধরা দেয় না। তার বদলে ধরা দেয় কিছু অপ্রকাশিত দীর্ঘশ্বাস যা একান্তই শফিকের। কেউ কখনও দেখবে না কখনও জানবে না এমনকি মিলিও না।

শফিক পাশ ফিরে চোখ বন্ধ করে আবার ঘুমানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু সে জানে তাতে কোনো লাভ নেই। মিলি এক্ষুনি এসে তাকে ডেকে তুলে বলবে, “যাও টুকুনকে একটু অংক করাও। তারপর নাশতা করে বাজার যাও।”

মিলির মতে প্রত্যেক বাবাদের উচিত প্রতিদিন অন্তত পাঁচ মিনিট করে হলেও ছেলেমেয়েদের নিয়ে পড়াতে বসা। বাবাদের শাসন ছাড়া নাকি ছেলেমেয়েরা মানুষ হয় না।

শফিকের কখনও বলা হয় না যে, “মিলি তুমি তো জানো আমার জন্মের আগেই বাবা মারা গেছেন। আমি তার শাসন তো দূরের কথা তার মুখটাও দেখিনি, তাই বলে কি আমি মানুষ হইনি?”

হ্যাঁ, সমাজের আর পাঁচজনের সংজ্ঞানুসারে সে হয়তো মানুষ হতে পেরেছে। আজ ভালো একটা চাকরি করছে, স্ত্রী আর এক পুত্রকে নিয়ে দিব্যি সুখেই তো দিনগুলো পার হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মানুষ হওয়ার ধাপগুলো শফিকের জন্য মোটেই সুখকর ছিল না।

জন্মের আগেই বাবা মারা যাওয়াতে একলা হাতে মা ই তাকে অনেক কষ্টে মানুষ বানাচ্ছিল। কিন্তু ইউনিভার্সিটির প্রথম বর্ষে পড়ার সময় হঠাৎ করে মা’ও যখন দূর নক্ষত্রের মাঝে হারিয়ে গেল তখন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে মানুষ হবার আপ্রাণ চেষ্টা তাকে একাই চালিয়ে যেতে হয়েছে। মানুষ হবার সেই দিনগুলোর কথা শফিক কখনো ভুলতে পারবে না, ভুলে যাওয়ার কথাও না।

কাকেদের সভা মনে হয় শেষ হয়েছে। তাদের বিকট কা কা আওয়াজ আর নেই। শফিকের উঠতে ইচ্ছা করছে না। শধুমাত্র ছুটির দিনগুলোতেই একটু আরাম করে বিছানায় এপিঠ ওপিঠ করা যায়।

মিলি ঘরের এদিকে আসছে বুঝতে পেরেই শফিক ঘুমের ভান করে থাকলো। মিলি ঘরে ঢুকেই হাসতে হাসতে বলল, “তুমি যে ঘুমিয়ে নেই সেটা আমি ভালো করেই জানি। আমি তোমার ভান সহজেই ধরে ফেলি, তারপরেও এককাজ বার বার কেন করো বলোতো?”

শফিক চোখ মেলে মিটিমিটি হেসে বলল, “কী করে বুঝলে?”

“কারণ হলো তুমি ঘুমিয়ে থাকলে তোমার ঠোঁট দুটো সামান্য ফাক হয়ে থাকে আর তখন তুমি খুব আস্তে আস্তে নাক ডাকাও। যেহেতু কিছুই হচ্ছিল না তাই ধরে ফেলেছি, বুঝেছ। এখন ওঠো তো ওঠো।”

“উঠছি উঠছি। একটু আরাম করে ঘুমাতেও দাও না। খালি ডাকাডাকি করো। এখন কি আবার টুকুনকে পড়াতে হবে নাকি। ও তো নিজে নিজেই সুন্দর করে পড়ছিল।

“এখন মাফ, তবে রাত্রে পড়াতে হবে বুঝেছ। এখন খেয়ে নিয়ে বাজার যাও তাড়াতাড়ি।”

নাশতা শেষ করে শফিক টুকুনকে নিয়ে বাজার করতে এসেছে। শাক সবজির দাম দেখে শফিকের মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। মনে হয় চাকরি বাকরি ছেড়ে গ্রামে গিয়ে শাক সবজির চাষ করলেই ভালো হবে। কাঁচা মরিচ কিনতে যেয়ে দোকানির সাথে তার ভালোই বাকবিতন্ডা লেগে গেল। এতে মেজাজ উঠলো আরও চরমে। এর মাঝেই টুকুন বায়না ধরলো পেয়ারা খাওয়ার জন্য। শফিক ছেলেকে ধমক দিতে যেয়ে কোনো রকম সামলে বলল, “পেয়ারা কোথায় দেখলি?”

টুকুন চোখ কটমট করে বলল, “বাবা তুমি কি খুব রেগে আছ? আমার দিকে ওভাবে তাকাচ্ছ কেন? আম্মুকে যেয়ে বলে দিব কিন্তু।”

“রাগিনি তো বাবা। খুব পাকা হয়েছিস না! কই তোর পেয়ারা বল?”

“ওই যে, ওই বুড়ী মানুষটার আছে।”

শফিক একটু দূরে তাকিয়ে বেশ আশ্চর্য হলো। এক বয়স্ক মহিলা একটা ঢাকিতে করে পেয়ারা বিক্রি করছে। বয়স প্রায় ষাটের কাছাকাছি। তার আশ্চর্য হওয়ার কারণ হলো এই বাজারে কোনোদিন সে কোনো মহিলাকে কিছু বিক্রি করতে দেখেনি। এই মহিলা হঠাৎ কোত্থেকে আসলো কে জানে! শফিক ছেলেকে নিয়ে এগিয়ে গেল।

“কী ব্যাপার খালা, আপনাকে তো আগে এখানে দেখিনি।”

মহিলা একটু ইতস্তত করছে। শফিকের কেন জানি মনে হলো ইনার এসব করার অভ্যাস নেই। শফিকের একটু খারাপ লাগলো যে তার প্রশ্ন শুনে বোধহয় মহিলা অস্বস্তি বোধ করছে।

মহিলা এবার শফিকের দিকে তাকিয়ে স্মিত হেসে বলল, “আমার কথা জাইনা কী হইবো বাবা, পেয়ারা কট্টুক লাগবো তাই কও?”

শফিক ছেলের জন্য পেয়ারা কিনে বাকি বাজার শেষ করে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। কিন্তু কেন জানি বারবার ওই মহিলার শান্ত আর স্থির মুখটা তার চোখে ভাসতে লাগলো। এর কারণ শফিকের জানা নেই।

ছুটির দিনগুলো মিলির খুব আনন্দের সহিত কাটে। শফিক বাসায় থাকে, টুকুনেরও স্কুল থাকে না বলে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করে বেড়ায়। বড় ভালো লাগে মিলির। কিন্তু বাকি দিনগুলো সে বড্ড একা। যে একাকিত্ব তাকে গ্রাস করেছিল বেশ কয়েক বছর আগে শফিকের সাথে বিয়ের পর। মাঝখানে টুকুন হওয়ার পর সে একাকিত্ব কিছুটা হলেও কেটেছিল কিন্তু কিছুদিন যাবৎ টুকুন স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে বলে সে আবার আগের মতোই নিঃসঙ্গ।

বাবার সরকারি চাকুরির সুবাদে একা একা বড় হয়েছে বলে বিয়ের আগে তার প্রায়ই মন খারাপ হতো। তাই দেখে তার মা মজা করে বলতো, “মন খারাপ করিস না মা। বিয়ের পর দেখবি স্বামী, সন্তান, শ্বশুর, শাশুড়ি, ননদ, দেবর নিয়ে তোর ভরা সংসার।”

মিলিও তখন মা’র কথা শুনে মনে মনে স্বপ্নের পাহাড় সাজাতো। সে সত্যি সত্যি একটা ভরা সংসারের স্বপ্ন দেখতো। যেখানে হাসি, কান্না, আনন্দ, বেদনার কাব্য রচনা করা যেত একত্রে মিলে। যেখানে শ্বশুর বলত, “মা একটু চা খাওয়াও তো।” সে তখন দৌড়ে গিয়ে চা করতো শ্বশুরের জন্য। শাশুড়ির সাথে হাতে হাত লাগিয়ে রান্না করতো। দেবর এসে বায়না ধরে বলতো, “ভাবী কিছু টাকা দাও না।” ননদের সাথে দুষ্টু মিষ্টি খুনসুটি চলতো সবসময়। সারাদিনের অপেক্ষার ক্ষণ শেষে সন্ধ্যায় মানুষটা বাসায় ফিরলে সবাই মিলে একসাথে চায়ের আসর বসতো। কিন্তু সেসব কিছুই হয়নি।

বরং শফিকের সাথে বিয়ের পর নতুন করে গভীর একাকিত্ব মিলিকে বরণ করে নিতে হয়েছে। তারপরেও বিয়ের পর প্রথম প্রথম মিলি মনে মনে একটা কল্পনার জগৎ তৈরি করে নিতো। যে জগতে সব শূন্যতা ভাসিয়ে দেয়ার একটা চলমান পরিপূর্ণ জীবন থাকতো ওই আপনজনদের নিয়ে। সে এখন ভাবে কল্পনা হয়তো বাস্তবে বড্ড বেমানান।

সময়ের সাথে সাথে সেই জগত তৈরি করার শক্তি কখন যে মিলি হারিয়ে ফেলেছে তা সে নিজেও জানে না।

মিলি শুধু জানে এই একাকিত্ব তার একার না। এই একাকিত্বের সঙ্গী আরেকজন, শফিক। শফিকেরও সুখ দুখের একটা সুবিশাল কল্পনার জগৎ আছে। যে জগতে তার বাবা মা তাকে স্নেহ ভালোবাসা দিয়ে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রেখেছে। মিলি আরও জানে ব্যস্ততার ছুঁতোয় শফিক নিজেকে হাজার আড়াল করে রাখলেও সারাদিনে সে একবার না একবার ওই জগতে হারিয়ে যায় কিছুটা সময়ের জন্য।

শফিক একদিন মিলির হাত ধরে বলেছিল, “মিলি আমি বড্ড একা, অনেক আগে থেকেই একা। আমাকে ছায়া দিয়ে আগলে রাখার মতো কোনো বটবৃক্ষ নেই। তুমি অন্তত আমার হাতটা শক্ত করে ধরে রেখো, যেন নিঃসঙ্গতার আড়ালে কখনও আমি হারিয়ে না যায়।”

মিলির চোখে সেদিন জল এসে গিয়েছিল। প্রাণপন চেষ্টায় সেই জল শফিকের কাছ থেকে তাকে লুকাতে হয়েছিল।

মিলি ভালোবাসা আর ভরসায় শফিককে আগলে রাখে প্রতিটি মুহূর্তে। তারপরেও তারা দুজন ভেতরে ভেতরে একাকিত্ব আর নিঃসঙ্গতার যন্ত্রণায় নীল হয়ে যায় প্রতিনিয়ত। কিন্তু সেই যন্ত্রণার নীল রঙ যেন একে অপরে দেখতে না পায় তার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যায় দুজন সুনিপুণ অভিনয়ে।

রহিমা বেগম নামের এক সামান্য পেয়ারা বিক্রেতা মহিলার জন্য যে মায়া আর ভালোবাসা শফিক অনুভব করেছে তার উৎস কোথায় সে তা জানে না। এই অচেনা মায়ায় তাকে টেনে নিয়ে গেল রহিমা বেগমের বস্তির ছোট্ট ঘরে, একদিন সন্ধ্যা বেলা।

শফিককে দেখে রহিমা বেগম খুব আশ্চর্য হয়ে বলেছিল, “গরীবের দিন ক্যামনে কাটে তাই দেখতে আইছ বাবা।”

শফিক এর কোনো উত্তর দিতে পারেনি। সেদিন শফিক শুধু শান্ত আবরণের আড়ালে ক্ষত বিক্ষত হওয়া এক বিধবা নারীর সংগ্রামের গল্প শুনেছিল। আরও শুনেছিল, বিদেশে কাজে যেয়ে হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়া এক সন্তানের জন্য অপেক্ষারত মায়ের গল্প। শফিক বুঝেছিল রহিমা বেগমও তার মতোই নিঃসঙ্গ। আর তাই তো একাকিত্বকে আপন করে নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।

পেয়ারা কেনার ছুঁতো নিয়ে অজানা অচেনা মায়ায় শফিককে প্রতিদিন অফিস যাওয়ার আগে টেনে নিয়ে যেতে লাগলো নিঃসঙ্গতায় ডোবা এই মাতৃমূর্তির কাছে।

শফিকের কাছ থেকে রহিমা বেগমের গল্প শুনে মিলি বুকের ভেতরে একটা অদ্ভুত শূন্যতা অনুভব করেছে। মিলি চায়নি এ শূন্যতা শফিক দেখুক। কিছুদিন যাবৎ সে লক্ষ্য করছে শফিক কেমন যেন একটু অন্যমনস্ক। কিন্তু যখনই ওই মহিলার কথা উঠছে তখন শফিককে উচ্ছল আর প্রাণবন্ত দেখাচ্ছে। এইতো গতকালই টুকুন বলছিল, “আচ্ছা বাবা তুমি যখনই আমাকে বাজারে নিয়ে যাও তখন আমি কিছু বলার আগেই ওই বুড়ি মানুষটার কাছ থেকে পেয়ারা কিনতে যাও কেন?”

শফিক একটু রেগে গিয়ে বলে, “ছি বাবা! বুড়ি মানুষ কী কথা। ওভাবে বলতে নেই।”

“ঠিক আছে বাবা আর বলবো না। বাবা, ওই পেয়ারাগুলো তো মিষ্টিই থাকে তুমি বলো কেন যে, খালা পেয়ারা তো কচি একটু টক টক লাগছে?”

মিলিও কৌতূহলি হয়ে বলে, “কী ব্যাপার, ঘটনা কী?”

শফিক তখন খুশি খুশি গলায় বলে, “মিলি আসলে উনি উনার নিজ গাছেরই পেয়ারা বিক্রি করেন কিন্তু কখনও একটা মুখে দিয়ে দেখেন না। কারণ একটা খেয়ে নিলেই লস। তাই একটু পয়সার জন্য পুরোটাই বিক্রি করে দেন। আমি এটা বুঝতে পেরে একটা বুদ্ধির খেলা খেলি। আমি মিথ্যা দিয়ে বলি, খালা পেয়ারা তো টক লাগছে। এর ফলে উনি পেয়ারা মুখে দেন। আর বলেন, কই বাবা মিঠাই তো আছে।

আসলে মিথ্যা বলে এই সুযোগটাকেই আমি কাজে লাগাই। উনার কথা শুনে মিটিমিটি হাসি উনি সেটা ধরতে পারেন না। আমার খুব ভালো লাগে এই ভেবে যে, যাক একটা পেয়ারা তো উনি খেয়েছেন।”

কথা শেষ করে শফিকের চোখে মুখে একটা খুশির আভা চিকচিক করতে থাকে।

মিলির আর বুঝতে বাকি রইলো না যে শফিক এক অদৃশ্য মায়ার বাঁধনে আটকে পড়েছে। যে বাঁধনের জন্য শফিক এক তৃষ্ণার্ত সত্তাকে হয়তো লালন করছে বহুকাল ধরে।

রহিমা বেগম খানিকটা চিন্তিত। গতকাল ছেলেটা দেখা করতে আসেনি। কোনো অসুখে পড়লো না তো! একয়েক দিনেই ছেলেটার উপর কেন যেন মায়া বসে গেছে। পেয়ারা বিক্রিতে সে মন দিতে পারছে না।

হঠাৎ পাশের দোকানি মজনু মিয়া বলে উঠলো, “চাচী, রোজ রোজ ওই ব্যাটা পিয়ারা কিনার বাহানা নিয়া আইসা কিসের অত গল্প করে আপনার লগে? টাকা পয়সাআলা মানুষদের ভাবই আলাদা, বেশি পাত্তা দিয়েন না। বাড়ি গিয়া এট্টু সাহায্য চান, দ্যাখবেন ধাক্কা দিয়া রাস্তায় ফালাই দিছে।”

রহিমা বেগম মজনু মিয়ার দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বলল, “সব মানুষই কি এক রে বাবা? সবাই রে খারাপ ভাবা ঠিক না। সবাই খারাপ হইলে পৃথিবীতে কবেই রোজ হাশর হইয়া যাইতো। তহন তুমিও এইহানে বইসা আইজ তরকারি বেচতে পারতা না আমারেও আর পিয়ারা বেচতে লাগতো না, বুঝলা।”

“চাচী আরেকটা কথা হইলো, ওই বেটা রে একদিনও দেখনু না যে আপনার পিয়ারার সুনাম করছে। রোজই তো টক টক করে, তাও আপনি ওরে পাল্লা ঝুলাইয়া মাপে পিয়ারা বেশি দেন ক্যান?

“বাবারে ঘটনা হইলো, ছেলেটা বুঝতে পারে আমি আমার পিয়ারা না খাইয়া সবডা বিক্রি কইরা দিই। আমি যাতে একটা হইলেও পিয়ারা মুখে দিই সেই জন্যে ছেলেটা টক টক কইরা টকের বাহানা করে। ছেলেটার এই ভান আমি ধইরা ফেলি কিন্তু সে মনে করে আমি কিছুই বুঝি না। আমি তো মা তাই সন্তানদের ছলচাতুরি ধইরা ফেলা খুবই সহজ। ছেলেটা যাতে কষ্ট না পায় সেজন্য মুখে একটা পিয়ারা দিই। সে তহন যে খুব খুশি হয় এইটা আমি বুঝি। বড় ভালা লাগে।”

“কন কী চাচী, আপনে তো হেব্বি চালাক।”

“আর বাবা তুমি বললা না, তারে আমি মাপে বেশি দিই ক্যান? আসলে পিয়ারা মাপতে গেলে পাল্লাডা ভালোবাসাতে এমনি এমনি ঝুইলা পড়ে। সেইহানে পিয়ারার বদলে থাকে ভালোবাসা যা সবাই দেখতে পায় না। এরেই কয় মায়া এরেই কয় স্নেহ। ছেলেটা বড্ড ভালা, বুঝলা?”

মজনু মিয়া একদৃষ্টিতে রহিমা বেগম নামের মানুষটাকে দেখছে। কিছুক্ষণ সময়ের জন্য তার মনে হলো মানুষটা বদলে গেছে। এই রহিমা বেগম কে সে চেনে না। এই সামান্য মানুষটা এত বড় বড় কথা কী করে বলল সে বুঝলো না।

রহিমা বেগম হঠাৎ একটা তীব্র হাহাকার অনুভব করে আর ভাবে এত সহজেই কাউকে মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে ফেলা কি ঠিক? তারপরেও শফিককে একটু দেখার জন্য সে মনে মনে আপেক্ষা করতে লাগলো।

শফিকের অনেক জ্বর তাই অফিস যেতে পারেনি। দুপুরে এক গ্লাস পানি খেয়েই ঘুমিয়ে পড়লো। ঘুমের ভিতরে সে আশ্চর্য একটা স্বপ্ন দেখলো। সে দেখলো, স্কুল ছুটি হওয়ার পর বাড়ি এসেই চেঁচাচ্ছে মা ভাত দাও ক্ষুধা লেগেছে এই বলে। তার মা ঘরে থেকে বলল, “হাতমুখ ধুয়ে আয় টুটুল, ভাত দিচ্ছি।”

হাতমুখ ধুয়ে ঘরে এসে দেখলো তার মা ভাত বেড়ে বসে আছে। কিন্তু তার মায়ের মাথায় অনেক বড় একটা ঘোমটা। সে বলল, “তুমি ঘোমটা দিয়ে আছ কেন মা? ঘোমটা সরাও তো মুখ দেখতে পাচ্ছি না। তোমার মুখ দেখে ভাত না খেলে ভালো লাগে না।” তার মা ঘোমটা সরালো।

কিন্তু একি! এটা তার মায়ের মুখ নয়। তার বদলে সে স্পষ্ট দেখতে পেল রহিমা বেগমের মুখমণ্ডলের সেই স্থির প্রতিচ্ছবি।

শফিকের ঘুম ভেঙ্গে গিয়ে দেখল তার সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে। সে জানে তার এখন কী করা উচিত। সে তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে নেমে মিলিকে সব বলার পর হনহন করে বাইরে বেরিয়ে গেল। অসুস্থ মানুষটাকে আটকানোর সুযোগও পাওয়া গেল না। তারপরেও মিলি খুব খুশি হলো। কারন সে তার তার স্বামীকে ভালোভাবেই চেনে। সে বুঝতে পারলো শফিক এখন কী করবে। মিলিরও মনপ্রাণ চাইছিল শফিক কিছু একটা করুক।

শফিক যখন আরও একবার রহিমা বেগমের বস্তির ছোট্ট ঘরের দুয়ারে এসে দাঁড়ালো তখন লক্ষ্য করলো দিনের আলো একটু একটু করে কমছে কিন্তু গোধূলী রঙে চারপাশটা ভেসে যাচ্ছে। বহু বছর পর এই গোধূলী রঙ শফিকের বড্ড আপন মনে হলো। এ রঙ শফিকের খুব চেনা।

শফিককে দেখে রহিমা বেগম অবাক হলেও মনে মনে খুব খুশি আর নিশ্চিন্ত হলো।

শফিক তার চোখের টলমলে জল নিয়েই বলল, “আমি আপনাকে মা ডাকার অনুমতি নিব না কারণ আমি জানি আমার অনুমতি আপনি ফেলতে পারবেন না। কোনো ছেলে নিশ্চয় তার মাকে খালা বলে ডাকে না। আর কোনো ছেলে নিশ্চয় এটাও চাই যে না তার মা তার সন্তানের থেকে দূরে দূরে এই অবস্থায় থাকুক। আমি তোমাকে আজ নিতে এসেছি মা। তুমি যাবে না আমার সাথে? বটবৃক্ষ হয়ে ছায়া দিয়ে আমাকে আগলে রাখার জন্য।”

রহিমা বেগমের চোখ দিয়ে কষ্টমিশ্রিত কিন্তু আনন্দের জল গড়িয়ে পড়লো। এ জলে মিশে রয়েছে অচেনা এক সন্তানের প্রতি বুকের ভেতর থেকে উপচে পড়া এক মায়ের নির্ভেজাল ভালোবাসা আর হারিয়ে গিয়ে বহুদিন পর খুঁজে পাওয়া মাতৃত্বের স্বাদ।

রহিমা বেগম আচল দিয়ে চোখ মুছে শফিককে বলল, “তুই কি টুটুল হইয়া আমার কাছে ফিরা আইলি বাবা?”

শফিক খুব ভালোভাবে চমকাল। নিজেকে সামলে নিয়ে অবাক হয়ে বলল, “টুটুল মানে, কার কথা বলছ মা?”

রহিমা বেগম খানিকটা হাসার চেষ্টা করে বলল, “ওই যে আমার ছেলে। তোকে বলছিলাম না বাবা, বিদেশে কাজে গিয়া হারায় গেছে।”

শফিক এবার তার নতুন মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো। বহুবছর পর শফিক আজ আবার কোনো এক মায়ের স্নেহের টুটুল হতে পেরেছে। এ মাকে সে কোনোমতেই হারিয়ে যেতে দেবে না। চোখের জল আর খুব চেনা গোধূলী রঙের সাথে স্নেহ ভালোবাসা মিলিমেশে ছোট্ট ঘরটায় কিছু সময়ের জন্য যেন পৃথিবীর সুন্দরতম দৃশ্যপট রচিত হলো।

শফিকের চোখে আনন্দের পরম তৃপ্তিময় যে অশ্রু চিকচিক করছে তা সে আজ মুছবে না। এই অশ্রু তার ভিতরে অতি গোপনে বহুদিন জমা হয়েছিল। এতদিন এই অশ্রু সে মিলিকে লুকিয়ে লুকিয়ে কখনও রাতের গভীর আঁধারের মাঝে কখনও মিটমিটিয়ে জ্বলা জোনাকিদের সাথে আবার কখনও রাতজাগা কোনো পাখির দীর্ঘশ্বাসের সাথে ভাগাভাগি করে নিয়েছে। তাই সে চাচ্ছে এ আনন্দ অশ্রু আজ সবাই দেখুক। ছায়াময়ী এক বটবৃক্ষ কে সঙ্গে নিয়ে তাকে দ্রুত ঘরে ফিরতে হবে। শফিক জানে, ওইদিকে মিলিও সকল বেদনা ভাসানো আনন্দের জন্য অপার হয়ে বসে আছে।

এতদিন শফিক, মিলি এবং রহিমা বেগম নামের এক মমতাময়ী নারীর গায়ে একাকিত্ব আর নিঃসঙ্গতার যে চাদর অদৃশ্যভাবে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ছিল তা আজ অনেকখানি সরে গেছে। শফিক সেটা সরাতে পেরেছে। নিঃসঙ্গতার এ চাদর যেন নতুন করে তাদের আর কখনও জড়াতে না পারে। কখনও না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here