চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহ্য “গম্ভীরা” বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতির সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সমৃদ্ধ শাখা লোকসঙ্গীত ৷ এদেশের মানুষ যখন থেকে বাংলা ভাষা পেয়েছে তখন থেকেই লোকসঙ্গীত রচিত ও গীত হয়ে আসছে ৷ লোকসঙ্গীত সর্বজনীন ও চিরায়ত সঙ্গীত ৷ এসব সঙ্গীতের মধ্যে রয়েছে মাটির গন্ধ ও মানুষের ছোঁয়া ৷ গ্রাম বাংলার মানুষের জীবনের কথা, সুখ দুঃখের কথা ফুটে ওঠে লোকসঙ্গীতে ৷ বাংলা লোকসঙ্গীতে বিভিন্ন ধারার গানের পরিচয় পাওয়া যায় ৷ সে সব ধারার মধ্যে গম্ভীরা এক জনপ্রিয় ধারা ৷

উৎপত্তি


লোকজ সংস্কৃতির অন্যতম উপাদান গম্ভীরা গান। এ গানের শেকড় অতি প্রাচীন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের মাটিতে প্রোথিত। বিভিন্ন বইপত্র থেকে জানা যায়, প্রায় ২শ’ বছর আগে অবিভক্ত বাংলার মালদহ জেলা হালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলাধীন মনাকষা গ্রামে নরসুন্দর (নাপিত) বোনাকানা এই গম্ভীরা গানের উদ্যোগতা । যা তারও পূর্বে শিব বন্দনা নামে পরিচিত ছিল। বোনাকানার গম্ভীরা সেই সময় গোটা মালদহ জেলায় সম্প্রসারিত হয়েছিল। এর মধ্যে বেশি সম্প্রসারিত হয়েছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ভোলাহাট উপজেলায়। অর্থাৎ চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ ও ভোলাহাট উপজেলাই হচ্ছে গম্ভীরা গানের পীঠস্থান বা মূল শেকড়। গম্ভীরা শব্দ নিয়ে নানা ধরনের মতবাদ আছে। এর ভিতরে উল্লেখযোগ্য মতবাদগুলো হলো― ১. হিন্দু পৌরাণিক দেবতা মহাদেবের অপর নাম গম্ভীর। মধ্যযুগে গম্ভীরা বলতে বিশেষ ভাবে শিবের মন্দির বুঝানো হতো। কিন্তু বাস্তবে গম্ভীরা নামক কোনো মন্দিরকে কেন্দ্র করে কোনো পূজা ও উৎসবের আয়োজন করা হতো না। বহু আগে থেকে উত্তরবঙ্গে চৈত্র সংক্রান্তিতে চড়কপূজা, শিবের নৃত্য ইত্যাদির প্রচলন ছিল। এই কারণে উত্তরবঙ্গের কোথাও কোথাও শিবকে গম্ভীরা বলা হতো। এই শিবের গাজনের (গাজন: ধর্মমঙ্গলের কাহিনী থেকে জানা যায় রানী রঞ্জাবতী ধর্মকে তুষ্ট করার লক্ষ্যে গাজন উৎসবের প্রচলন করেন)। বাঙালিরা ছাড়াও কোচ, রাজবংশী, পলিয়া এবং মাহালী , হাঁড়ি, বাগদী, কেওট, নুনীয়া, চামার, পোদ নাগর, ধানুক চাঁই, তুড়ী ইত্যাদি সম্পদায়ও এই পূজা করতো। এই সূত্রে যে গীত রচিত এবং পরিবেশিত হতো, তাই কালক্রমে গম্ভীরা নামে পরিচিতি লাভ করেছিল।

চীনা পরিব্রাজক হিউ এন সাংয়ের বিবরণীতেও এই উৎসবের তথ্য মিলেছে । আর এই গম্ভীরা উৎসব থেকেই সৃষ্টি হয়েছিল গম্ভীরা নৃত্য ও গম্ভীরা গান। ২. বিহারে গাওহার বৃক্ষ, উত্তরবঙ্গে গাম্ভীর নামে অভিহিত হয়। শিবপূজায় এই কাঠের পিঁড়ি ব্যবহৃত হতো। সেখান থেকে গম্ভীরা নামটি এসেছে এমনটা কেউ কেউ দাবি করেন। বঙ্গদেশে বৌদ্ধযুগের শেষে হিন্দু ধর্মের পুনরভ্যুত্থান ঘটে। এই সময় বুদ্ধ মূর্তির আদলে শিব মূর্তি তৈরি হওয়া শুরু হয়। শিবের মন্দির প্রতিষ্ঠা এবং শিবপূজার ব্যাপক প্রচলনের সূত্রে সৃষ্টি হয়েছিল শৈবধর্ম। বাংলায় পাল রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর, হিন্দু ধর্মের উত্থান শুরু হলে, শৈবধর্ম সুদৃঢ় অবস্থানে চলে আসে। গোড়ার দিকে হিন্দু তান্ত্রিকবাদ এবং শৈববাদের ভিতর দ্বন্দ্ব ছিল। সে সময় শৈবধর্মের অঙ্গ হিসেবে বিভিন্ন অঞ্চলে শিবের গান প্রচলিত হয়। এই গান আঞ্চলিকতার বিচারে গাজন, নীল, গম্ভীরা নামে পরিচিতি লাভ করে। গোড়ার দিকে এই সকল গানের প্রধান উপকরণ ছিল শিববন্দনা। কালে কালে আঞ্চলিক ভাবনা, আর্থ-সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষিতে শিব-সঙ্গীত আঞ্চলিক সংস্করণ নানারূপ লাভ করে। পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলা এবং তৎসংলগ্ন অঞ্চলে এই গানের নাম হয় গম্ভীরা, উত্তরবঙ্গ এবং পশ্চিমবঙ্গের অঞ্চল বিশেষ গাজন এবং পূর্ববঙ্গে এর নাম হয় নীল।

প্রকারভেদ


আদিতে গম্ভীরা ছিল দুপ্রকার, আদ্যের গম্ভীরা ও পালা-গম্ভীরা। দেবদেবীকে সম্বোধন করে মানুষের সুখ-দুঃখ আদ্যের গম্ভীরার মাধ্যমে প্রকাশ করা হতো। কখনও কখনও সারা বছরের প্রধান প্রধান ঘটনা এ গানের মাধ্যমে আলোচিত হতো। পালা-গম্ভীরায় অভিনয়ের মাধ্যমে এক একটা সমস্যা তুলে ধরা হতো। চৈত্র-সংক্রান্তিতে বছরের সালতামামি উপলক্ষে পালা-গম্ভীরা পরিবেশন করা হতো।

পরিবেশনা রীতি


গম্ভীরা গান পরিবেশন (ছবি: বাংলাপিডিয়ার সৌজন্যে)

গম্ভীরা গানে সমসাময়িক বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরা হয় এবং তার সমাধানও বলে দেওয়া হয়। পূর্বে গম্ভীরা গানের আসরে শিবের অস্তিত্ব কল্পনা করা হতো। বর্তমানে শিবের পরিবর্তে ‘নানা-নাতি’র ভৃমিকায় দুজন অভিনয় করে। তাদের সংলাপ ও গানের মধ্য দিয়ে দ্বৈতভাবে গম্ভীরা গান পরিবেশিত হয়। আঞ্চলিক ভাষায় রচিত সংলাপ ও গানের মাধ্যমে কোনও একটা বিষয় তুলে ধরা হয়। গানের একটি ধুয়া থাকে, সংলাপের ফাঁকে ফাঁকে গানগুলি ধুয়ার সুরে গীত হয়। এভাবে নানা-নাতির নাচ, গান, কৌতুক, অভিনয়, ব্যঙ্গ প্রভৃতির মাধ্যমে গম্ভীরা গানে সমাজের দোষ-ক্রটি তুলে ধরা হয়। এ সময় তাদের বাকচাতুরী, উপস্থিত বুদ্ধি এবং অঙ্গভঙ্গি সকলকে মুদ্ধ করে।

গম্ভীরার বিকাশ ও বর্তমান অবস্থা


অতীতের গম্ভীরা পরবর্তীতে স্বতন্ত্র রূপ লাভ করে। মূলত প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেশিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তনের পর লোকসমাজের রুচির তাগিদে সামাজিক লোকনাট্যের রূপ নিয়েছে গম্ভীরা গান ৷ ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের ফলে মালদহ থেকে বহু মুসলমান নবাবগঞ্জ অঞ্চলে এসে বসবাস শুরু করেন। প্রকৃতপক্ষে তাদের মাধ্যমেই নবাবগঞ্জ ও তার আশেপাশের অঞ্চলে গম্ভীরা গানের প্রচলন ঘটে। এ অঞ্চলে গম্ভীরা প্রবর্তনকারী দের মধ্যে যারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলো তাদের মধ্যে শেখ সফিউর রহমান ওরফে সফি মাস্টার, গুমানী বিশ্বাস, সোলাইমান, মোক্তার, মহসীন আলী, ওয়াজেদ আলী, ফজলুর রহমান, তৈয়ব আলী, লূৎফল হক, মনিমুল মাস্টার প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। স্বীয় গম্ভীরা গান লোক সাহিত্যের এক সম্পূর্ণ সম্পদ। স্বাধীনতার কিছুকাল আগে গম্ভীরার পুনর্জন্ম দিয়েছিলেন ও প্রাণ সঞ্চার করেছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুরে ডাক বিভাগের কর্মচারী সফিউর রহমান মাস্টার (সুফি মাস্টার)। যাকে বলা হত গম্ভীরার ওস্তাদ। এরপর গোটা জাতির কাছে গম্ভীরার আবেদন পৌঁছে দিয়েছিলেন বিখ্যাত গম্ভীরার নানা কুতুবুল ও গম্ভীরার নাতি রাকিবুল। তারা চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের কৃতি সন্তান। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর পরই কুতুবুল রাকিবুল গম্ভীরাকে যেমন জাতীয় সম্মান এনে দিয়েছিলেন তেমনি চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষাকে দেশবাসীর কাছে পরিচিত করে দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয় নাটোরের উত্তরা গণভবনে তাদের চমৎকার গম্ভীরা পরিবেশনায় মুগ্ধ হয়েছিলেন প্রয়াত বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান। গম্ভীরা শেষে বঙ্গবন্ধু জুটিদ্বয়কে বুকে জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গন করেছিলেন ও উৎসাহিত করেছিলেন গম্ভীরাকে গতিশীল করার জন্য। যদিও তার সামনেই তৎকালীন প্রশাসনের দুর্নীতি, অপকর্ম ও অন্যায়ের কথাই গম্ভীরায় প্রকাশ হয়েছিল। তার পরেও বঙ্গবন্ধু যে কোন সরকারই ও জাতীয় পর্যায়ে গম্ভীরা গান পরিবেশনে সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন। জাতি পুনর্গঠনে জনগণকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে তার নির্দেশে গম্ভীরা গানের মাধ্যমে ৮টি ডকুমেন্টারি তৈরি করে বিভিন্ন পেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হয়েছিল।

কুতুবুলের অকাল মৃত্যু হলে রকিবুল, বীরেন, মাহাবুব, মানি গম্ভীরার হাল ধরেন এবং মাহাবুব মানি জুটিই অদ্যবধি গম্ভীরার প্রাণ সঞ্চার করে রেখেছেন। তারাও জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গম্ভীরা পরিবেশন করে দেশব্যাপী সুনাম অর্জন করেছেন। এখনও তারা সেরা জুটি হিসেবে বিবেচিত। এরপর বেসরকারি সংগঠন প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি গম্ভীরাকে তথা শিল্পী ও কলাকুশলীদের জন্য পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ২০০৭ সাল থেকে প্রয়াস তার নিজস্ব উদ্যোগে গঠিত ১৫ সদস্য বিশিষ্ট টিমের মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমে সচেতনতামূলক কর্মসূচিকে গম্ভীরার মাধ্যমে প্রকাশ করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। গম্ভীরাকে স্থায়িত্ব দেয়া এবং শিল্পী কলাকুশলীদের জীবন ধারণের জন্য নির্দিষ্টহারে বেতন ভাতার ব্যবস্থা করেছে। যা এখনও অব্যাহত আছে। ২০০৮ সালে গম্ভীরা প্রতিযোগিতায় প্রয়াস টিম ১ম স্থান অধিকার করে। প্রয়াসের গম্ভীরা গানগুলো আমেরিকান রাষ্ট্রদূত ডব্লিউ.ডি.মাজিনা কে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল। তাই তিনি ২০১২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জে আসেন এবং সন্ত্রাস (Violence) বিষয়ে সতর্কতামূলক ডকুমেন্টারি করিয়ে নেন। যা রাজশাহী ও চট্টগ্রামের মানুষের মাঝে প্রদর্শন করা হয়। প্রয়াস গম্ভীরার মধ্যে নতুন একটি বিষয় সংযোজন করে। তা হচ্ছে নানা নাতির কোন কোন ক্ষেত্রে মুখে যা বর্ণনা করতে যে সময় নেই সেটা অল্প সময়ে Visual এর মাধ্যমে প্রকাশ করার পদ্ধতি গ্রহণ করে। এদিকে ‘দিয়াড়’ নামে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ভিত্তিক একটি জাতীয় সাংস্কৃতিক-সামাজিক সংস্থা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুল তলায় ২০১৭ ও ২০১৮ সালে দু’বার গম্ভীরা উৎসবের আয়োজন করে। সেখানে ১০টি দল অংশগ্রহণ করে বিভিন্ন আঙ্গিকে তাদের নৈপুণ্য প্রদর্শন করে জাতীয় পর্যায়ে তাক লাগিয়ে দেয়। এ উৎসব উপলক্ষে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিখ্যাত কালাইয়ের রুটি ভোজনসহ একটি সুন্দর ম্যাগাজিন বের করে। এতে বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাট্যকার মমতাজ উদ্দীন, কার্টুনিস্ট রফিকুন্নবীসহ অনেকেই বাণী প্রদান করেছেন ও এ লোকজ সঙ্গীতকে গতিশীল করার জন্য আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করেছেন। ‘দিয়াড়’ গম্ভীরার সর্বোচ্চ বিকাশের জন্য কাজ করে যাবে বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। গম্ভীরা নিয়ে ৪টি গবেষণা গ্রন্থের উল্লেখ পাওয়া যায়। ৪ জন লেখকই চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও মালদহবাসী। এর মধ্যে রয়েছে হরিদাস পালিতের লেখা ‘আদ্যের গম্ভীরা’, ড. প্রদ্যুত ঘোষের লেখা ‘লোক সংস্কৃতি গম্ভীরা’, তাসাদ্দুক আহমেদের লেখা ‘লোক সঙ্গীত গম্ভীরা’ এবং ড. মাযহারুল ইসলাম তরু সম্পাদিত ‘হাজার বছরের গম্ভীরা’।

তবে মনে করা হয় লোকসঙ্গীতের এই ধারা বর্তমান কালের মত তার ভবিষ্যতেও তার অবস্থান অক্ষত রাখবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here