কোভিড- ১৯  এ আফ্রিকান-আমেরিকানরা অন্য কোনও জাতির চেয়ে বেশি মারা যাচ্ছে। আর এটি সবচেয়ে বেশি আমেরিকার দক্ষিন অংশে। যেমন লুইসিয়ানাতে কৃষ্ণাঙ্গদের মৃত্যু ৭০ শতাংশ যা ঐ রাজ্যের জনসংখ্যার ৩৩ শতাংশ। আলাবামায় কৃষ্ণাঙ্গদের মৃত্যু ৪৪ শতাংশ এবং জনসংখ্যার ২৬ শতাংশ। আর এই প্যাটার্নটি আমেরিকার উত্তর অংশেও একই, যেখানে শিকাগো এবং মিলওয়াকির মতো শহরেও আফ্রিকান-আমেরিকান জনসংখ্যার উচ্চ সংক্রমণ এবং মৃত্যু হার রয়েছে। এখন স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন আসতে পারে, কেন এত কৃষ্ণাঙ্গ মারা যাচ্ছে?

যার উত্তর হিসাবে ফেডেরাল কর্মকর্তারা কৃষ্ণাঙ্গদের আচার আচরণ কে দায়ী করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। উদাহরণ হিসাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সার্জন জেনারেল জেরোম অ্যাডামস, যিনি আফ্রিকান-আমেরিকান, কৃষ্ণাঙ্গ “মদ, তামাক এবং মাদক এড়িয়ে” চলার জন্য অনুরোধ করেছেন ভাবটা এমমন যেন মদ, তামাক বা মাদক শুধু কৃষ্ণাঙ্গদের সমস্যা, অন্য কেউ এগুলো গ্রহন করে না। আসলে সত্যিকার অর্থে, করোনভাইরাস মহামারীতে কৃষ্ণাঙ্গদের সংক্রমণ এবং মৃত্যু আধিক্য বর্ণগত বৈষম্যের সাথে সম্পর্কিত। প্রাসঙ্গিক উদাহরণ হিসাবে কৃষ্ণাঙ্গদের চাকরি ক্ষেত্রগুলি দেখলেই বোঝা যাবে। কালো আমেরিকানরা সবসময় রহস্যজনকভাবে সেবা খাতে চাকরি পেয়ে থাকে। অন্যদিকে তাদের চাকরি বা জীবনমানের কারণে নিজস্ব গাড়ি বা বাড়ীর মালিক হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। আবার কালো আমেরিকানরা এমন কাজ করে, যে ধরণের কাজে অন্য লোকের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের সম্ভাবনা রয়েছে।

আজকের এই স্বাস্থ্যের বৈষম্যগুলি বিগত সময়ের সুযোগের বৈসাদৃশ্য থেকে সরাসরি প্রভাবিত হয়েছে। আফ্রিকান-আমেরিকানদের পরিষেবা খাতের কাজের ক্ষেত্রে নিয়োগ এবং জাতিগতভাবে শ্রম বাজারের সবচেয়ে নিচের ধাপে কাজ করার কারনে তারা অর্থনৈতিকভাবে অনেক নীচে চলে এসেছে। যাতে করে তাদের বাড়ীর মালিক হওয়ার সম্ভাবনা কমে গেছে, আর সরকারী আবাসনে তো বৈষম্যের ইতিহাস প্রতিফলিত হয়ে আসছে। ফলাফলে কালো আমেরিকানরা কোভিড- ১৯ ভাইরাস এ আরও মারাত্মক ভাবে ভোগার সম্ভাবনা বেড়ে গেছে। কারণ এই সব বৈষম্যের কারনে তারা ঘনবসতি, দারিদ্রতা ইত্যাদির স্বীকার বেশী হয়েছে।

আর কোভিড- ১৯ ভাইরাস এ ঘনবসতি এবং নিন্ম জীবনমান তো সংক্রমনের এক অনস্বীকার্য নিয়ামক। আসলে এই বর্ণগত বৈষম্য এর ধারনা কোনও ভুল ধারনা নয়, আবার এটি সিস্টেমের কোনও ত্রুটিও নয়। এটি আমেরিকান পুঁজিবাদের চরিত্রকে প্রতিবিম্বিত করে এবং এটিই একমাত্র জিনিস যা ইতিহাসে বার বার পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে। ১৯ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে আমেরিকান পুঁজিবাদ একটি বিদ্যমান সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে বেড়ে উঠেছিল। হোয়াইট বা সাদাদের আধিপত্য ছিল সেই ব্যবস্থাগুলির মধ্যে একটি। গৃহযুদ্ধ দাস সমাজকে হয়ত ধ্বংস করে দিতে পেরেছিল, তবে বর্ণবাদী শ্রেণিবিন্যাস যা তখনকার সমাজের কেন্দ্রবিন্দু ছিল, পরবর্তীকাল বিশেষত সামাজিক এবং অর্থনৈতিক জীবনকে মূলত পুনর্গঠন করার জন্য বর্ণবাদী একটি ধারা ভেতরে ভেতরে টিকে ছিল। যা বর্তমানে পুঁজিবাদি মহীরূহে পরিণত হয়েছে এবং আফ্রিকান-কালোরা সেই সুপ্ত বর্নবাদী চিন্তার ফসল হিসাবে পরিগনিত হচ্ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কালো শ্রমিকদের সর্বনিম্ন হিসাবে চিহ্নিত করা হত, হোক সে অংশীদারিত্ব ও গার্হস্থ্য কাজের বা হোক সে শিল্প শ্রমিক।

ঐতিহাসিক চার্লস এইচ ওয়েসলি ১৯২৭ সালে “আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের নিগ্রো শ্রম” বইতে লিখেছেন, “শিল্প এবং কারখানা ব্যবস্থা আসার সাথে সাথে, সামাজিক কোড যা কালোদের শ্রমকে হ্রাসকারী কারণ হিসাবে তৈরি করেছিল, এবং কালোরা পড়ে গিয়েছিল জীবন মানের সবচেয়ে নিচের ধাপে”।

এখানে উল্লেখ্য যে, ১৯২৫ সালের দিকে কারখানায় কাজ সাদাদের জন্য ছিল সম্মানজনক এবং বিশেষ কাজ হিসাবে বিবেচনা করা হত। অন্যদিকে কালোরা ছিল নিকৃষ্ট শ্রমিক। যা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, যুক্তরাষ্ট্রে যেমন এর বিকাশ ঘটেছিল, তেমন শিল্প পুঁজিবাদে শ্বেতাঙ্গরা প্রভাবশালী সামাজিক গোষ্ঠী হিসাবে একটি বর্ণপ্রথা চালু করেছিল ছিল। এটি কেবল কুসংস্কারের বিষয় ছিল না, যেমনটি দাসপ্রথার সময় ছিল।

তখনকার সময়ে এটাও ছিল না যে শ্বেত শ্রমিকদের জীবন বিশেষত খুব ভাল ছিল, তবে কৃষ্ণাঙ্গরা সামাজিকভাবে হেয় এবং ব্যাপকভাবে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার স্বীকার এবং রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা থেকে শুরু করে অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হত। যদিও তারা শহরে বাস করত তবে কৃষ্ণাঙ্গদের সবচেয়ে নিম্নমানের আবাসস্থলসহ স্যানিটারি সেবাগুলো থেকে কৃষ্ণাঙ্গদের সরিয়ে দেওয়া হত; এমনকি কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তির যদি দক্ষতা থাকে বা কোনও নৈপুণ্য থাকত তারপরও তাদেরকে সরিয়ে দেওয়া হত, বৈষম্য এতটাই প্রকট ছিল যে যদি কৃষ্ণাঙ্গরা আনুষ্ঠানিক শিক্ষার অধিকারীও হত তাহলেও তাদের বেশিরভাগকেই মধ্যবিত্ত পেশা থেকে বিরত রাখা হত।

আমরা যখন নতুন চুক্তির যুগে পৌঁছালাম তখন পুঁজিবাদী বৈষম্যের বর্ণগত বৈষম্য – বিভক্ত শ্রমবাজার, কর্মসংস্থান, আয় এবং শিক্ষায় জাতিগত বৈষম্য বিস্তার লাভ করেছে। ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকরা এই সংকট সমাধানের জন্য যেমন কাজ করেছিলেন, তারা সেই ভিত্তিটি তৈরি করেছিলেন তবে এই বৈষম্যগুলিকে দূর করার পরিবর্তে আরও গভীর করে ফেলেছিলেন। বিদ্যমান বৈষম্যের উপর ভিত্তি করে, ফেডারাল নীতিনির্ধারকরা উত্তরের শহরগুলিকে আরও বিচ্ছিন্ন করে দেয় এবং চাকরি এবং সুযোগ থেকে আলাদা করে দেয়। একই সাথে, রাষ্ট্রীয় ভর্তুকিযুক্ত শিক্ষা, স্বল্প সুদের গৃহঋণ সিস্টেমের মতো নীতিগুলি নৃগোষ্ঠী ইউরোপীয়দের একটি শ্রমজীবী শ্রেণিকে শ্বেত বা সাদা মধ্যবিত্তে পরিণত করতে সহায়তা করেছিল।

আপনি যদি বর্তমান আমেরিকান সমাজের সম্পূর্ণ চিত্রটি লক্ষ্য করেন তবে এটি স্পষ্ট যে কালো আমেরিকানদের কাঠামোগত অবস্থানটি শিল্পযুগের আগমনের অবসন্থান থেকে আলাদা নয়। ফলে কালো-আমেরিকানদের জীবন মান খুব একটা উন্নত হয়নি, যেটা সাদাদের ক্ষেত্রে আকাশ পাতাল পার্থক্য তৈরী করেছে। সেই সাথে কালো বা নিগ্রো আমেরিকানদের শিক্ষা, সমাজব্যবস্থা সবকিছু সেই শিল্পযুগের শুরুর সময়ের বৈশিষ্ট্য বহন করছে। এতে করে ঘনবসতি, সামাজিকতা, সরকারী দিকনির্দেশনা অমান্য করার মত ঘটনা নিত্তনৈমিত্তক ব্যাপার।ফলশ্রুতিতে করোনা  মহামারীতে সংক্রমিত এবং মৃত্যুর তালিকা দীর্ঘায়িত হচ্ছে কালোদের জন্য। আদতে কি কালো বা আফ্রিকান- আমেরিকানরাই দায়ী নাকি দায়ী একটি বর্নবাদী সমাজ ব্যবস্থা?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here