লিখা: ফাহাদ

ভাইরাস কি? প্রশ্নটির উত্তর হয়ত অনেকেই জানেন আবার অনেকে আছেন যারা ভাবেন যে তারা প্রশ্নটির উত্তর জানেন অথচ বাস্তবে হয়ত কিছু ভুল ধারনা নিয়ে বাস করছেন। সাম্প্রতিক সময়ে করোনা ভাইরাস জনিত মহামারীর বিশ্বজুড়ে বিস্তারের কারনে এই ব্যাপারে আলোচনা করা খুব ই প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। আজ সংক্ষেপে এসব ব্যাপারে কিছু আলোকপাত করার চেষ্টা করবো। প্রথম প্রশ্নের উত্তরটাই নাহয় সবার আগে জেনে নেই।

ভাইরাস একটি বিশেষ মাইক্রোঅর্গানিজম যা জীবকোষে (প্রাণি, উদ্ভিদ বা ব্যাকটেরিয়া ইত্যাদি যেকোন কোষে) বসবাস করে নিজের মাল্টিপ্লিকেশন (সংখ্যাবৃদ্ধি) এর মাধ্যমে জীবদেহের ক্ষতিসাধন করে। প্রায় সোয়া একশ বছর আগে আবিষ্কৃত হয় প্রথম ভাইরাস তামাক গাছেবসবাসকারি’টোবাকো মোজাইক ভাইরাস’। এরপর হতে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০০০ এর বেশি ভাইরাসের প্রজাতি আবিষ্কৃত হয়েছে যারা জীবজগতের সব রকম সদস্যকেই বিভিন্ন ভাবে আক্রান্ত করার ক্ষমতা রাখে। সাধারণত বেশিরভাগ ভাইরাস ইনএক্টিভ বা সুপ্ত অবস্থায় থাকে যতক্ষন কোন জীবদেহে প্রবেশ না করে। কাঙ্ক্ষিত জীবদেহে প্রবেশের সাথে সাথে ভাইরাস পোষক দেহ কে ব্যবহার করে সংক্রমন ও সংখ্যা বৃদ্ধির কাজ শুরু করে। কাঙ্ক্ষিত বলার কারন হলো নির্দিষ্ট প্রজাতির ভাইরাস শুধু তার জন্য উপযুক্ত জীবদেহে প্রবেশ না করা পর্যন্ত সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে বছরের পর বছর। ভাইরাসের বিশেষ রকম চারিত্রিক ও গঠনগত বৈশিষ্ট্যের কারনে তাদেরকে জীবজগৎ এর বাইরে সম্পূর্ণ আলাদা জগতে স্থান দেয়া হয়েছে।

ভাইরাসের শারীরতত্ত্ব জানার চেয়ে সাধারণ মানুষ এর এই ব্যাপারগুলো জানা দরকার, ভাইরাস মূলত কি করে, কেনো করে, কিভাবে করে এবং কিভাবে আমরা ভাইরাসের হাত থেকে বাঁচতে পারবো। ধাপে ধাপে আমরা তথ্যগুলো নিয়ে বলার চেষ্টা করবো এখন।

ভাইরাস মূলত পোষক দেহ ব্যবহার করে নিজের সংখ্যাবৃদ্ধি করে এবং অপর পোষক দেহে সংক্রমিত হয়ে ছড়িয়ে যায়। এই সংক্রমন ও সংখ্যাবৃদ্ধির সময় ভাইরাসের প্রভাবে পোষকদেহের ক্ষয় সংগঠিত হয়। উদ্ভিদ এর ক্ষেত্রে ভাইরাসের প্রভাবে পাতা, ফল, ফুল, ডাল বা শিকড়ের ক্ষয় হয়ে উদ্ভিদের মৃত্যু ঘটতে পারে। প্রাণিদেহে ভাইরাসের প্রভাবে জ্বর, শারীরিক দুর্বলতা থেকে শুরু হয়ে অঙ্গহানি বা মৃত্যু ও ঘটতে পারে। এমনকি ভাইরাসের ভয়াবহতার ফলে ব্যাক্টেরিয়া কোষ ও ধ্বংস হয়ে যায় অতিসহজেই।

বর্তমানে যেই নভেল করোনা ভাইরাস বা COVID-19 স্ট্রেইন এর আক্রমণে পৃথিবী জুড়ে মানবজাতি বিপর্যস্ত তা মূলত একটি বিশেষ শ্রেণীভুক্ত ভাইরাসের স্ট্রেইন (প্রকার) যে ভাইরাসগুলোস্তন্যপায়ী প্রাণী এবং পাখিকে আক্রান্ত করে। মানুষের মধ্যে করোনাভাইরাসশ্বাসনালীতে সংক্রমণ ঘটায়। এই সংক্রমণের লক্ষণ মৃদু হতে পারে, অনেকসময় যা সাধারন ঠাণ্ডা ও সর্দিজ্বরেরন্যায় উপসর্গ প্রদর্শন করে। আবার করোনা ভাইরাসের কিছু কিছুস্ট্রেইন প্রাণঘাতী হতে পারে, যেমন সার্স, মার্স এবং কোভিড-১৯। এক এক প্রজাতির প্রাণিতে ভাইরাসের লক্ষণের তারতম্য দেখা যায়। যেমন মুরগির মধ্যে এটা শ্বাসনালী সংক্রমণ ঘটায়, আবার গরু ও শূকরে এটি ডায়রিয়া সৃষ্টি করে। মানবদেহে সৃষ্ট করোনা ভাইরাস কোভিড ১৯ এর সংক্রমণ প্রতিহত করার মত কোনো ভ্যাক্সিন বা অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। আর তাই ভাইরাস টি বর্তমানে মহামারী আকারে ছড়িয়ে গিয়ে বিশ্বজুড়েআতংক তৈরি করছে। ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়েছেন সমগ্র বিশ্বের ৫ লাখ মানুষের উপরে যাদের মাঝে ২৪ হাজারের বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করেছেন।

কোভিড-১৯ বা নভেল করোনা ভাইরাস মূলত সার্স-কোভ-২ (ইংরেজি: Severe acute respiratory syndrome coronavirus 2) নামক একটি একক-সূত্র বিশিষ্ট আরএনএ ভাইরাস। এটি মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হয়ে রোগের সৃষ্টি করে। ভাইরাসটিকে প্রথম দিকে সাময়িকভাবে “২০১৯ নভেল করোনাভাইরাস” সংক্ষেপে “2019-nCoV” নাম দেওয়াহয়েছিল। সার্স-কোভ-২ ভাইরাসটির সাথে বাদুড়ের দেহে বাহিত করোনাভাইরাসগুলির ঘনিষ্ঠ বংশগত সাদৃশ্য রয়েছে এবং এগুলির কোনও একটি থেকেই হয়ত বিবর্তনের মাধ্যমে এই ভাইরাসটির উৎপত্তি ঘটেছে বলে ধারণা করা হয়। শ্রেণীবিন্যাসীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সার্স-কোভ-২ ভাইরাসটিকে গুরুতর তীব্র শ্বাসযন্ত্রীয়রোগলক্ষণসমষ্টি সৃষ্টিকারী করোনাভাইরাস (SARS-CoV) নামক ভাইরাস-প্রজাতির (species) একটি প্রকার (strain) হিসেবে শ্রেণীকরণ করা হয়েছে।

এই নতুন প্রকারের করোনাভাইরাসটিকে সর্বপ্রথম মধ্য চীনের হুপেই প্রদেশের উহান নগরীতে শনাক্ত করা হয়। এজন্য কদাচিৎ এটিকে “উহান ভাইরাস”, “উহানকরোনাভাইরাস” কিংবা “চীনা করোনাভাইরাস” নামেও উল্লেখ করা হয়েছিল। এছাড়া সার্স (Severe Acute Respiratory Syndrome) নামক কাছাকাছি একটি মারাত্মক রোগের সাথে যেন ভুল বোঝাবুঝি না হয়, সে কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের জনস্বাস্থ্যবিষয়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ভাইরাসটিকে “কোভিড-১৯ রোগের জন্য দায়ী ভাইরাস” কিংবা “কোভিড-১৯ ভাইরাস” এই নামগুলো ব্যবহার করে চিহ্নিত করছে। আমরা আমজনতাপ্রায়শই এই ভাইরাস ও তার সৃষ্ট সংক্রামক রোগ, উভয়কেই “করোনাভাইরাস” এমনকি আরও সংক্ষেপে “করোনা” বলে ডাকলেও চিকিৎসক, বিজ্ঞানী ও বেশিরভাগ সাংবাদিক সাধারণত বিশেষ পরিভাষাগুলো ব্যবহার করেন।

কোভিড ১৯ বা নভেল করোনা ভাইরাস নিয়ে কিছু ভুল ধারণা মানুষ এর মাঝে প্রচলিত আছে। সেই ধারনাগুলো দূর করার উদ্যেশ্যে এখন কিছু আলোচনা করছি।

এই মাইক্রোঅর্গানিজম নিজেকে তার চারপাশের যেকোন পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারে অতি সহজেই। তাই তাপমাত্রা কম বেশি হওয়া কিংবা ভৌগোলিক অবস্থান এর সাথে ভাইরাসে আক্রান্ত না হওয়ার কোন সম্পর্ক নেই। তাই বাংলাদেশের গরম কিংবা আর্দ্র আবহাওয়াতে এই ভাইরাস সংক্রমন করবে না এমন টি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা।

যেকোন রকম গণজমায়েত বা আড্ডা থেকেই ভাইরাস ছড়ানো বা সংক্রমিত হওয়া সম্ভব। সুতরাং ভালো আড্ডা খারাপ আড্ডা কিংবা সৃষ্টিকর্তার উপরে ভরসা করে জমায়েত হওয়া না হওয়া ইত্যাদি কোন কিছুর সাথেই ভাইরাসের সংক্রমণ না হওয়ার কোন সম্পর্ক নেই। সকল রকম জমায়েত বা পাবলিক গ্যাদারিং ই তাই ঝুঁকিপূর্ণ, তা ৫ জনের আড্ডা হোক কিংবা ৫০০ জনের সমাবেশ হোক।

যেকোন রকম জায়গায় ভাইরাসটি থাকতে পারে এবং তা যেকোন বস্তু, বাতাস বা পোশাকের সংস্পর্শের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করতে পারে।তাই শুধুমাত্র হ্যান্ডশেক বা কোলাকুলি না করলেই চলবে এবং কাওকে স্পর্শ না করে খোলা মাঠে যেয়ে শুয়ে থাকলেও ভাইরাস থেকে বাঁচা যাবে এমনটাও ভুল ধারনা।

শুধু হ্যান্ডস্যানিটাইজার বা হেক্সিসল জাতীয় এলকোহল যুক্ত এন্টিসেপ্টিক দিয়ে হাত পরিষ্কার করলেই তা বেশি কার্যকর হবে এমন টা ভাবাও সম্পূর্ণ ভুল ধারনা। সাবানে প্রচুর ক্ষার থাকে যা জীবাণু ধ্বংসে খুব ই কার্যকরী। তাই স্যানিটাইজার বা হেক্সিসলের চেয়ে সাবানা ব্যবহার করে কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড বা তার বেশি সময় ধরে ঘষেঘষে হাত পরিষ্কার করলেই তা ভাইরাস ধ্বংসেবেশি কার্যকর হবে। স্যানিটাইজার বা হেক্সিসল বাইরে ট্রাভেল করার সময় পোর্টেবলসল্যুশন হিসেবে বা ইমারজেন্সিসিচুয়েশনে সাথে সাবান না থাকলে তখন ব্যবহার করা উচিত।

কোন অঞ্চলে শুধু প্রবাসী থাকলেই সেই অঞ্চলে ভাইরাস থাকবে আর বাকি দেশের সবাই নিরাপদে থাকবে এমন টা ভাবাও ভুল। কারন এই ভাইরাস যেকোন মাধ্যম (যানবাহন, মালপত্র, খাবার, অসুস্থ মানুষ বা আক্রান্ত বাহক) এর সাহায্য নিয়ে দেশের যেকোন এলাকায় পৌঁছে যেতে পারে। তাই নিজে আক্রান্ত কিনা বা আশেপাশের মানুষজন আক্রান্ত কিনা তা ১০০ ভাগ সিউর হয়ে না জেনে বাইরে যেয়ে যেকোন রকম চলাফেরা করাই ঝুঁকিপূর্ণ।

শুধু মাস্ক আর গ্লাভস পড়লেই ভাইরাস আক্রান্ত হওয়া থেকে বাঁচা যাবে এমন টা ভাবাও ভিত্তিহীন। কেননা, গ্লাভস আর মাস্ক দৈনিক অনেকবার ধুয়ে পরিস্কার ও জীবাণুমুক্ত করে ব্যবহার করতে হবে যা আসলে পুরোপুরি সম্ভব না। এমনকি অনেক গ্লাভস আর মাস্ক একবারের বেশি ব্যবহার করাও যায়না, ফেলে দিতে হয়। তাই গ্লাভস আর মাস্ক মূলত যিনি অসুস্থ তিনি ও অসুস্থদের সেবায় নিয়োজিত ডাক্তার আর নার্স দের ব্যবহার করা বেশি প্রয়োজন। বাকিদের জন্য এই এপিডেমিকের সময়ে নিজ নিজ ঘরে অবস্থান করাই সবচেয়ে নিরাপদ।

শুধুমাত্রসর্দি, কাশি, জ্বর বা শ্বাসকষ্ট হলেই রোগী নভেলকরোনা ভাইরাস আক্রান্ত এমনটা আশংকা করা ঠিক নয়। নরমাল ভাইরাল জ্বর,  এটিপিক্যাল নিউমোনিয়া, ব্যাক্টেরিয়াল নিউমোনিয়া কিংবা সিজনাল ঠান্ডার কারণে জ্বরা ক্রান্ত হলেও অনেক সময় এসকল উপসর্গ দেহে দেখা দিতে পারে।

তাই এরকম উপসর্গ দেখতে পেলেই আতঙ্কিত না হয়ে রোগীর উচিত হবে সম্পূর্ণ হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা এবং সরকার প্রদত্ত হেল্পলাইনে কিংবা স্ব স্ব জেলার জন্য প্রদত্ত বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের নাম্বারে কিংবা জেলা হেল্পলাইনে যোগাযোগ করে পরবর্তী ইন্সট্রাকশন নেয়া।

যেই ভাইরাস সুদূর চীন থেকে উদ্ভব হয়ে ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা হয়ে আমাদের দক্ষিণ এশিয়া তে তান্ডব শুরু করার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে তা আমরা শুধুমাত্র সাবধানে চললেই প্রতিহত করে ফেলতে পারবো এমন টা ভাবাও উচিত হবেনা। যেহেতু এখনো ভাইরাসটির কোন পার্মানেন্টএন্টিভাইরাস বা ভ্যাক্সিনআবিস্কার হয়নি তাই ভাইরাস আক্রান্ত হলে এটি ঠেকানোর উপযুক্ত কোন ট্রিটমেন্টএইমুহূর্তেনেই। এমতাবস্থায় ঘরে বসে থাকা আর পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকা ছাড়া আসলেই আর কোন সমাধান নেই। নভেল করোনা বা COVID-19 ভাইরাসটিরইনকিউবেশনপিরিয়ড ১৪ দিন। অর্থাৎ আপনি আক্রান্ত হওয়ার পরে ১৪ দিনের মাঝে আপনার শরীর থেকে অন্য মানুষ এর শরীরে ভাইরাসটি সংক্রমিত হওয়ার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু ইনকিউবেশনপিরিয়ড শেষ হয়ে গেলে ভাইরাস টি আপনার শরীরে থাকলেও অন্য কাওকে আর সংক্রমিত করতে পারবেনা, ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে। আর এজন্যই বারবার সবাই কে কোয়ারেন্টাইনে বা ঘরে একেবারে আলাদা হয়ে বসে থাকতে বলা হচ্ছে কমপক্ষে ১৪ দিন। নির্দেশটি সবাই অনুসরণ করলে ১৪ দিন পরে কেউ আক্রান্ত থাকুক বা না থাকুক নতুন করে অন্য কেউ আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা চলে যাবে।

কোয়ারেন্টাইন আর হোম আইসোলেশন কিন্তু একই জিনিস নয়। হোম আইসোলেশনে থাকার অর্থ হলো যে যার নিজের ঘরে থাকা আর বাইরে বের না হওয়া। অর্থাৎ পরিবেশ হতে আইসোলেটেড হয়ে যাওয়া। অন্যদিকে কোয়ারেন্টাইন ব্যাপার টি তুলনামূলক আলাদা কনসেপ্ট। এপিডেমিকের ক্ষেত্রে “কোয়ারেন্টাইন” শব্দটা খুব স্পেসিফিক অর্থ বহন করে। মানে আপনি যদি প্রবাসী হোন কিংবা আপনার যদি করোনাপজেটিভ কারো সাথে ডিরেক্ট কন্টাক্টের ঘটনা ঘটে থাকে কিংবা আক্রান্ত কারো সাথে আপনার কন্টাক্ট হয়েছিল এমন সন্দেহ হয় তবে অনুর্ধ্ব ১৪ দিন আপনাকে একেবারেই বিচ্ছিন্ন জীবন কাটাতে হবে। ধরে নেয়া হবে আপনি একজন করোনাসাস্পেক্টেড। ১৪ দিনের মধ্যে আপনার মধ্যে করোনার লক্ষণ প্রকাশ পাবার সম্ভাবনা আছে। এজন্য আপনাকে আলাদা রুমে থাকতে হবে, আলাদা জিনিসপত্র ব্যবহার করতে হবে এমনকি ব্যবহার করতে হবে আলাদা বাথরুম। কোনোভাবেই সুস্থ কারো সংস্পর্শে আপনি আসতে পারবেন না, স্ত্রী-সন্তান কেউই না। এর ফলে আপনি কোনভাবে আক্রান্ত হলেও অপর কাওকে আক্রান্ত করার সম্ভাবনা থাকবে না। কিন্তু কোয়ারেন্টাইন কে অনেকে ছুটি উপভোগের মত ভেবে নিয়ে আলাদা না থেকে আত্মীয় স্বজনের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করে বেড়াচ্ছেন যা সম্পূর্ণই ভুল।

বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের উচিত ছিল বাংলাদেশে ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার সাথে সাথেই ১৮ কোটি মানুষ একযোগে ১৪ দিনের জন্য কোয়ারেন্টাইনে চলে যাওয়া। এর ফলে ভাইরাস কারো মাঝে থাকলেও আর ছড়ানোর সুযোগ পেতো না। কম্যুনিটি ট্রান্সমিশন (অর্থাৎ প্রবাসী বা বাইরে থেকে আসা আক্রান্ত রোগী ছাড়াও দেশে অবস্থানরত নাগরিকদের মাধ্যমে এখন ভাইরাস টি অপর নাগরিকদের মাঝে ছড়াচ্ছে) হয়ে যাওয়ার ফলে এখন ভাইরাসের আক্রমণ তীব্র আকার ধারণ করার আশংকা দেখা দিয়েছে। যত বিপদ ঘটার সম্ভাবনা থাকুক না কেন আতঙ্কিত না হয়ে আমাদের উচিত সাবধানতা অবলম্বন করে চলা। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে সুস্থ সবল ও কমবয়সী মানুষের শরীরের নিজস্ব ইম্যিউন সিস্টেম এর মাধ্যমেই আক্রান্ত ব্যক্তি সুস্থ হয়ে যেতে পারেন ১২- ১৪ দিনের মাঝেই। মূলত শিশু, বৃদ্ধ এবং অন্য কোন অসুখে (ডায়াবেটিস, উচ্চবানিন্মরক্তচাপ, রক্তশূন্যতা, শ্বাসকষ্ট, ইম্যিউনসিস্টেমের যেকোন রকম দুর্বলতা ইত্যাদি)  আক্রান্ত ব্যক্তি যার ইম্যিউন-সিস্টেম স্বাভাবিকের চেয়ে দুর্বল তারা মূলত এই ভাইরাস আক্রমনের ফলে মৃত্যু ঝুঁকিতে রয়েছেন। তবে এখনো যদি দেশের সবাই প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলেন এবং WHO কর্তৃক প্রদত্ত নির্দেশ সমূহ সঠিকভাবে মেনে চলে যে যার ঘরে অবস্থান করেন টানা কমপক্ষে দুই সপ্তাহ তাহলেও এই মহামারীজনিত ক্ষয়ক্ষতিবহুলাংশে লাঘব করা সম্ভব। করোনা ভাইরাস সংক্রমণ হতে বাঁচার জন্য World Health Organization এবং ইউনিসেফ এর পক্ষ হতে কিছু ইন্সট্রাকশন দেয়া হয়েছে অনুসরণ করার জন্য। এই ব্যাপারে বিস্তারিত পাওয়া যাবে এই লেখার নিচে ইউনিসেফ এর Via লিংক হতে।

সবশেষে কিছু ব্যাপার না বললেই নয়। যখনি আমরা মানবজাতি পৃথিবী কে বিপর্যয় এর সম্মুখীন করেছি ক্রমাগত অত্যাচারের ফলে তখনি পৃথিবীর নিজস্ব ইমিউন সিস্টেম কোন না কোন ভাবে তা সামলে নেয়ার চেষ্টা করেছে। গত প্রায় এক শতাব্দী জুড়ে মানবজাতির অত্যাচারের ফলে নির্বিচারে বিলুপ্ত হয়েছে অসংখ্য প্রাণি ও উদ্ভিত প্রজাতি, উজাড় হয়েছে বন জংগল, দূষিত হয়েছে নগর শহর দেশের আবহাওয়া, বৈশ্বিকউষ্ণায়নের ফলে ধ্বংস হচ্ছে এন্টার্কটিকার বরফ ও জীববৈচিত্র্য, বিলুপ্তির পথে আছে সমুদ্রের অনেক প্রাণি, নষ্ট হচ্ছে স্বাভাবিক বাস্তুসংস্থান, সমুদ্রের পানির উচ্চতা বেড়ে ও তাপমাত্রার বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে বিপর্যয় এর ঝুঁকিতে আছে সমগ্র গ্রহটি। আর এমন সময়েই এই করোনা ভাইরাসের আবির্ভাব যা সৌরজগতে রাজত্ব চালিয়ে বেড়ানোমানবজাতিকেও বন্দী করে ফেলেছে ঘরের চারদেয়ালে। আর মানুষ এর এই অনুপস্থিতিতে আস্তে আস্তে পরিবর্তন হচ্ছে পৃথিবীর জলবায়ু অনেক জায়গাতেই। আমাদের দেশেও মানুষ এর আনাগোনা কমে যাওয়ার পরে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের কাছে এত বছরে প্রথমবারের মত দেখা গিয়েছে ডলফিনের আনাগোনা, ঢাকায় কমে গিয়েছে বায়ুদূষণের পরিমান, শহরাঞ্চলগুলোয় বছরের এই সময়ের গড় তাপমাত্রা বর্তমানে অন্যান্য বছরের একই সময়ের চেয়ে অনেকাংশে কম। অর্থাৎ মানুষ এর অনুপস্থিতি ই প্রকৃতি কে পুনরুজ্জীবিত করে তুলছে দিন দিন। দিনশেষে নভেল করোনা ভাইরাসের উৎপত্তি কিভাবে তা পুরোপুরিভাবে এখনো বিজ্ঞানী রা না জানলেও মানুষ যে তার কৃতকর্মের জন্যই প্রকৃতির আদালতের কাঠগড়ায় এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছে তা আমরা বলতেই পারি। মানবজাতির উচিত এমন বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়েই পরবর্তী পৃথিবীর জন্য নিজেদের তৈরি রাখা। পৃথিবী কখনোই তার সাথে অন্যায় ও অবিচার করা মানবজাতিকে ছেড়ে কথা বলবেনা আর তাই আমাদের ও উচিত সমগ্র সৃষ্টিজগতের মঙ্গলের পথেই নিজেদের পরিচালিত করা। আর তাছাড়া কে না জানে, “জীবে দয়া করে যেই জন সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here