অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ স্প্যানিশ ফুটবল লীগ মানে “ La Liga “ এর তৃতীয় ক্লাব, শুনতে খারাপ লাগলেও যেই লীগে রিয়াল মাদ্রিদ আর বার্সেলোনার মতো জয়েন্ট ক্লাব আছে সেখানে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ এর তৃতীয় হওয়াটাই স্বাভাবিক। অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ  সব দিক দিয়ে তৃতীয় হলেও এক দিক দিয়ে কিন্তু এক নাম্বার, খালি স্পেনে এক নাম্বার না, অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ গোটা বিশ্বে এক নাম্বার। সেটা হলো আক্রমন ভাগের খেলোয়াড় এর দিক দিয়ে বা ফরওয়ার্ড এর দিক দিয়ে।

 

অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ এর লোগো
অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ ,(source: commons.wikimedia.org)

এই শতাব্দীতে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ এর মত স্টাইকার বা “ Number 9” কোন ক্লাবেরেই ছিলো না। ইতিহাস ঘুরে একটু দেখে আসা যাক তাদের বিখ্যাত ফরওয়ার্ডদের তালিকা।

অদ্রিয়ান লোপেজ (২০১১-২০১৪)

অ্যাটলেটিকোর জার্সিতে আদ্রিয়ান
অদ্রিয়ান লোপেজ , (source: commons.wikimedia.org)
তিনি অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ এর হয়ে ১৪২ ম্যাচে ২৬ গোল করেন, এই পরিসংখ্যান এক বাড়েই সাদামাটা কিন্তু তিনি কখনোই মেইন মান মানে নাম্বার নাইন হয়ে খেলেননি এবং প্রায় অর্ধেক ম্যাচে সাব হিসাবে নেমেছেন। কিন্তু অ্যাটলেটিকোর হয়ে ২৬ গোল করলেও তার গোলগুলা ছিলো ইমপ্যাক্ট গোল যেমন ২০১৪ সালে চেলসির বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নাস লীগের সেমিফাইনালে।

 

কেভিন গামেরিও (২০১৬-২০১৮)

প্র্যাকটিস করছেন গামেরিও
কেভিন গামেরিও ,(source: commons.wikimedia.org)
তিনি অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের ৮৩ ম্যাচে ২৭ গোল করেন কিন্তু এই পরিসংখ্যান দিয়ে গামেরিওকে খেলোয়াড় হিসাবে বিচার করা ঠিক হবে না। তিনি মাঠে অক্লান্ত পরিশ্রম করতেন, প্রেসিংও তিনি ছিলেন অনন্য এক কথায় হারানো বল ফিরে পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে থাকতেন এই জন্যই তো ক্লাব ম্যানেজার সিমিওনে তাকে ২৮ মিলিয়ন ইউরো দিয়ে দলে ভিড়িয়েছিলেন।

 

আলভারো মোরাটা (২০১৯-বর্তমান)

অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ এর আওায়ে জার্সিতে মোরাটা
আলভারো মোরাটা,(source: commons.wikimedia.org)
রিয়াল মাদ্রিদ,জুভেন্টাস,চেলসি এই সব বড় বড় ক্লাবের হয়ে খেলছেন মোরাটা কিন্তু তেমন সাফল্য পান নি তিনি অনেকেই তাকে বাতিলের খাতায় ফেলে দিয়ে ছিলেন,বর্তমানে তিনি চেলসি থেকে লোনে আছেন অ্যাটলেটিকোতে কিন্তু এইখানে তিনি করেছেন ৪৯ ম্যাচে ১৮ গোল অফফর্মে থাকা ফরোয়ার্ডের জন্য মোটেও খারাপ পরিসংখ্যান না। এই সিসনের অপরাজেয় লিভারপুল এর বিরুদ্ধেও গোল করেছেন তিনি। একটা এভারেজ খেলোয়াড় কেন হটাৎ করে গোল করা শুরু করছে এই ক্লাবের হয়ে এর কারণ ও থাকছে আজকের আয়োজনে।

 

মারিও মান্ডুকিছ (২০১৪-২০১৫)

হাসসসউজ্জল মারিও
মারিও মান্ডুকিছ,(source: commons.wikimedia.org)
মাত্র ১ বছর কাটিয়েছিলেন অ্যাটলেটিকোর হয়ে কিন্তু গোল করেলছিলেন ৪৩ ম্যাচে ২০ টি যা ছিল এক কথায় অসাধারণ। তার চেয়েও প্রশংসনীও বিষয় ছিলো তার ডেডিক্যাশন ও স্টামিনা। কিন্তু ক্লাব ম্যানেজার সিমিওনের সাথে বনিবনা না হওয়ায়, এক সিসন শেষ ক্লাব ছাড়েন তিনি।

 

ডেভিড ভিলা (২০১৩-২০১৪)

অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ এর হয়ে গোল উদযাপন করছেন ভিলা
ডেভিড ভিলা,(source: commons.wikimedia.org)
অতিপরিচিত একটি নাম, তিনি অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের হয়ে এক সিসন খেলে ৪৭ ম্যাচে মাত্র ১৫ গোল করেন তার মত বিশ্ববিখ্যাত ফরোয়ার্ডের জন্য বেমানান কিন্তু তিনি ক্লাবে যোগ দেয়ার পর ,১৬ বছর পর অ্যাটলেটিকো লা লিগা যেতে এবং চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে উঠে। আগের মত গোল করতে না পারলেও ভিলা তার বড় ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা দিয়ে এবং তাঁর ভার্সিটিলিটি দিয়ে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদকে অনেক সাফল্য এনে দিয়েছেন।

 

সার্জিও আগুয়ারা (২০০৬-২০১১)

 অ্যাটলেটিকোর ইয়ুথ প্রোডাক্ট
সার্জিও আগুয়ারা,(source: commons.wikimedia.org)

 

আগুয়েরোকে বিশ্ববিখ্যাত স্ট্রাইকার পরিণত করতে যেমন অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের ভূমিকা আছে, ঠিক তেমনি অ্যাটলেটিকোকে স্পেনের তিন নাম্বার ক্লাবে পরিণত করতেও আগুয়ারার ভূমিকা অপরিসীম। ২৩৬ ম্যাচে মাত্র ১০০ গোল। এই মাপের ফরওয়ার্ড এর কাছে এই পরিসংখ্যান কমই বলা যেতে পারে কিন্তু এর মূল কারণ হলো, আগুয়ারা বেশির ভাগ সময়ই সেন্টার ফরওয়ার্ড পজিশনে খেলতেন না, মূলত তিনি খেলতেন সেকেন্ড স্ট্রাইকার হিসাবে।

 

 দিয়াগো ফরলান (২০০৭-২০১১)

অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ এর লেগেন্দ
দিয়াগো ফরলান,(source: commons.wikimedia.org)
এই ক্লাবে আসার আগে ফরলান একেবারেই মাঝারি ধাঁচের খেলোয়াড় ছিলেন। এই ক্লাবের হয়ে তিনি ১৯৮ ম্যাচে ৯৬ গোল করেন মনে চোখ ধাঁধানো পারফরম্যান্স। এই ক্লাবের হয়ে তিনি লা লিগার গোল্ডেন বুট ও জিতেন দুইবার, মোটকথা তার সময়কালে তিনি ছিলেন অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের লিথাল ওয়েপন। তাকে আনকে ক্লাব লেজেন্ডেরও তকমা দিয়ে দেন।

 

দিয়েগো কোস্টা (২০০৭-২০১৪ এবং ২০১৮-বর্তমান)

পরিশ্রমী কস্টা
দিয়েগো কোস্টা,(source: commons.wikimedia.org)
১৯৬ ম্যাচে ৭৮ গোল একেবারেই সাদামাটা পরিসংখ্যান কিন্তু এই দিয়ে কোস্টাকে বিচার করা যাবে না। যারা অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের ডাই হার্ড ফ্যান তারাই জানে কোস্টার ভূমিকা কতখানি এই ক্লাবের জন্য, ২০১৩-১৪ মৌসুমে মানে যেই মৌসুমে অ্যাটলেটিকো লা লিগা যেতে কোস্টা ক্লাবের হয়ে সর্বোচ্চ ২৭ টি গোল করেন। কোস্টা হলেন বড় ম্যাচের খেলোয়াড়,বড় ম্যাচে তার পরিসংখ্যান ঈর্ষনীয়।

 

আনটানিও গ্রিজমান (২০১৪-২০১৯)

পোস্টার বয় অফ অ্যাটলেটিকো
আনটানিও গ্রিজমান,(source: commons.wikimedia.org)
দা পোষ্টার বয় অফ অ্যাটলেটিকো এই নামেই খ্যাত ছিলেন, ২৫৭ ম্যাচ খেলে ১৩৩ গোল , আসিস্টেটর কথা নাই বলি এবং গ্রিজমানের চোখ ধাধানো সেলিব্রেশন মনে এক কথায় সুপারস্টার। তিনি যখন ক্লাব ছেড়ে বার্সেলোনাতে পাড়ি জমান অনেকেই কষ্ট পেয়েছিল কিন্তু সাথে কষ্ট পেয়েছিলেন গ্রিজমান নিজেও , কিন্তু কিছু করার নাই ফুটবল এই রকমই।

 

রামদেল ফ্যালকাও (২০১১-২০১৩)

সুপারস্টার অফ অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ
রামদেল ফ্যালকাও,(source: commons.wikimedia.org)
৯১ ম্যাচ খেলে ৭০ গোল আর কিছু বলা লাগবে। এই পরিসংখ্যান সব বলে দিচ্ছে। তার নিক নাম “el tiger”, তিনি ছিলেন গোল স্কোরিং মেশিন। হাঁটুর ইনজুরি শিকার না হলে নিজেকে নিয়ে যেতে পারতেন অন্য উচ্চতায়। তার স্কিলের একটি ছোট উদারণ হলো চেলসির বিরুদ্ধে ৩৯ মিনিটের হাটট্রিক জাস্ট ওয়ার্ল্ড ক্লাস

 

ফার্নানডো তোরেস (২০০১-২০০৭ এবং ২০১৫-২০১৮)

এল নিন আকা নাম্বার ৯
ফার্নানডো তোরেস,(source: commons.wikimedia.org)
তোরেস পৃথিবীর সেরা স্ট্রাইকার হয়েছেন একমাত্র অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের জন্যই। তিনি দা গোল্ডেন চাইল্ড অফ অ্যাটলেটিকো। “el nino” নামে খ্যাত তিনি। ৪০৪ ম্যাচে ১২৯ গোল , তার রেকর্ড সাদা মাটা কিন্ত তিনি পরিপক্ক ফরওয়ার্ড হয়েছেন ২০০৭ সালে এই ক্লাব ছাড়ার পর। এক কথায় অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ তাকে তৈরি করে ওয়ার্ল্ড স্টেজে তুলেছেন।

 

এই লিস্টের দুইটি খেলোয়াড় শুধু অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের একাডেমির বেশির ভাগ খেলোয়াড়কে তারা বিভিন্ন ক্লাব থেকে কিনছেন। কিন্তু কি করে তারা এত ভালো স্ট্রাইকার সিলেক্ট করে বা কি জন্য সাধারণ ফরওয়ার্ড,অতিসাধারণ হয়ে উঠে এই ক্লাবে এসে তার কিছু কারণ সংক্ষিপ্ত ভাবে দেয়া হলো।

 

১. অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ কোন সময় আনকোরা খেলোয়াড় কিনে না।
২. একটা ধারণা আছে তারা কম দামে ফরওয়ার্ড কিনে এইটা ভুল কথা তার একটা জলজ্যান্ত উদারণ হলো আগুয়েরো যাকে তারা ২০০৬ সালে ২১ মিলিয়ন ইউরো দিয়ে কিনেছিল বা সাম্প্রতিক সময়ের ফেলিক্স যাকে ১৪২ মিলিয়ন ইউরো দিয়ে দলে ভিড়িয়েছে।
৩. স্ট্রং এস্কাইউটিং এবং খেলোয়াড় কিনার স্ট্রাটেজিও তাদের অদ্বিতীয়।
৪. আরেকটা কথা হলো তারা একটা ফরওয়ার্ডকে বেশিদিন ধরে রাখে না

 

তাদের কিছু কেনাবেচার কৌশল তুলে ধরলাম-

অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের তোরেসকে চড়া দামে বেঁচে ফরলানকে কিনে ফেলে এবং সাথে আগুয়েরোকে দলে যোগ করে, এইটাকে বলে স্মার্ট বাই।
আবার ক্লাব ফেভারিট আগুয়েরো কে বিক্রি করে ফ্যালকাও কে কিনে ফেলে সাথে একটা আনকোরা ফরওয়ার্ড কোস্টাকে খুব অল্প দামে কিনে নেই এবং কোস্টা কে ডেভলপ করা শুরু করে।
এরপর তারা ফ্যালকাওকে চড়া দামে বিক্রি করে দেয় এবং ডেভিড ভিলা কে নিয়ে আসে দলে কিন্তু সেন্টার ফরওয়ার্ড দেয়া হয় কোস্টাকে। ডেভিড ভিলার অভিজ্ঞতা সাথে কোস্টার পাওয়ার। একবারে খুনে জুটি।
এরপর আসে মাস্টারস্ট্রোক তারা এইবার কোস্টকে অনেক বেশি দামে বিক্রি করে চেলসির কাছে এবিং মান্ডুকিছ আর গ্রিজমানকে কিনে ফেলে।
এরপর অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ মান্ডুকিছ কে বিক্রি করে মার্টিনেজ ও করেয়াকে কিনে ।
তারপর তারা গ্রিজমান কে বিক্রি করে দিয়ে ওয়ানডার কিড ফেলিক্স কে কিনে সাথে দলে নিয়ে আসে কোস্টেকে সাথে আবার লোনে নিয়ে আসে মোরাতাকে। মনে তাদের রোটেশোন পদ্ধতি চমৎকার।

 

ফ্লেলিক্স অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ এর নতুন ওয়ন্দার কিড
ফেলিক্স,(source: commons.wikimedia.org)

 

কিন্তু কি করে সাধারণ স্ট্রাকাইকার অতিসাধারণ হয়ে উঠে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের হয়ে

এর মূলে আছে দিয়েগো সিমিওনে ও তার খেলার কৌশল। অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের ফর্মেশন হচ্ছে ৪-৪-২ মনে এইটা আক্রমনের সময় হয়ে যায় ৩-৫-১-১। মানে যেই সেন্টার ফরওয়ার্ড সে গোল পাওয়ার চান্স ৭৫ শতাংশ। চারিদিক থেকে তাকে টার্গেটে রেখে বল দেয়া হয়।
আরেকটা কারণ হলো অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের সব খেলোয়াড়রা ডিফেন্সিভ ফুটবল খেলে তাই কাউন্টার আক্রমণ বেশি হয় এটার জন্য লং বল ও থ্রু বল সেন্টার ফরওয়ার্ড এর দিকে দেয়া হয় এতে ওই পজিশনে যেই খালে তার গোল করার চান্স বেড়ে যায়। এই কৌশলের জলজ্যান্ত উদাহরণ সাম্প্রতিক সময়ের লিভারপুল এর বিপক্ষে ম্যাচটি।
আরেকটা কথা, দুঃখজনক হলেও সত্যি প্রথমে একবার বলেছি আবার বলছি অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ সব সময় স্পেনের তৃতীয় ক্লাব হয়েই থাকবে। কিন্তু তাদের অবকাঠামো এবং তাদের কৌশলের জন্য তারা ওয়ার্ল্ড ক্লাস স্ট্রাইকার তৈরি করতেই থাকবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here